ফেবু পোস্ট লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ফেবু পোস্ট লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬

 

গণতান্ত্রিক হতে গেলে আপনাকে দিকে দিকে লিংকনের ছবি ঝোলাতে হয় না, ভাস্কর্য বসাতে হয় না মোড়ে মোড়ে! গণতন্ত্রের কিছু criticism থাকতে পারে, অবশ্যই আছে- তবে তার একটা বিশেষ flexibity রয়েছে, মানে লিংকনের প্রদত্ত definiton থেকে বোঝালে - ‘By the pepole, for the people’- এটাই flexibilty রেখেছে, এটাই তার শক্তি এবং একইসাথে এটাই বড় loophole! যে দেশে যেমন মানুষের ভাবনা তেমন আকারে প্রতিফলিত হবার সুযোগ আছে গণতন্ত্রের রাজনীতিতে! আমেরিকায় কেমন গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো- জরুরী নয় সেটা বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশের জন্য আদর্শ! কোন একটা দেশের মানুষ তাদের নিজেদের সামাজিক প্রকৃতি অনুযায়ী ভাবতেই পারে ভিন্ন একটা কাঠামোর কথা। শত বছর আগে আমেরিকানরা কি ভেবেছে সেটাকে আজ অবধি আমাকে মেনে নিতে হবে তা নয়! আব্রাহাম লিংকনের democracy কে আমরা modify করতে পারি- আব্রাহাম লিংকনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাও আমরা রাখতে পারি- এবং আমাদের আব্রাহাম লিংকনের পূজাপদ্ধতি চালু করার দরকার পরে না, তার ভাবমূর্তি ও মূর্তি কোনটাই প্রতিষ্ঠা করার একদমই প্রয়োজন হয় না! এখানে লিংকনের মতবাদের সাথে লেলিনের মূর্তি ও ভাবমূর্তির দ্বন্দ্ব! রবীন্দ্রনাথ যে কারণে বলেছিলেন জার-তন্ত্র ও বলশেভিজম একি দানবের পাশ-মোড়া কথাটা এ অর্থেও সত্য! উভয়ই একটা মূর্তিকে আরেকটা মূর্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠাপিত করতে চেয়েছে- তা লোকে মানুক বা মানুক! দেড়শ বছর আগের কোন রাজনৈতিক মতবাদ যদি দেশ ও সমাজের প্রয়োজনে flexible হতে না পারে- সে জনসমর্থন হারাতেই পারে, তাতে চকিত হবার কারণ নেই- বিশেষত সে সব দেশে যেখানে মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা প্রায় শূন্য, মানুষ যাকে তাকে ভোট দিয়ে কেবল শান্তিতে বাঁচতে চায়- এবং যেখানে প্রতিটি দলেই স্বার্থান্বেষী নেতায় ভরা! গণমানুষের রাজনীতি করতে গেলে সে দেশ থেকেই idea ও idol কিছু তুলে ধরতে পারলে তা বেশী গ্রহণযোগ্যতা পাবে। লেলিন চট্টোপাধ্যায় বা সেতুং ভট্টাচার্য চিরকাল প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে পারবে না! বরং মাস্টারদা সূর্যসেনকে বসান- তিনিও কমরেডই ছিলেন- তবে কালীপূজা করা কমরেড! ওখানে যদি আপনাদের আপত্তি জন্মে- তাহলে এ দেশের রাজনীতিতে আপনাদের একদিন না একদিন বিলোপ হতে হবে! আমি একবারও আপনাকে কালীপূজা করার পরামর্শ দিচ্ছি না, আপনি পাঁড় নাস্তিক হোন- আমার আপনার প্রতি পূর্ণ সমর্থন, ও আপনার স্বাধীন-চিন্তার ওপর শ্রদ্ধা আছে! কিন্তু যখনই কেউ কালীপূজা করছে দেখে- আপনি থাকে পুরোহিততন্ত্রের দাস বলবেন, আপনি তাকে কুসংস্কারে নিমজ্জিত বলবেন, তার পূজা নিয়ে খিল্লি করবেন, তার ভাবনাকে প্রতিনিয়ত তাচ্ছিল্য করাকে আপনি আপনার ব্যক্তি-অধিকার বলে জাহির করবেন- তখনই আপনি সমর্থন হারাবেন! যখনই আপনি ভাববেন গোরক্ষক সমিতির অসভ্য আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আপনাকে প্রকাশ্যে গরু খেয়ে সেকুলারিত্ব দেখাতে হবে- আপনি সেদিনই এই আহম্মকির মাধ্যমে পথভ্রষ্ট হয়েছেন! আপনারা বৃহত্তর সমাজের sentiment কে আমলে নেন না! এখানেই আপনাদের পতনের দরজা খোলা! একজন সচেতন মানুষ হিসেবে লিখলাম- মানুষের কথা ভেবেই, মানুষের রাজনীতিতে আসুন। আপনাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি! কিন্তু আপনারা সেই প্রয়োজন মেটানোর উপযুক্ত হয়ত নন এখনো! 

রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৪

'অসির চেয়ে মসী বড়'

 

যারা politics বোঝেন, তারা বোঝেন nothing is precisely appolitical! 'অসির চেয়ে মসী বড়' বোঝাতে গিয়ে মসীর মাহাত্ম্য যে খাটো করা হয়নি- সে কথা অনুর্বর মস্তিষ্কে ঢোকে না!

শনিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৪

পাগল ডাকলে হয়ত পাগলেও কষ্ট পায়!

 

কথা ছিল ঝমঝম বর্ষা নামলে উজ্জ্বলের টিনের চালা ঘরে আমি একরাত্রি থাকব। ভেজা ঘাস মাটির সোঁদা গন্ধে মাতাল ঝিঁঝিঁর কলরবে পেতে কান উদাসী হয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকব কখনো দিগন্তে মুখ করে। গরম ভাতে উজানি-কৈ এর ঝোলে আত্মনিবেদন শেষে যদি আসে ঘুম সে রাতে গল্পের আবিলতায় ঢলে পড়তাম ধীরে ধীরে পালঙ্কের পায়া ঘেঁষে। কিন্তু উজ্জ্বলও আমারই দেয়া পাথুরে-পরামর্শ-পথে উঠে গেছে ইটের চৌকো ঘরে যেখানে আর টিনের চালা নেই! শাওন আকাশ ভেঙে নেমে সকরুণ সুর ধরে কাঁদলেও সেই ঝমঝমে ধ্বনি আর উঠবে না ওখানে। সকল টিনের চালা, বেড়ার ঘের, খড়ের গাদা ধীরেধীরে সরে যাচ্ছে। কিছুই আর আমার উচ্ছন্ন বিলাসিতার জন্য থমকে রইল না। অথচ আমি নিজেকে যেন জোর করে বলতে চাই- আমি এক বিন্দু দায়ী নই! আমি এঁটেল মাটির মতন থাকতে চেয়েও ইট ভাটার উনুনে ঢুকে সুদৃঢ়তর অস্তিত্ব খুঁজতে কি চাইনি বুঝি? তবু কোথাও ভাটার টানে জাগা খালের তীরের মতন আমি কাদা হয়ে কেঁদে যাই গভীরে। দ্বিচারিতা নয়, এ যে কেমন অসহায়ত্ব এ কথা বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে স্বস্তি পাই যেন। এসব লেখার নয়, গাইবার নয়, জনে জনে জানাবার নয়, বোঝাবার নয়। পাছে লোকে পাগল ভাবে। যেন পাগল অত্যন্ত পতিত কিছুর নাম! পাগল ডাকলে হয়ত পাগলেও কষ্ট পায়! 

