একদা আবিষ্কার করিলাম আমাদের ঠাকুর দেবতাগুলি গ্রীক/রোমক দেশীয় পুরাণের ঠাকুরদের অনুকরণ করিতে লাগিল! অবশ্য বহুকাল হইতেই আমরা নরনারীর সৌন্দর্য্যের অন্যতম মানদন্ড ইউরোপীয় বলিয়া গণ্য করিতেছি। রমণীকুলের মুখশ্রী রক্ষার (মেক আপ) যে ঢঙ তাহা দু দণ্ড ক্ষণ ভাবিলে টের পাই- এই আদল ভারতীয় রমণীর অবয়বের নহে, ত্বকেরও নহে! শ্যামল গাত্রের বালিকাকে মুখে ফাউন্ডেশন মাখিয়া শ্বেতবর্ণ হইতে হইবে, ফাউন্ডেশনে পিংক ব্লাশ মারিয়া ইউরোপিয়ান দেখিতে হইবে- নচেৎ তাহার যে রূপ খুলিল না এই মনস্ত্বত্ব সম্ভবত আমাদের স্বদেশীয়; তবে কালোকে ধলো করিবার প্রসাধনী বিশেষ আমাদের ছিল না বটে। কিন্তু এই মানসিকতা জাতির অন্তরে গাঁথিয়া দিতে শ্বেতচর্ম-সংস্কৃতির প্রভাব নাই বলিতে পারি না। এই প্রভাব আমরা আত্মস্থও করিয়াছি। আমাদের মনোজগত পাশ্চাত্যের হাবভাব, আচার বিচার, খানাপিনা, গালাগাল দেবার ভাষা- সমস্ত কতৃক অধিকৃত! ইহাতে আমি পীড়িত নহি। বিজিত জাতির ওপর বিজয়ীর সাংস্কৃতিক আধিপত্য অত্যন্ত স্বাভাবিক। মানিয়া নিলাম। তাহা যুগে যুগে কালে কালে দেশে বিদেশে হইয়া আসিয়াছে, ভবিষ্যতেও হইবে। তবে আমি চমকিত হইয়াছিলাম যখন দেখিলাম মহিষাসুর ক্রমশ অসুরাধিক demon, monster, কদাচিৎ কোন পুরাতন Scandinavian war-lord হইতে লাগিল, দেবী ক্রমে অর্ধ-ভারতীয় অর্ধ-ইউরোপীয় কায়দায় সজ্জিত হইতে আরম্ভ করিল- আমার বাক্যস্ফূর্তি হইত না।
ইদানিং সকলই নিরপেক্ষ ভাবে মানিয়া লই! অর্থাৎ যাহা কিছুর সহিত আমরা অতিজাগতিক সম্বন্ধ ভাবিয়াছি, অন্তত যে ভাবনা-বলয় আমরা স্বজাত্য কল্পনা ও কলাসমূহের স্ফূরণে অকৃত্রিম রাখিয়াছিলাম এতকাল, যাহাতে আমরা ঐকান্তিক অধ্যাত্ম স্রোত খুঁজিতাম- তাহাও এই গড্ডালিকাপ্রবাহ হইতে নিস্তার পাইল না। ক্রমশ সকল কিছুই মনোরঞ্জনের নিমিত্ত হইল। কিছুরই স্বকীয়তা রহিল না। না রহিল কিছুরই গভীরতা। শিল্পতত্ত্ব, নন্দনতত্ত্ব- এই সকল অর্বাচীনের প্রলাপ বকিয়া কাজ নাই! তবে অন্তত যাদুর বাক্সতে দেখাইবার নিমিত্ত যে ভারতীয় কল্পনা ইউরোপীয় ধারায় গড়িব- সে বিদ্যাটুকুও কি আমাদের ঘটে আছে? পাঁচশত কোটি টাকা ঢালিয়া 'আদিপুরুষ' নামক সিনেমা বানাইল, রাম-রাবন-হনুমানের গুষ্টি উদ্ধার হইল- VFX এর মান দেখিলাম! বুঝিলাম অঢেল অর্থ হইল, রুচি হইল না, শিক্ষাও নহে! বুদ্ধিমান বুঝিয়া লইবেন! যদি পাঁচশত কোটি খরচ করিয়া আমরা খুব মানসম্মত কিছু সৃষ্টি করিতে অসমর্থ হই, সেই স্থানে দেবী নাচিতেছে, মহিষ ছুটিতেছে- বাজ পড়িতেছে, মাটি ফুঁড়িয়া আগুনের হল্কা নির্গত হইতেছে, সাগরে প্রলয়ংকরী ঢেউ জাগিয়াছে, হাসি হইতে টর্নেডো বাহির হইতেছে জাতীয় শিশুতোষ VFX- এর বেশী কিছু আশা করিব কি? সমালোচনাও কি অর্থে করিব?প্রহসন করিতেও দুঃখ হয়! যাহা রামানন্দ সাগর আশির দশকে ফিল্ম এডিট করিয়া দেখাইতেন, অদ্য তাহা আমরা ভিজুয়াল গ্রাফিক্সে দেখি- ইহাকে উন্নতি মানিলে অপরাধ নাই!
মোদ্দা কথা হইল রাম-রাবণের যুদ্ধকে ট্রোজান যুদ্ধ করিয়া দেখাইতে চাহিলে শুধু পোশাক আশাক পরিবর্তন করিলে চলিবে? অন্ধানুকরণের কুফল এই যে সে শিব গড়িতে বানর গড়িবেই গড়িবে! একজন সঙ্গীতের মানুষ হিসাবে বলিব- একেকটি হলিউডের fantasy movie, mythological movie তে কেবল মাত্র আবহ সঙ্গীত (মূলত যন্ত্রসঙ্গীত) নির্মাণে তাহারা যে মেধা ও অর্থ বিনিয়োগ করে আমাদের তাহা করবার সিকিভাগ রুচিও নাই, বাসনাও নাই! আমাদের বিনিয়োগ বিনোদন রচিবার ও তাহা হইতে অনায়াসে অর্থসংস্থান বৃদ্ধি করিবার! শিল্প-টিল্প কিম্বা যে প্রসঙ্গের অবতারণা দিয়া শুরু করিয়াছিলাম- স্বজাতীয় স্বকীয়তা প্রভৃতি কথাবার্তা নিছক প্রগলভতা বৈকি!