আমি বাঙালী! ঘোরতর মেছো বাঙালী! নিত্য মাছ না জুটলে আমার রোচে না! আমার বাড়ীর কালী ঠাকুর দিব্যি মাছ খান! চিরকাল খাবেন! কাল যদি কেউ এখানে কেউ বলে ‘সাবনকে মাহিনা মে ইয়ে লোক মাটন খা রাহা হে’- আমি তার মুখে ঝামা ঘসে দেব! আমি বিরিয়ানি সর্বদা মুসলিম দোকান থেকেই কিনে খাই! ওরা ছাড়া মুঘল রেসিপি ভাল করতে পারে না কেউ! আমি শাহী খাবারের জন্য মুসলিম বাবুর্চি খুঁজি! রিসেন্টলি একটা ভাল মুসলিম খাবার হোটেল পেয়েছি- যাদের অতুলনীয় রান্না- অনেক দূর আমার বাড়ি থেকে- আমি পেটে খিদে নিয়ে ওখানে যাই! এতে আমার বাঙলিত্ব হিন্দুত্ব কোনটাই সংকটাপন্ন হয়নি! আমার সাধারণ মুসলমানদের সাথে প্রতি কোন দ্বেষ নেই। আমার বন্ধুবর্গে মুসলমানের অভাবও নেই! কাল যদি কেউ আমার এই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চায়- আমি আলবাত তার বিপক্ষে যাব!
আমি দুর্গাপূজার ভাসানে নাচতে যাওয়া বাঙালী! মহরমের মিছিল যাবে বলে আমার ভাসান বন্ধ করে দেওয়াকে আমি সম্প্রীতি মানতে পারিনি! আমি এর বিরুদ্ধে থেকেছি! মুসলমান সমাজের উন্নতিকল্পে যে সরকার স্কুল-কলেজ না খুলে মাদ্রাসা খুলে দিয়েছে- আমি তার সর্বদা বিনাশ চেয়েছি! কেন না এরা মুসলমানদের উন্নতির ছলে একটা radical মুসলিম জনশক্তি গড়তে চেয়েছে আগাগোড়া যা স্রেফ ভোট ব্যাংক হিসেবে কাজ লাগবে- এবং এদেরকে ক্ষেত্রবিশেষে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের বিপরীতেও দাঁড় করানো যাবে! আমি ঘৃণা করেছি- এই নির্লজ্জ মুসলিমতোষণ! আমি চাই এই দেশের প্রত্যেক ধর্মের মানুষ সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করুক! কেউ আমার ওপরে না চড়ুক, এবং কাউকে আমার নীচে যেন নেমে আসতে না হয়!
আমি পূজার নামে ক্লাবে ক্লাবে পয়সার ছড়াছড়ি আর মদ-মাতালের নোংরামো মানতে পারি না, রাতভর শব্দদূষণকে আমি ঘৃণা করি- করবও! আমি civic sense রক্ষার পক্ষে! ডিজে বাজিয়ে কালীপূজা হোক বা হনুমান পূজা- কোনটিকেই আমি রুচিসম্মত ভাবতে পারি না! আমি বিশ্বাস করি ধর্মাচরণ মানুষ আত্মিক বিকাশের জন্য- যদি ধর্মাচরণ সাম্যাজিক উৎপাতের কারণ হয়- আমি তার বিপক্ষে আছি, ছিলাম, থাকব! আমি রাস্তা বন্ধ করে পূজা পরিচালনা করার পক্ষেও নই, রাস্তা আটকে নামাজ পরার সমর্থকও নই! আমি আমার দেশটির আধুনিকায়ন চাই!
আমি চাই আমরা জ্ঞানে বিজ্ঞানে শিল্প সাহিত্যে বিকশিত হব! আমি ধর্মের নামে দিকে দিকে fraudstar দের আবির্ভাবকে মেনে নিই না! আমি জাকির নায়েককে যেমন সহ্য করতে পারি না, তেমনি ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীকেও নয়! আমি বিবেকানন্দপন্থী মানুষ! আমি উগ্রতার বিরুদ্ধে! ধর্মজগত যদি এই সমাজ থেকে rationalism উৎখাত করতে চায়- আমি সেই ধর্মজগত থেকেই বরং বেরিয়ে যাব! তার মানে যদি কেউ ভেবে থাকে আমার বিবেকানন্দকে কার্ল-মার্ক্স দিয়ে অপসারিত করা দরকার- আমি তার আর জাকির নায়েকের মধ্যে ফারাক দেখব না!