শনিবার, ২৪ জুন, ২০২৩

সভ্যতার চোখ

ব্যক্তি মানুষ হিসেবে, একজন সামাজিক জন্তু হিসেবে সমাজের নানান দিক আমাকেও ভাবায়। ইদানীং কম ভাবালেও আগে ঢের ভাবাত। আমি শেষমেশ এই ভেবেছি যে- ভেবে জীবোদ্ধার করার মতন অবতার আমি হয়ে উঠিনি, না আমার সেই এলেম আছে, না আমি তার যোগ্য! সবাইকে আমি যা ভাল বুঝেছি, যা আমি সর্বোৎকৃষ্ট বলে মানি তা জানিয়ে যেতেই হবে এমন মাথার দিব্যি আমাকে কস্মিনকালেও কেউ দেয়নি! এমনকি আমার মতন উচ্চ রক্তচাপের রোগে ভোগা নরতনুধারীর জন্য এসব কর্ম অসহ রকমের কঠিন- তা ডাক্তার বদ্যি না বলা পর্যন্ত আমি মেনে নিতেই চাইনি! একসময় খুব লিখেছি। কত কি যে লিখেছি। আমি যে খুব খারাপ লিখি- আমার পরম অহিতাকাঙ্ক্ষী নিন্দুকও বুকে হাত দিয়ে এমন বলতে পারে না! লেখালেখিতে সুখ্যাতি অর্জন করার মাঝপথে আমার ভাবনা এল মাথায়- আমি আসলে কাদের জন্য কি লিখি? মনকে বোঝাতাম 'বাছাধন তুমি আনন্দের নিমিত্ত লেখ!’ দেখলাম মাথা খাটিয়ে হিজিবিজি লিখে মরার চাইতেও আনন্দ পাবার আমার আরও পন্থা তো খোলা। তাই লেখক হবার বাসনা জলাঞ্জলি দিয়েছি! অথচ এই লেখক সত্ত্বা ও তার ঘোরতর বহিঃপ্রকাশ আমাকে বন্ধুবান্ধবেও ব্রাত্য করেছে একদিন। যা মুখ ফুটে বললে কারো বুকে শর বিঁধে যায়- আমি সেই কথা কলমে টেনেছি। লোকে বলেছে ‘মশায় বড় তেতো জিনিস লেখেন’! আমি দেখলাম- অসত্য বরাবরই মিষ্টি ও সত্যের বিপরীত! অসত্য ভাষণে আমি মহিমময় হয়ে উঠব এমন আদর্শ আমি দুর্ভাগ্যবশত আমার বাপ-ঠাকুদ্দা থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাইনি। আর সত্য লিখে গলায় ফাঁসি জড়িয়ে নেবার মতন সৎসাহস আমার যা অল্প আছে তা দিয়ে বেঘোরে পটল তোলা ভিন্ন আর ভাল কিছু আমার কাছে আশা করা যায় না! ঘরের লোকে বলত- ‘ওসব লিখিস না, লিখিস না’! আমি লিখে শত্রু যে পক্ষে হয়েছি- সেই পক্ষ বরাবরই প্রবল। এদিকে সর্বদা rationlism এর ধ্বজাধারী হতে গিয়ে আখেরে কোন পক্ষেই আমার খুব সমাদর কখনো হতে দেখিনি! বস্তুত মধ্যমপন্থা জিনিসটি কি সেটি আমি জেনেও কোনদিন মানাতে পারিনি নিজের সাথে! কেন না অদ্যকার মধ্যমপন্থাটির সরল ইংরেজি অনুবাদ হল- adjustment! যেখানে লোকে অনায়াসে adjust করলে সদা সুখী হয়- আমার তাতেও জ্বালা। অতএব আমি ভাবলাম- আমি বরং ঘরের কোণে পড়ে রই। এই পড়ে থাকা আমার চরিত্রের শতভাগ পরিপন্থী হলেও- ভেবে দেখলাম হয়ত একটা অত্যন্ত ক্ষুদ্র জীবনে আমি নিদেনপক্ষে কিছুটা স্বস্তি হয়ত পাব। তাই সমস্ত তথাকথিত আনন্দোৎসব একদিকে ছুঁড়ে আমি একটা দুটো সুর সেধে সেধে বেঁচে আছি। আমার নানান বিষয়ে নানান মতামত আছেই। যেমনটি সকলের থাকে। চায়ের টঙ এ মাটির ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে বিশ্বরাজনীতির এইসা-কি-তেইসা করে ফেলা বিজ্ঞজনদের চাইতেও রাজনীতি-সমাজনীতি ইত্যাদিতে আমার জ্ঞানের খুব একটা কমতি নেই! কিন্তু আমার কথায় ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ থেমে যাবে এমন কোন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে- তেমন একদমই মনে হয় না! আর যা যা অসার কথোপকথনে অথবা এই social media আস্তাকুঁড়ে পেল্লায় বড় নিবদ্ধ লেখনে জনহিতকর বার্তা দেয়া যাচ্ছে ভাবা যেতে পারে- আমি দুচ্ছাই করে ওসবও তো কবেই ছেড়েছি! এমনকি আমার এই চলমান লেখাটিও তেমন কোন বার্তা দিচ্ছে না! এটা স্রেফ অবকাশ আছে বলে নিছক সাহিত্যছলে কিছুটা আত্মকথন, আত্মদহনের প্রলাপও বলা যায় কিছুটা, কিছুটা অস্তিত্বজ্ঞাপক অপলাপ। আমি কত ধর্ম-অধর্ম-বিধর্ম-কুধর্ম ঘাঁটলাম! কত দর্শন পড়লাম! কত বিজ্ঞান পড়লাম মাথা চুলকে চুলকে! দেখলাম কিছু লোকে fiction কে science বলে, আবার কেউ science fiction কে science! কেউ বিশ্বাসকে দর্শন বলে, কেউ দর্শনকে অবিশ্বাস দাগিয়ে দেয়! আমি মানুষের এই অবধি যত নৃতাত্বিক বিবর্তন হয়েছে তা ময়লা ঘাঁটার মতন ঘেঁটেছি। পেলাম- আমরা বরাবরই এমন ছিলাম! আমাদের এই সমাজ, এই জীবন- এই যে আমরা নিরন্তর শেওলার মতন ভেসে চলেছি- এখানে reality check ব্যাপারখানা বরাবরই গৌণ! সকল human civilisation কতগুলো myth এর ওপর ভাসতে ভাসতে এগিয়েছে, এগিয়ে চলেছে, এগোয়! কারো কাছে এই myth মানে বাস্তবতা, তো কারো কাছে আরেকটা! দ্রষ্টার দৃষ্টিশক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী দৃশ্য কতরকমই তো বর্ণনাত্মক হয়ে ওঠে- এর কোন সর্বজনীন মানদণ্ড নেই। সমস্যা দৃষ্টিশক্তির নয়, দৃষ্টিভঙ্গির নয়, দৃশ্যের তো নয়-ই। সমস্যা হল- দ্রষ্টাগুলো ভয়ংকর! কারো দৃষ্টি ব্যাতিক্রম হলে দ্রষ্টাগুলো একে অপরের চোখ তুলে নিতে কখনো পেছপা হয়নি! সভ্যতার পথ এরকম বহু উপড়ে তোলা চোখের ওপর গড়া।

শনিবার, ১৬ জুলাই, ২০২২

 


