হতাশ হওয়া নাকি বারণ!
আমার এক ছাত্র রুদ্রবীণা শিখত। মূলত রুদ্রবীণা শিখতে গিয়ে রাগরাগিণী বোঝার প্রয়োজনে সে আমার কাছে এসেছিল। আমি তাকে নিরুৎসাহিত না করলেও বাস্ততবতা দেখিয়ে বুঝিয়েছিলাম- মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়ের জন্য রুদ্রবীণা শিক্ষা একটা বিরাট বিলাসিতার মধ্যে পড়ে! শেষপর্যন্ত সে বীণা ও সঙ্গীত উভয় শিক্ষালাভ থেকেই ইস্তফা দেয়, এর মধ্যে তার বাপের গাঁট থেকে যা কড়ি খসার তা খসে গেছে তা বলা বাহুল্য! ঘুরে ফিরে বাস্তবতা চোখ রাঙাতে দেরী করেনি! ব্যাপক পৈত্রিক ধনসম্পদ না থাকলে এসব ধ্রুপদী বিদ্যায় আত্মনিয়োগ করে টিকে থাকা সম্ভব নয়! গুরুমুখে শুনেছিলাম, পরম্পরায় একটা কথা প্রচলিত, ‘ইয়ে চিজ আমিরোঁকে লিয়ে হ্যায়, ফকিরোঁকে লিয়ে হ্যায়’! মাঝামাঝি থাকার আমার মতন লোকের জন্য নয়! এই কথা যারা এই সমস্ত কলায় নিবেদিত আছে সকলেই জানে। Passion পর্যন্ত এর যা গ্রহণযোগ্যতা আছে- proffesion হিসেবে ততটা নেই! তাই বলে কেউ আর ধ্রুপদ শিখবে না? বীণা শিখবে না? শাস্ত্রীয় নাচ শিখবে না? কেন শিখবে না? সামর্থ্য থাকলে অবশ্যই শিখবে। সামর্থ্য আছে সবার? কিন্তু অন্নসংস্থানের চিন্তা করে শিখতে গেলে বিপদাপন্ন হতে হবে! আমাদের সমাজে শিল্পকেন্দ্রিক একটা এমন ecosystem সৃষ্টি হয়েছে- সেখানে পুরাতনী সংস্কৃতির টুটি চেপে ধরা হয়! এক যুগ ধরে ভরতনাট্যম শেখা মেয়েটি কোনভাবেই রিলসে নাচা পুঁচকে মেয়েটির তুলনায় যশ-খ্যাতি-অর্থ কিছুই পাবে না! বলতে পারেন- ভরতনাট্যমের আলাদা class, তার প্রশংসকদের আলাদা class! এসব কখনো সর্বজনীন ছিল না। কথা হচ্ছে সেই আলাদা class এর ভেতরে recognition মিলছে? পয়সা মিলছে? মঞ্চ মিলছে? সমাজের সেই আলাদা class- যার কাজ প্রশংসা করা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ- সেই class patronage করছে? কিছুই করছে না! প্রশংসায় পেট ভরে? যে রুদ্রবীণা শেখে তার বিরোধ কখনোই গীটারের সাথে নয়! তার বিরোধ এই ecosystem এর সাথে যে তাকে সামান্যতম জায়গাটুকু দেয় না! তার বরং বেঁচে থাকার করুণ আর্তনাদ আছে যা শূন্যে মিলিয়ে যায় নিষ্ঠুর ভাবে! বলতে পারেন- survibal of the fittest! সমাজের গতি বদলেছে, বদলেছে চরিত্র! এই পরিবর্তনে বীণাটি টিকতে পারছে না তো সে দায় বীণার বৈকি! বড় বড় মঞ্চে ধ্রুপদীয়া গাইতে বসলে সামনের কয়েকটা সারি বাদ দিলে পেছনে কেউ শোনার নেই! ধ্রুপদে প্রাণ নেই? আকর্ষণ করার ক্ষমতা নেই? কেন নেই? শ্রোতা বদলাচ্ছে। আধাঘণ্টা আলাপ-জোড়-ঝালা শোনার ধৈর্য বিলোপ হয়েছে! দায় কেবল ধ্রুপদের? চিরকালই এসব আলাদা class এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল সে কথা অস্বীকার করছি না। কিন্তু অতীতে সেই class, সেই সমাজ- এঁদের বাঁচতে দিয়েছে- এখন