আমার দেশাত্মবোধ সূর্যসেন-প্রীতিলতাদের আদর্শে গড়া! আমার nationalism সুভাষ-ছত্রছায়ায় বেড়েছে! যে সুভাষকে গালি দিয়ে লেলিনকে বরণ করতে বলবে- সে আমার বন্ধু কস্মিনকালেও নয়- এ কথা স্পষ্ট করে বলতে আমি দ্বিধান্বিত নই! আমি যে rationalism এর ধুয়া তুলে আমার বাপ-দাদা-চৌদ্দ পুরুষের সংস্কার থেকেও নিজেকে সরিয়ে রাখতে কুণ্ঠিত হব না- সেখানে মার্ক্সবাদ নামক আরেকটা ধর্মানুশীলন আমি মানব এমন আশা করা যায় না? Marx এর সব কিছু rational নয়! Marx কে যারা নব্য ভগবান হিসেবে অর্চনা করে তারা আরেক ভিন্ন শ্রেণীর radical!
আমি একটি জ্ঞানে বিজ্ঞানে অগ্রসারমান, সুস্থ নাগরিক জীবন-সমৃদ্ধ সমাজব্যবস্থা চাইছি! এই চাওয়া নিকট ভবিষ্যতে পরিপূরণ হওয়া অসম্ভব দেখাতে পারে! কিন্তু দূর ভবিষ্যতে একেবারেই অসম্ভব নয়। এই চাওয়া কোন utopian concept এর ওপর নয়! এমন নয় যে ধর্ম সামনে এসে গেলে এই চাওয়া বাস্তবায়ন হয় না! যে সব দেশে রাষ্ট্রপ্রধাণ আজও বাইবেলে হাত রেখে শপথ নেয় সে সব দেশ উচ্ছন্নে যায়নি! অতএব 'রাষ্ট্রপ্রধান কেন ধার্মিক হবে'- এই জাতীয় উদ্ভট বামমনস্ক হাস্যকর কথাবার্তায় আমার শ্রদ্ধা নেই! সমস্যা রাষ্ট্রপ্রধানের ধর্ম নিয়ে নয়, সমাজের ধর্মানুভূতির বাঁচা-মরা নিয়ে নয়- সমস্যা তখন হয়- যখন একটা রাষ্ট্রের সমস্ত কার্যপ্রণালী ধর্মীয় কিতাবের ওপর নির্ভরশীল! যেমন ধরুন ‘শরীয়া-কানুন’! আজকে সৌদি-আরব পর্যন্ত এই কানুন শিথিল করার পথে হাঁটছে! তেমনি আমার দেশ ধর্ম মানুক, আলবাত মানবে- কিন্তু তার রাষ্ট্রপরিচালনা ‘মনুসংহিতা’ মেনে হবে না!
বিজেপি এসে গেল বলে দেশটা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে, বাঙালীত্ব বিপন্ন হচ্ছে বলে যে সব বাম-কান্নার রোল উঠেছে- তাতে আমার করুণা জাগে না! তবে বিজেপি যদি আমার ওপরে লেখাগুলোর বিপরীতে হাঁটে- তবে নির্ঘাৎ সেদিন আমি বিজেপির বিপক্ষেই কথা বলব! শতভাগ বলব। আলবাত বলব, যেমন বলি! দেশের প্রধাণমন্ত্রী পূজা-অর্চনা করছেন, করবেনই! কিন্তু তিনি যখন ভোটের আশায় ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী কিম্বা জাজ্ঞি বসুদেবের সাথে মঞ্চ ভাগ করেন- আমি তার কঠোর সমালোচনা করি! অবশ্য ক্ষমতালিপ্সু মমতা ব্যানার্জির মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ার ভড়ং এর চাইতে এটা মন্দ নয়! শুভেন্দু বাবুর আদিত্যনাথকে প্রণাম করে বিবেকনন্দের সাথে তুলনাও আমার কাছে লজ্জাজনক! আমি জানি প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের দোষ আছে। তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় আমি কাউকে না কাউকে দেশের ভার সঁপে দিতে বাধ্য! সেখানে আমরা সবাই অসহায়! তবে আমাদের অসহায়ত্ব যদি দেশটাকে আঁধারে ঠেলে- তখন একটু জাগতে হবে বইকি! এমনকি আপনার ভালবাসার দলটিকেও সমালোচনা করতে শিখুন- ধৃতরাষ্ট্র হয়ে গেলে- তার পথভ্রষ্ট হওয়া অনিবার্য!