শেখ হাসিনা সরকার দ্বিতীয়বার সরকার গঠনের পর বাংলাদেশে দুর্গাপূজা মণ্ডপের সংখ্যা অনেক বেড়েছে বলে বেশ ফলাও করে রিপোর্টিং হয়। পশ্চিমবঙ্গে আমি দেখেছি এ নিয়ে অনেক মানুষ খুবই উদ্বেলিত হচ্ছিলেন। মমতার চাইতেও হাসিনাকে বেশী সমর্থন করেন এমন মানুষ এখানে হাজারে হাজারে আছেন! হাসিনা সরকারে হিন্দুদের সরকারী নানান উচ্চপ
দে নিয়োগ নিয়েও উচ্ছ্বসিত আবেগ আমি লক্ষ্য করেছি। কিন্তু দু’ক্ষেত্রেই আমার বক্তব্য ছিল- এইসব চালচিত্র দিয়ে একটা দেশের সংখ্যালঘু জনসাধারণের সার্বিক অবস্থার বর্ণন হয় না। দেশে ৪৮ হাজার কি ৫০ হাজার পূজা মণ্ডপ হল- এ দিয়ে প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে কি পরিস্থিতি দাঁড়াচ্ছে সেটা বিশ্লেষণ করতে চাওয়াটা বোকামি। কোন কোন বড় বড় হিন্দু বাবু কি কি উচ্চপদে বসলেন তা নিয়ে দূর পাড়া গাঁ'র নিরীহ হিন্দুদের জীবন বিচার্য্য হবে না! আমি বলতে চেয়েছি- আওয়ামীলীগ হিন্দুদের ভোট ব্যাংক ভেবে তোষণ না করুক, বরং দেশের নাগরিক হিসেবে সর্বস্তরের হিন্দুদেরও নাগরিক অধিকার যাতে পূর্ণমর্যাদায় সুরক্ষিত থাকে তার নিশ্চয়তা দিক। 


অচিরেরই দেখেছি মণ্ডপ ভাঙচুরের ঘটনার সংখ্যা ও বছর বছর এইসব ঘটনা বৃদ্ধির হার মণ্ডপ-সংখ্যার সকল ওভার-হাইপড রিপোর্টগুলোকে ছাড়িয়ে চলে গেল! বড় বড় হিন্দু বাবুরা সরকারি ক্ষমতা পেলেও সাধারণ হিন্দুদের জীবন ভয়াবহ হতে শুরু করল দিকে দিকে। এখন ভয়াবহতাকে নারকীয় পর্যায়ে উত্তীর্ণ করা হয়েছে। ২০১৩ বা ১৪ তে যতটা মনে পড়ছে, শেখ হাসিনা রামকৃষ্ণ মঠ ঢাকাতে গিয়ে যখন সহিষ্ণু ও অসাম্প্রদায়িক সরকারের আমলে বাংলাদেশে হিন্দুরা কত সুখে আছে তার বিবরণ দিচ্ছিলেন সম্প্রীতির বক্তৃতায়, তিনি যখন জানাচ্ছিলেন দেশব্যাপী কত আনন্দের মধ্য দিয়ে হিন্দুরা শারদীয় দুর্গোৎসব পালন করছে- তখন দেশের নানান প্রান্ত থেকে প্রতিমা ভাঙচুর, মণ্ডপ হামলার অসংখ্য খবর অহরহ পাচ্ছি ফেসবুকে! কোন হিন্দু ধর্মীয়-সংগঠন একটি নিন্দাপ্রস্তাব আনার সাহস দেখায়নি! শেখ হাসিনার সেই ভাষণ আমি সামনে দাঁড়িয়ে শুনেছি, মনের দুঃখে ফেসবুকে একটা দীর্ঘ পোস্টও লিখেছিলাম তার পরপরই। 


অন্য দিকে আসি। ২০১৩ সন। 


গণজাগরণ মঞ্চ যখন শাহবাগে মঞ্চস্থ হচ্ছে- তখন আমি ব্যক্তিগত ভাবে আওয়ামী-ঘেঁষা মনোভাবাপন্ন হলেও থেকেছি এর বিরোধী শিবিরে। কেন না আমার মনে হয়েছে এর কনসিকোয়েন্স খুব ভাল কিছু হতে যাচ্ছে না। আমি তখন বাগেরহাটে গিয়ে আটকা পড়েছি। আমি থমথমে পরিবেশ দেখছি। আমি দেখছি হিন্দুরা শঙ্কিত। কাদের মোল্লা প্রভৃতির ফাঁসি কার্যকর করতে গেলে দেশের রাজপথগুলো যাতে জামায়াত-শিবিরের রণক্ষেত্রে হয়ে উঠতে না পারে তার জন্য আগেভাগেই একটা বিরাট দেশপ্রেমী জনসমাগম ও প্রতিরোধক-শক্তির মঞ্চায়ন সরকারের প্রয়োজন ছিল, তখন হয়ত ভাবা যাচ্ছে এটা মাস্টারস্ট্রোক; সেই এঙ্গেল থেকে। (দেখলাম পশ্চিমবঙ্গ থেকেও গণজাগরণের সমর্থন আসছে! আঁতেলদের নিজেদের বিশ্বনাগরিক বানানোর একটি সুযোগও যেন বিনষ্ট না হয় সেদিকে সর্বদা চোখ খোলা রাখতে হয়! তবে যে সব আঁতেল ঘুম ভাঙলেই আগে প্যালেস্টাইন চোখে দেখে, তারা গতরাতের নড়াইল দেখতে গেলে জন্মান্ধ সাজবে!) 


‘আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, শাহবাগ দেখেছি’ - এই জাতীয় আবেগে গদগদ হওয়া অরাজনৈতিক মুক্তিযুদ্ধ-পক্ষের জেনারেশনে যদিও গোটা ঘটনার পেছনে কোন পলিটিকাল প্লট নজরেই আসেনি। অতটা বুদ্ধি থাকলে ওরকম একটা গাঁজাখুরি কথা দিনদুপুরে বলা যায় না যদিও বা! ‘তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’ স্লোগান দেয়া আওয়ামী-সমর্থকের জানতেও ইচ্ছে জাগেনি আওয়ামী-লীগও ক্ষেত্র ও কাল বিশেষে রাজকারদের সাথে হাত মেলায়, এবং কিছু রাজাকার আওয়ামীলীগের ভেতরেই বহাল আছে! আওয়ামীলীগ পলিটিকাল অপোজিশন সামগ্রিকভাবে নির্মূল করার চেষ্টায় সবে হাত দিয়েছে রাজাকারের বিচার ডেকে। বিচার হওয়া উচিৎ বটেই, তবে ওটা আরেকটা মুক্তিযুদ্ধ নয়, বরং ওভাবে বলে একটা গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছিল যেন! আমার মনে হয়েছে এর আগে বিএনপি সরকার আমলে আওয়ামী-লীগ নেতাকর্মীদের ওপর যে অত্যাচার চলেছে- তাতে এখন একটু ‘শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ’ হলে খুব দোষ হবে না! এটা রাজনীতি। এখানে ন্যায়-অন্যায়ের ধর্মক্যাঁচাল একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক! তবে আওয়ামীলীগ প্রতিপক্ষকে আদর্শগত ভাবে নির্মূল একেবারেই করতে পারেনি এসব করে, বরং আত্মস্থ করেছে। ফলতঃ এই আওয়ামীলীগে যতটা না মুক্তিযুদ্ধের আওয়ামীলীগ আছে তার চেয়ে ঢের বেশী আছে জামায়াত ও বিএনপি এবং আংশিক ভাবে শিবিরের লোকজন! যারা আগে ‘নারায়ে তকবির আল্লাহ হুয়াকবর’ বলত, তারা এখন পরিস্থিতির ঠেলায়- ‘জয় বাংলা’ বলছে। কিন্তু তাদের আদর্শিক ভাবনার বিন্দুখানেক পরিবর্তন হয়নি! এটা যদিও হয়েছে আরেকটু পরে। মনে হয় না আওয়ামীলীগের এ ছাড়া অন্য রাস্তা খোলা ছিল বা এখনো আছে! 