দেয় না! এখন এসব একপ্রকার elitism দেখানোর কায়দা! এই নির্মম বাস্তবতা যখন বারেবারে বলতে হয়- তখন এক শ্রেণী ভাবে- আমি বা আমার মতন মানুষ বড্ড negative কথাবার্তা বলে! তাদের বক্তব্য- আমরা যেন আমাদের কাজটুকু অন্তর দিয়ে করি- ব্যস তাতেই হয়ে গেল সব! অন্তর দিয়ে নেশারখোরের মতন বুঁদ হয়ে ধ্রুপদী-সাহিত্য-শিল্প-কলার সাধন করার পর যখন বাস্তবতা অর্ধচন্দ্র দান করে বুঝিয়ে দেয়- ‘যা ভিক্ষে করে খা’- তখন এঁদের কারো কাছ থেকে সামান্যতম সহানুভূতিটুকুও জানি পাব না! আজও পাশ্চাত্যে লোকে Choir শোনে, Opera শোনে- হলভর্তি লোক, pindrop নীরবতায়! স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে এসবের প্রশিক্ষণ হয়! সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আছে! আমাদের কি আছে? আমাদের শোনে লোকে? যে কোলকাতায় একদা খেয়াল গানের আসর বসলে- আসন সংকুলান হত, সেখানে এখন ডোভার-লেনের অনুষ্ঠান ফাঁকা থাকে! ব্যপারটা অনেকটা টেস্ট ক্রিকেট থেকে টি-টোয়েন্টির আসন কেড়ে নেবার মতন! এখন লোকে যেমন টেস্ট তেমন দেখে না- গ্যালারি ফাঁকা! লোকের সময় নেই, ধৈর্য নেই! হ্যাঁ আমাদের মেনে নিতে হবে। কিছু করার নেই। তাই বলে আমরা যারা আছি- ক্ষুদ্র, দীন-হীন, অপাংক্তেয় হয়ে পড়ে- আমাদের খেদ প্রকাশ করার ভাষা থাকবে না? আমরা আমাদের মনোবেদনা জানাতে পারব না কোথাও? প্রতিপত্তি ছাড়ুন- দু’পয়সা জোটাতে না পারলে ভবসংসারে আপনাদের বয়ানবাজী গিলে বাঁচতে পারব? শাক্তপদাবলী নিয়ে বড় কিছু একটা করব ভেবেছিলাম- কোন sponsor নেই, একটা কিছু বইটই ছাপিয়ে গানগুলোর যথোচিত সংরক্ষণ করব পরিকল্পনা আমার আজও আছে- যা অনেকটাই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর কাজ- কোন প্রকাশক এই risk নেবে? সে তো সমাজসেবা করতে বসে নেই! মূলত আমি যদি এখন বসে শতবছর আগের কাজকর্ম নিয়ে খেপে উঠি- তাহলে সেটা আমার মূর্খতা ভেবে নিয়ে আমাকেই সরে দাঁড়াতে হবে! এবং এটাই বাস্তবতা! হয় তুমি নতুন যুগের মতন করে নিজেকে আমূল বদলে ফেল, নইলে ভাত-ডাল জোটানোর অন্য কাজ ধরে নাও! সোজা কথা! এও জানি আমরা যত যা-ই বলি- নিয়তিকে মেনে নিতে তো হবেই! বলে খুব লাভবান হচ্ছি না! হবও না! কেউ এসব কথার ধার ধারে না! কিন্তু বলে যদি নিজেকে অন্তত প্রবোধ দিতে পারি নিজেকে তাতেই বা কার ক্ষতি? আমাদের আদেশ-উপদেশ দিয়ে কাজ নেই। লোকের কথা বিবেচনা করে আমরা থেকে নেই তো! আমরা কিছু লোক আজও নিজের আনন্দের নিজেই সৃষ্টিটুকু নিয়ে থাকি! ওটাই বাঁচার অবলম্বন আমাদের। লোকে না শুনুক- তাই বলে গাওয়া তো বন্ধ হয় না! আমাদের দাবী-দাওয়া কিছুই নেই! আমাদের কেবল বেঁচে থাকার তাগিদ আছে! পেটে খিদে আছে! এবং যখন বিপন্ন বোধ করি- তখন আর দশটা জন্তুর মতন শব্দ করার প্রবণতা আছে! ওটাও কি বন্ধ করে ফেলতে হবে?