গণজাগরণের প্রসঙ্গে ফিরি। আমি ভয়টা অন্য জায়গায় পাচ্ছিলাম। গণজাগরণ মঞ্চায়ণ এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে জামাত-শিবির প্রত্যাঘাতটা কোথায় করবে? বিএনপি ও জামায়াতের কমন টার্গেট- হিন্দু! হিন্দু আওয়ামীলীগের বড় ভোট ব্যাংক। প্রত্যাঘাত শুরু হতে থাকল সেই ভোটব্যাংকের ওপর। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বন্ধুদের কাছে আমি শুনলাম- একটা বিপ্লব সঙ্ঘটিত হলে এরকম স্যাক্রিফাইস করতেই হয়! আমার মনে হল না আমি ফরাসী বিপ্লব বা রুশ বিপ্লব জাতীয় কিছু দেখতে পাচ্ছি! আমার মনে হল ‘স্যাক্রিফাইস’ মানে হিন্দুদের বলির পাঁঠা বানাতে কারো কোথাও কোন দ্বিধা নেই! খোদ হিন্দু বাবুসমাজের এ নিয়ে কোন উদ্বেগ নেই তিলমাত্র। হিন্দুদের ওপর হামলার প্রতিবাদে গণজাগরণ মঞ্চের মশাল মিছিলও একটা প্রতিকারবিহীন রঙ্গ- তা দিয়ে কেবল মশালের তেল পোড়ানো গেল, হিন্দুদের ঘর পোড়ানো বন্ধ হয়নি। আওয়ামীলীগের এতেও স্ট্র্যাটেজিকাল সাফল্য। হিন্দুর ঘরে আগুন দেখিয়ে বলা যায়- ‘দেখুন যারা আগুন দিচ্ছে- আমাদের লড়াই সেই সাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী, দেশ-বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধেই তো!’ বলির পাঁঠা হাড়িকাঠে আসুক! ক্ষতি কি? এই ২০২২ সনে এসে তো দেখাও যাচ্ছে খড়গের কোপটা কে ফেলছে এখন! 


গণজাগরণ মঞ্চের প্রথম কনসিকোয়েন্স প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে হিন্দু নিগ্রহ! দ্বিতীয়টি হল শাহবাগের আদলে বা প্রেরণায় শাপলা-চত্বর দখল করে নেয়া হেফাজতে ইসলামের পূর্ণ উত্থান! প্রচণ্ড বল প্রয়োগে এই গণজমায়েত রাতের আঁধারে স্তব্ধ করা হলেও আওয়ামীলীগ এটুকু নিশ্চয় জানত- এখন জাতসাপের লেজে পাড়া পড়েছে! হেফাজতে ইসলামের তালেবানি দাবী-দাওয়া মেনে না নিলেও, রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করতে না পারলেও, একটা আওয়ামী-ওলামালীগ বানিয়েও, দেশ ‘মদিনা সনদ’এ শাসিত হবে জাতীয় কথা বলে ব্যালেন্স সৃষ্টির ক্ষেত্র বানিয়ে চলতে হয়েছে ও হচ্ছে। হেফাজতে ইসলাম নিজেদের অরাজনৈতিক সংঘটন দাবী করেছে, সেটা কি খুব বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়? মনে হয় না আওয়ামীলীগের একটা ঘোর প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক এজেন্ডা অন্য একটা পথ ধরে কিছুটা সফলতা পেয়ে গেল? আওয়ামীলীগ সেই ক’বছর মাস-সাইকোলজি নিয়ে প্রচুর নাড়াচাড়া করেছে। তারা জেনে গেছে- ক্ষমতা এখন গা-এর জোরে রাখার বস্তু! তাই এদের আত্মস্থ করা ভিন্ন উপায় নেই! প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে ঠেঙ্গিয়ে ভেতরে গ্রাস করে নিলেও জনমত চলে গেছে পুরো উল্টোদিকে! একটা নিরপেক্ষ অবাধ নির্বাচন এলে আওয়ামীলীগ ধুলোয় মিশে যাবে! আওয়ামীলীগের ভেতরে বিদ্যমান জামায়াত-বিএনপি-ইসলামি ছাত্রশিবির চোখের পলকে বেরিয়ে আসবে। এবং এই যদি পরিণতি হয় তাহলে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কবরখানা হবে, দেশটাই কাবুল-কান্দাহার হবার দিকে দ্রুত ছুটবে তার পরেই! সুতরাং গণতন্ত্রের নাম ধরে একটা স্বৈরশাসন ছাড়া আওায়মীলীগের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন এবং এটা বাংলাদেশের জন্যও মন্দের ভাল ভাগ্য! আর এই সমগ্র পরিস্থিতিটাতে বলির পাঁঠা হিসেবে হিন্দুকেও বাঁচতে হচ্ছে। যারা আওয়ামীলীগের অগণতান্ত্রিক ক্ষমতায়ণকে অত্যন্ত সুস্বাদু বলে এসেছিলেন- তারা হয়ত আমাকে এখনো চেনেন- আমি শুরু থেকেই লিখে এসেছি- নৈরাজ্যকে আরেকটা নৈরাজ্য দিয়ে হটালে বস্তুত নৈরাজ্য-ই বিজয়ী হয়! শান্তি হয় না তাতে! যদিও আমি রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে কোন উদ্ভট- প্রেম, সহমর্মিতা, দয়া, ক্ষমা ইত্যাদি কথার আদর্শবাদের গল্প একেবারেই টানি না। পরাবাস্তবতাকে চোয়াল শক্ত করে মানতে হয়। আমি বিশ্বাস করি আওয়ামীলীগের ভিন্ন পথ নেই, ভিন্ন পথ বাতলে দেবার মতন বিরাট পলিটিকাল স্ট্রাটেজিস্টও আমি নই, এ নিয়ে আমার বাচালতা মানায় না, কিন্তু আমি এই পথের সমর্থনও করি না। এই পরিপূর্ণ ভেজাল আওয়ামীলীগের প্রতিও আমার কোন মমত্ব নেই- তারা যতই মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবের নাম হাঁকাক না কেন! 


অতীতে বিএনপি-জামায়াত হিন্দু বাড়িতে হানা দিলে আওয়ামী-লীগ এগিয়ে এসেছে, এটা সত্য। তবে আজ তো রক্ষক যে, সে-ই ভক্ষক। প্রতিপক্ষ যেখানে মৃত সেখানে কথায় কথায় প্রতিপক্ষকে দোষী বানানোর খেলাটা তো অচল হয়ে যায়। হাসিনা সরকার আর সেই খোলস পড়েও নেই। আওয়ামীলীগের প্রত্যক্ষ কালো হাত এই দশ-বারো বছরে ঘটে যাওয়া প্রত্যেক সংখ্যালঘু অত্যাচারের পেছনে আছে। চারিদিকে যত হিন্দু জমিদখলের তোড়জোড় এখন চলে, সবের পেছনে আওয়ামী-ভূমিদস্যুদের কালো-হাত। এবং আওয়ামীলীগের হিন্দু-নেতাকর্মীরাও একেবারে দুধে ধোয়া তুলসীপাতা নয়! এরাও এই করাপ্টেড সিস্টেমের অংশ। পাকবাহিনীর যেমন রাজাকার-বাহিনী ছিল, আওয়ামী-ভুমিদস্যুবাহিনীরও এরকম হিন্দু-হোমরা-চোমড়া-চামচা বাহিনী তৈরী হয়েছে, তারা সর্বদা তৈরিও রয়েছে। 

এখন বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর কোন অত্যাচার হলে হাসিনা ঠারেঠোরে বলতে পারেন ভারতের কিছু ঘটনার প্রতিক্রিয়া হচ্ছে এসব! কিন্তু ইতিহাস কি আমরা পড়িনি? ৪৭ থেকে ২০২২- পূর্ববঙ্গ, পূর্ব-পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশে ইতিহাসের পদধ্বনি গুনছি আমরা। এখন বিএনপি-জামাতের দিকে আঙুল ঘোরাতে গেলে হাসিনাও দেখতে পান- আঙুলটা তার দলের দিকে বেঁকে যাচ্ছে, তাই হয়ত এখন কিছুটা ভারতের দিকে বাঁকিয়ে দিলে ভাল। এতে তার 'ভারতের কাছে দেশ বেচে দেওয়া’ ভাবমূর্তির কিছুটা পুনর্গঠন হয়ত হয় অশিক্ষিত জনগণের কাছে! নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি কিংবা সংখ্যালঘুর সুরক্ষা-বিধান এসব না হলেও চলে তো! 


হুমায়ুন আজাদ ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ বইটা যদি ২০২২ এ লিখতেন, তাহলে কি লিখতেন জানি না। তিনি আওয়ামীলীগকে অপেক্ষাকৃত কম-প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল ভাবতেন। ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ কবিতায় তার টার্গেটেও মনে হয় না আওয়ামীলীগ ছিল। কিন্তু কবিতাটা ২০২২-এ ভয়ংকর প্রাসঙ্গিক। পড়লেই মনে হয় গোটা কবিতাজুড়ে আওয়ামী-গুণপনা বিধৃত হল যেন! ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ এর নিন্দা কতটা করা উচিৎ আর কতটা ’৫৭ ধারা’র এই ভেবে আকুল হয়ত হতেন। আজকের ’ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল’ তিনি কি দৃষ্টিকোণ দিয়ে লিখতেন সেটাও ভাবার বিষয়। আমি হুমায়ুন আজাদের অন্ধ স্তাবক নই। তবে বাংলাদেশের এমন নির্মোহ চিত্রায়ণের সাহসিকতা ও সদিচ্ছা আমি আর কারো ভেতর তাঁর মত করে পাইনি। মাতৃভূমি নিয়ে উচ্ছ্বসিত আবেগ নিয়ে ভাল ভাল কথা পাগলেও লিখে দেবে, কেউ তো এমন লিখুক- যা আমরা কখনো চাইনি, কিন্তু প্রতিদিনই দেখতে হয়! কলেজ-ইউনিভার্সিটির প্রাঙ্গন ছেড়ে যখন শুনি আওয়ামীলীগের ছাত্ররাজনীতি এখন হাইস্কুলের ছেলেপেলের কাছে চলে গেছে, যখন শুনছি কোথাও কোথাও হাইস্কুলের উচ্চশ্রেণীগুলোতে এখন নাকি আওয়ামী ছাত্রনেতা বানানো হয় একজন করে- তখন আমার কেন জানি না হিটলালের সেই শেষ দিকের শিশু-কিশোর যোদ্ধাবাহিনীটার কথা মনে পড়ে! কম্যুনিস্ট রিজিমগুলোতে এভাবে মাস-মোটিভেশন বা জোর করে একটা জনগোষ্টীকে কিছু প্রোপাগাণ্ডায় একীভূত করার কার্যকলাপ চিরদিন থাকে। হতে পারে আওয়ামীলীগ তেমন কিছু ভাবছে। তবে কম্যুনিস্টরা তাদের গোঁড়া আদর্শটাকে চাপায়- তার পেছনে ক্ষমতার পদবণ্টনের মুলো কম ঝোলে! 


কিন্তু এখানে কি সেই কথা? আজকের ১৫ বছরের ছাত্রনেতা ২০ বছরে কলেজ নেতা হবে, তারপর সে যুবনেতা হবে, তারপর সে জনপ্রতিনিধি হবে, পুঁটিমাছ থেকে ক্রমশ একটি রাঘববোয়াল হবার দুর্দমনীয় প্রক্রিয়ায় একটা মানুষ ক্রমশ অমানুষ হয়ে উঠবে! এই তো আমাদের গোটা উপমহাদেশের চিত্র। কতগুলো বাচ্চাদের মাথায় এইসব গুণ্ডাগিরির প্রবণতাকে প্রবাহিত করে নষ্টত্বকে গভীর করার এইসব প্রক্রিয়াকরণ দেখলে আর কি ভরসা জাগে? 


আমি এই আওয়ামীলীগ নিয়ে ভরসা পাই না। হিন্দুর সমব্যথী মরাকান্নার ভেতর প্রছন্ন আওয়ামীপ্রেমে তাই কোন মুগ্ধতা আমার নেই! 



বুধবার, ২২ জুন, ২০২২

স্রোত

 

সদা স্রোতের বিপরীতে বলিতে হইবে এইরূপ তত্ত্বকে আধুনিকতা মনে করি নাই। সর্বদা স্রোতে ভাসিতে হইবে এইরূপ ভাবনাকেও আমি গর্বের বিষয় ভাবিয়া প্রশ্রয় দিই নাই। পুরাতন পুঁথি নির্বিচারে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া কপট প্রগতি দেখাইবার গতি আমার হইল না। পুঁথি আঁকড়াইয়া আমার ন্যায় দীন মানবের জীবনকে অলীকতায় বিপন্ন করিতেও আমার প্রবল দ্বিধা! আমি কেবল স্রোতে হাত পা ছুঁড়িতেছি। আকুল পরাণে নাসারন্ধ্র উর্দ্ধে রাখিয়া চাহিতেছে প্রাণবায়ু!  


সাঁতরাইয়া পাড়ে উঠিতে হইবে এইটুকু আমি জানি। ইহাই চরম সত্য। সত্যভাষণ কাহার পক্ষে গিয়াছে বা কাহার বিরুদ্ধে ইহা লইয়া চিন্তিয়া মরিবার সময় কোথা আমার? সত্যকে কহিতে আপোষ করি নাই। যেটুকু বলিতে হয় সেটুকু বলিয়াছি নিত্য। যেটুকু না লিখিলে আপনারে দায়হীন মনে করি সেটুকু বিনা দ্বিধায় লিখিয়াছি। যেটুকু না ভাবিলে নিজেরে প্রস্তরখণ্ডবৎ বোধ করি সেটুকু নিরন্তর ভাবিয়া চলি। আমার লক্ষ্য পারে যাইবার। এপাড়ে দাঁড়াইয়া ওপাড়ের মহিমা ক্ষ্যাপনে আমার অনুরাগ নাই। আমি বিপুল খরস্রোতে নিজ ক্ষীণতেজ দেহখানি লইয়া সংগ্রামে নামিলাম। দোসর জুটিল কি জুটিল না ইহা ভাবিতে চাহি নাই। কেবা আমার স্তব করিতেছে আর কেবা মুণ্ডুপাত- এ নিয়া পড়িয়া থাকিলে আমার চলে না! 


একদা অন্ধকারে সিদ্ধার্থের মহানিষ্ক্রমণের পথ চলিতে শুরু করিয়াছিলাম। আমি জানিলাম- বুদ্ধ সাজিয়া ওঠা সহজ, হইয়া ওঠা আমায় সাজে না! অনেকে সাজিতে জানে, আমার সে গুণ নাই! আমি দিকে দিকে কুম্ভীরাশ্রু দেখিয়াছি। আমি ধূর্ত শৃগালগণে দেখিয়াছি সিংহচর্মাবৃত বেশে রাজত্ব করিতে। আমি ভাবিলাম কপিধ্বজ-রথ-সারথীর আবাহণে এইবার মসীকে অসী কিবা গাণ্ডীব করিয়া মরিব, দেখিলাম এই কৌরবনিগড় সমাজে এইরূপ কর্মে বিফল মৃত্যুই সার! নিজেরে প্রচণ্ড একা হেরিলাম! আমি একা চণ্ড-মুণ্ড-শুম্ভ-নিশুম্ভদ্বিগের সহিত লড়িয়া পারিব না! সংসার রৌরবতুল্য জ্ঞানে আপনা আপনি জ্বলিয়া মরি। কতক জ্বালা উগরাইয়া দিবার তুচ্ছ বাসনারে অবদমিত করিয়া আত্মপ্রবঞ্চনায় ক্ষয় হইতেছি। চিন্তা চিতাগ্নির ন্যায় রাত্রিগভীরে আমারে দক্ষভবনে অনাহূত কালভৈরবের প্রায় হানা দেয়। আমি ভাবিয়া কূলহারা, আমি স্রোতের টানে কোথা যে চলিতেছি জানিতে না পারি। পাড় যেন দেখিয়া দেখিয়া হারাই, চোখে জলের তোড়, ঝাপটা আসিয়া ঝাঁপসা করিতেছে সম্মুখের দৃষ্টি আমার! 


যাহারা ভাবিতে জানে তাহারা দুখী! যাহারা কহিতে জানে তাহারা সহিতে পারে কম! যাহারা সহিতে শিখিয়াছে তাহারা ক্রমশ হইয়াছে মূক! যাহারা অন্তরলোকে প্রখর আলোকে স্নাত তাহাদের বহিঃদৃষ্টি অন্ধ! যাহারা হৃদয়ে পাতিয়াছে কান তাহারা বধির হইতে চাহে! আমি নিজেরে কোথায় বাঁধিয়া বাঁচি জানি নাই! আমি ভাবিয়াছি আমাকে কহিতে হইবে- এদিকে কথা ক্রমে কোলাহলে আসিলে আমার সহিতে ব্যথা লাগে বড়! অন্তরে আলোর তরঙ্গ খুঁজিতে গিয়া বাহিরের অন্ধকারকে অস্বীকার করিতে আমি পারি না! হৃদয়ে মধুরবাণীর অভিলাষে নিমগ্ন যতই আমি রহি- বাহিরের ক্রুর গর্জন আমার খিড়কি ভাঙিয়া ফেলে যেন! আমি ভাবি- আমি প্রাণপণে ধ্যানস্ত হইব। কে যেন বুকের ভেতর শাবল দিয়া খুঁড়িয়া চলে প্রাণ। কে যেন কাঁদিয়া কহে- ওরে ওরে, চোখ খোল, এখনই থামাবি কি রে গান! যে গান মূমুর্ষের শান্তি, সে নহে, যে গান মরণোন্মুখে দেয় বীরদর্পে মরার ঝংকার- সেই গান হউক! সুখে বাঁচিবার গানও যে রসিকতা লাগে! 


আমি মুক্তি জানি না, আমি মোক্ষ চিনি না, আমার অভিপ্রায় নাই স্বর্গ কিবা সালোক্যের, আমি এই মরতভূমে একটি একক জীবন লইয়া বাঁচিতে কুণ্ঠিত নহি, আমি শুধু চাহিয়াছি জীবনটিকে অর্থবহ করিতে, বোঝাবহ না করিতে! দিকে দিকে ভ্রমিত হইয়াছি! দিকে দিকে সুন্দরকে দেখিয়াছি কেবল সাজসজ্জার সামগ্রী হইতে! সুন্দর সাজাইয়া রাখিবার হয়, সুন্দর হইয়া উঠিবার যেন কিছু নহে! ক্লান্ত হইয়াছি। আশা-নিরাশা-দূরাশা সকলে সরাইলাম দূরে। আমি কেবল বর্তমানে জীবিত রহি। যে মুহূর্ত চলিয়া গেল, যে মূহুর্তটি আসিবে তাহা লইয়া আমার ভাবনা মরিয়াছে ক্রমে! আমি বুঝি যে মূহুর্তে এই ‘আমি’ আছি- সেই মূহুর্তটি জীবন্ত হউক! ইহার অধিক কোন দর্শনের মাহাত্ম্য আমার কাছে নাই! ইহা জড়বাদ নহে, ইহা বাস্তবাদব! ইহা অধ্যাত্মবিরোধীও নহে- ইহা বরং অধ্যাত্মকে জীবনে আনিবার পথ!

বৃহস্পতিবার, ২০ মে, ২০২১

পিছিয়ে থাকা বিজ্ঞানের কথা

 

এই যে ল্যাপটপ থেকে আমি লিখছি, আর যে ডিভাইস থেকে থেকে আপনি দেখছেন ফেসবুকে, হতে পারে সেটা ডেস্কটপ পিসি, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট বা একটা ফোন; এর কোনটা আপনার পূর্বপুরুষের উদ্ভাবন? গরমের দিনে লকডাউন, ঘরে বসে আছেন, আঁধার হলে পিদিম জ্বালাতে হচ্ছে না, বৈদ্যুতিক বাতির ফকফকা আলো জ্বলছে, স্বেদক্লান্তি মেটাতে ফ্যান নয়ত এসি চলছে- এর কোনটা আপনার পূর্বপুরুষদের অবদান? ঘরে বসে বাইরে কি হচ্ছে দেখতে পাচ্ছেন- টিভিতে খবর খুললেই চলছে, ধৃতরাষ্ট্রকে কুরুক্ষেত্র বোঝানোর জন্য কোন সঞ্জয়ের দিব্যচক্ষু লাগছে না, ঘরে বসে নিমিষেই জেনে যাচ্ছেন মিডল-ইস্টে কি কুরুক্ষেত্র চলছে, তাই না? চোখ না বুজেই যে এই মূহুর্তে হাজার মাইল দূরে কি মহাকাণ্ড হচ্ছে তা জানতে পারছেন- এই বিদ্যা কে আনল? দৈনন্দিন জীবনে নিত্য প্রয়োজনীয় হাজার সামগ্রী লাগছে- সব কিছুর mass-production হচ্ছে- বিরাট বিরাট টেকনোলজি, সিংহভাগ কাজ যন্ত্রচালিত- ক’টা যন্ত্র আপনার ঠাকুরদার আমলে আপনার ঠাকুরদার দল বানিয়েছেন? বাসে চড়েন, অটোতে চড়েন, ট্রেনে চাপেন, প্লেনে ওড়েন, আগে বাড়ি থেকে কালীঘাট যেতে সকালে বেরুলে বিকেলে পৌঁছুতেন, এখন মেট্রো চড়লে আধঘন্টা লাগে- মশাই কত সুবিধে- কে করে দিল এসব? কাছের মানুষটিকে চিঠি লিখে একমাস-দুমাস উত্তরের জন্য হা করে বসে থাকতে হত, এখন ভিডিও কল ছাড়া মূহুর্ত কাটে না! তাই না? আগে প্রতিরক্ষায় বল্লম ছুঁড়তেন, এখন রিমোট টিপে মহাশূণ্যে মিসাইল ছোঁড়া হচ্ছে! কার বন্দোবস্ত এসব? কাঠ কুড়িয়ে মাটির চুলোয় রান্না করতেন, এখন গ্যাস আছে, ইনডাকশন আছে! একবার ভেবে দেখুন ২৪ ঘন্টায় চোখের সামনে বা পেছনে যার মধ্যে আপনি নিত্য বসবাস করনে সেই ভুবনের ক’খানা জিনিস আপনার গড়া, আপনার বাবার জেনারেশনে গড়া, আপনার দাদার জেনারেশনে গড়া? কোনটিতে হাত রেখে আপনি বলতে পারেন- this is purely indigenous? আমরাই এর জনক? ক’টা তেমন জিনিস আছে? নিত্যদিন প্রযুক্তির খাঁচায় বসবাস করে যারা anti-materialistic ভাববাদে মজে থাকেন তাঁদের হুঁশ নেই! বস্তুবাদ-পরিপূর্ণ জড়বাদী পাশ্চাত্য ভাবের চরম বিরোধী লোকেদের ধারণা নেই- জড়বাদের অবদান বাদ দিয়ে তাদের একটা দিনও কাটছে না!  ঈশ্বরতত্ত্ব, ভাববাদী দর্শন, পূজা-পাঠ আরাধনায় তুষ্ট হয়ে ঈশ্বর আপনার হাতে একটা এন্ড্রয়েড ফোন আশির্বাদস্বরূপ নিশ্চয় দিয়ে যাননি কোনদিন- যা দিয়ে আপনি এখন দু কথা আমার বিরুদ্ধে লিখতেও হয়ত প্রবৃত্ত হবেন! এই একটি ফোন বড় সহজলভ্য জিনিস- অথচ এর আভ্যন্তরীণ মেকানিজম নিয়ে হয়ত একপাল বিজ্ঞানীকে যুগ যুগ অক্লান্ত ভাবে মেধা খাটাতে হয়েছে! একটি এন্ড্রয়েড ফোন আপনার চারহাজার টাকায় জুটতে পারে- কিন্তু ওই মেধাশক্তি ট্রিলিয়ন ডলার খরচেও আসে না! ওর জন্য সাধনা লাগে!

 

সাধনা শব্দটি শুনলেই আমাদের একটা ধ্যানস্থ অবয়ব ভেসে ওঠে! সাধনা কেবল ঈশ্বরেরই হতে পারে যেন! এখানেই তো ঘেঁটে গেলাম! একটি জাতি নীতিবাক্য হিসেবে ‘রামভরসা’ নয়ত ‘ভগবান যা করেন ভালর জন্য করেন’ ধরে সর্বস্ব ভগবানে অর্পণ করে ক্রমশ অকর্মা হল! সবত্র তো এই দশা! আমাকে এক মুসলমান লোক বললেন- ‘জানেন মুসলমানদের মধ্যে কত বিজ্ঞানী ছিলেন আগে, কত কেমিস্ট, কত মেথমেটিশিয়ান ছিলেন’, আমার সোজা উত্তর- ‘Look at yourself’! তুমি কি হতে পেরেছ? তিনি একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছাড়া বর্তমানে কিছুই নন! কেমিস্ট-ফেমিস্ট হওয়া তো দূর-অস্ত! ওই ধর্মপ্রাণ-হিন্দু-বৌদ্ধ-কেরেস্তান- সকলের এক কথা এখানে, মানে এই দেশে! ভগবানই যা করার করে দেবেন! আমরা কি ছিলাম, কি করেছিলাম সেটা গলা ফাটিয়ে বললে বর্তমান আলোকোজ্জ্বল হয়ে যাচ্ছে কি? প্রতিনিয়ত বিজ্ঞানের ছত্রছায়ায় জীবন যাবন করে বিজ্ঞানকে আরাধ্য না করা, প্রতিনিয়ত পাশ্চাত্যের উদ্ভাবনী শক্তির কাছে অসহায় হয়ে চেয়ে থাকা, সামর্থ্যে যা কুলাবে কিনে নেব- এই চিন্তায় ব্যকুল হয়ে মরা জাত আমরা! আর পরানুকরণে মজে থাকা! ব্যাঘ্রচর্মাবৃত ভেড়ার দল হয়েই আমাদের কি আভিজাত্যবোধ! এই যে আমাদের পাশের চীনাগুলোকে এত গাল দিচ্ছি! ওদের দেখেও কিছু শেখা যায়! ৫০ বছর আগেও চীন আহামরি কিছু ছিল না! এখন বিশ্ব-অর্থনীতির বিরাট অংশ তারা নিয়ন্ত্রণ করে! টেকনোলোজিতে চীনের সাথে পাল্লা দেবার কথা তো আমি এক ছটাক গাঁজা খেয়েও ভাবতে পারব না! তাদের এত সাফল্যের পেছনে রহস্য কি? শাস্ত্রাধ্যয়ণ? পূজা-পাঠ? জপ-তপ? নামাজ-দোয়া?

 

এখন কেউ কেউ এটাও বলবেন- আমাদের সাংস্কৃতিক আবহটা অন্তমূর্খীনতার! এই ভূমি বেদান্তের, সাংখ্যের, যোগের, বুদ্ধের, নানকের! আলবাৎ! তবে আর কি জঙ্গলে কুটীর বানিয়ে ঘি এর পিদিম জালিয়ে শাস্ত্র লিখতে বসে পড়ুন! অন্তর্জগতের দর্শনও তো মরেছে সেই কবে! ধরুন যেই বুদ্ধদেব ‘ভগবান আছেন’ এই কথা খোলাসা করলেন না- এই দেশে তিনিই ভগবান হয়ে উঠলেন! কেন না- আমাদের দর্শনের গভীরতার চাইতেও আঁকড়ে ধরে বাঁচার মত একটা বিশ্বাস চাই! বিশ্বাসের বলয় ভাঙার শক্তি হয় না বলেই এই দেশে গ্যালিলিও, কোপার্নিকাস, ব্রুনো জন্মায় না! তবে আমার উদ্দেশ্যে বিশ্বাসকে আহত করা নয়- শুধু এটুকু বলা বিশ্বাস যদি জাগতিক উন্নতির পথে অন্তরায়- তবে সে বিশ্বাস অরণ্যচারী সাধকের জন্যই ভাল! সাধারণ লোকের বাঁচতে গেলে শুধু বিশ্বাস ধরে বসে থাকলেই হয় না! কাজ চাই, উদ্দীপনা চাই, উদ্ভাবনের শক্তি চাই- সেটা কোন স্বর্গীয় কিতাব দিচ্ছে কি? আর কোন স্বর্গীয় কিতাবেই বা এমন লেখা আছে- ‘হে মনুষ্যগণ তোমরা সদা বিজ্ঞানবিমুখী হইবে!’

 

দুঃখজনক সত্য আমাদের দেশে বিজ্ঞান ধর্মের সাথে সদা-সাংঘর্ষিক! আমি দুটোকে একপাতে রাখার কথাও বলছি না! বস্তুবাদ-ভাববাদ তেল আর জলের মত! বিজ্ঞানের তাত্ত্বিকতা আর ধর্মবিশ্বাস মিশে যাবার জিনিস নয়ই! বিজ্ঞান মানেই সেটা এস্ট্রোফিজিক্স তা নয় গো দাদা! যে কোন ধরণের উদ্ভাবনের পেছনে একটা বৈজ্ঞানিক অভিসন্ধি কাজ করে! আমরা অতীতে তাতে পিছিয়ে থাকিনি। ভারতবর্ষ চিরকাল তার গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, ইঞ্জিনিয়ারিং (দর্শন, সঙ্গীত প্রভৃতি লিখলাম না) এর জন্যও দূরের জাতিগুলোতেও পরিচিত ছিল সহস্রাধিক বছর আগেও! কতটা ধনপ্রাচুর্য্য আমাদের ছিল, এমনকি কতটা ভোগবাদ আমাদেরও ছিল- সেসবের ইতিহাসও আছে- আমরা সেখান থেকে সরে গেলাম কোথায়? কেন? আমরা কি ভোগবাদী হয়ে বাঁচতে চাই না তাই? স্বামী বিবেকানন্দ বলছেন- এই জাতটা ভোগ করতেই শিখল না তো ত্যাগ করবে কি? এতো সেই শেয়াল বলছে দ্রাক্ষাফল টক জাতীয় বক্তব্য হয়ে গেল! আমরা কালের প্রবাহে পিছিয়েছি, আমাদের ভোগ-ঐশ্বর্য্য আততায়ীর হাতে লুন্ঠিত হয়েছে, আমরা আত্মাভিমান বর্জিত হয়েছি, আমরা হাজার বছরের দাসত্বে থেকে নিজেদেরই চিনতে পারছি না, এদিকে pseudo-spiritual হবার লেকচার দিয়ে ভাগাড়ে মরছি! দর্শন, যুক্তি, বিজ্ঞান সব হাস্যকর লাগে! বিরাট বিরাট প্রবচন হয়, মোল্লা-পুরুতের দল মাইকে মাইকে বিজ্ঞানের বক্তব্য নিয়ে খিল্লি করে, অনুভবও করে না যে মাউথস্পিকারটা ধরে আছে- ওটা শ্রীহরি বা আল্লাপাক হাতে তুলে দেননি! ওটাও বিজ্ঞানেরই ফসল! দুর্ভাগ্যজনক হল এটাই এই সভ্যতার সত্য! শয়ে শয়ে সায়েন্স পাশ করে ছেলে মেয়ে বের হয়! তারপর একটা চাকরীর জন্য গাধার মত ছুটে মরা! বিদ্যা চাই- চাকরী লক্ষ্য! বিজ্ঞানচর্চা করার জন্য এই দেশে বিজ্ঞানশিক্ষা হয় না! হাজার হাজার স্কুল কলেজে বিজ্ঞান পড়ানো হয় যেখানে একটা সাধারণ মানের ল্যাবরেটরি পর্যন্ত থাকে না! কেবল বই পড়ে মুখস্ত করা পর্যন্তই চলে! এমন পরিবেশে বিজ্ঞানের অগ্রগতি আশা করা পাগলামি ভিন্ন আর কি হতে পারে?

 

 


শুক্রবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২১

সকলের বন্ধু

 

যারা সকলের বন্ধু হন- তারা বস্তুত কারোই হয়ত বন্ধু হতে পারেন না! যারা ভাবেন ডানে-বাঁয়ে-পুবে-পছিমে সকল পথে পা মেলানো আবশ্যক, তাঁদের সাথে পথচলা বিপজ্জনক! শত্রু বেড়ে যাবে তাই সত্যকে টুটি চেপে ধরে বাঁচতে চাওয়া মানুষটির মিত্রসংখ্যা অনেক হতে পারে, কিন্তু আখেরে এই আকাঙ্ক্ষাও নিষ্ফলা! যশপ্রাপ্তির মোহে লোকরঞ্জনের সকল ভাঁড়ামিতে সিদ্ধ হতে গেলেন- অন্তর কি অন্ধ হয়ে যাবে? হয়ত প্রতিনিয়ত নিজেকে কপটতার জালে ফেলে একদিন আয়নায় মুখ দেখতে যাবেন- জানি আপনি বিচলিত হবে না, কারণ পরিণতির সাথে ততদিনে আপনার অভিন্নতা তৈরি হয়েছে। আপনার সত্বাটি সততার সাথে বেমানান!

 

ঠারেঠোরে, ইনিবিনিয়ে, সোজা কথাকে অবর্ননীয় প্যাঁচে রূপান্তরিত করার কৌশল করায়ত্ত করে তাকে শিল্প নামে বেচা শুরু করেছেন, এও বেচা যাবে এই বাজারে- সে তো বটেই, কিন্তু সোজা কথাটা সোজা ভাবে বলতে না পারার গ্লানি; এক কথায়, এক বাক্যে নিজেকে ব্যক্ত করতে না পারার আত্মদহন কি লাগে না? হয়ত লাগেই না! কেউ কেউ অভ্যস্ত! চাটুকারিতাকে দর্শনের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন অনেকে! এভাবে বাঁচলে হয়ত অনিষ্টের সম্ভাবনা নেই। দু’চার আনপড়, গেঁয়ো, খিস্তি-খেউড় লোকে গালমন্দ কখনো-সখনো করলেও যশলিপ্সু স্ব-গোষ্টীতে সমাদরের অভাব হবে না!

 

আমিও দেখুন কেমন ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে লিখছি সব! আপনাদের মতন সামাজিক হতে শিখছি আর কি! উদ্দেশ্যের কেন্দ্রে কেউ কেউ কি নেই এই লেখার? নিশ্চয় আছেন! যারা ওপরে আলোচিত কথাগুলোর সাথে নিজেদের দৈনন্দিন যাপিত জীবন মিলিয়ে নেবেন- তারা জেনেই যাবেন। চোখ বন্ধ করে ভাবুন- এসব আপনি করেন কি না! আদ্যোপান্ত বিপরীথে থাকা, জীবনের সকল আদর্শের সাথে পরিপন্থী মতাদর্শটিকে মাথায় তুলে দেখাতে চান- আপনি কত উদার, কতটা সহিষ্ণু, সর্বোপরি আপনি কতটা অন্তর থেকে কপট ও মিথ্যেবাদী, অথবা সর্বশ্রেষ্ট ন্যাকা!

 

আমার আপত্তির কারণ- আমি অত্যন্ত বিশ্রী রকমের কট্টর। আমি দ্বিমতের প্রবক্তাটির মনস্তত্ব বুঝি, তাকে কিছু মাত্রায় সহ্য কখনো ভুলে করে ফেলি, কিন্তু দ্বিমত-প্রবক্তার স্তাবককারী তাঁবেদারদের আমি একেবারে সহ্য করতে পারি না! ধরুন হীরক রাজার দু’কথা অতিকষ্টে কানে নিয়েই ফেললাম, কিন্তু তাঁর ভাঁড়ের টু-শব্দটিও ভাল লাগে না! রূপকছলে লিখলাম। কখনো এমন বলছি না যে- সকলকেই এই মূহুর্ত থেকে ঘোরতর স্পষ্টবাদী হয়ে উঠতে হবে, আজ থেকেই যুধিষ্টির হয়ে যেতে হবে- শুধু এটুকু বলা- মিথ্যের সাথে আপোসে থাকা আর মিথ্যাচারের বেশী ফারাক নেই। আপনি পৃথিবীর চরমতম সভ্য আধুনিক মিথ্যুক হতেই পারেন, আপনার শতশত সুহৃদবর্গ থাকতে পারে, কিন্তু আমাকে ওই দলে পাবেন না, এবং আপনাকে রূঢ়ভাবেই বলছি- আপনি কাছে ঘেঁষলে, আপনাকে দূরে না ঠেললে আমার শান্তি হবে না! আপনি আমাকে চিনে রাখুন। আমার কস্মিনকালেও শ’য়ে শ’য়ে বন্ধু লাগেনি, ভবিষ্যতেও লাগবে না! আমার কোন বাজারসৃষ্টির প্রয়োজনও নেই। আমাকে নিজেকে কোন বাজারে বাঁচিয়ে রাখতে হবে না- এতে যা হয় হোক। কেউ গান করেন, কেই আঁকেন, কেউ নাচেন, কেউ লেখেন, কেউ শুধুই বেচেন- যেটাই হোক- আমার মত সেকেলে লোকের কাছে সবই গৌণ, প্রথম বিচারটি হল- আপনি মানুষ হিসেবে আমার কাছে কেমন! তেমনি আমিও আপনার কাছে কেমন?

রবিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২১

বেশ আছি

 

রোজ এই পোড়া ফেসবুকে পড়ে থাকি। পড়ে থাকার দায় নেই, তবে ঠেকা আছে- ঠেকায় পড়ে থাকা যাকে বলে। বাঁচার দায়ে কিছু যোগাযোগ রক্ষা আর কিছু যোগাযোগ বৃদ্ধির ঠেকা আছে! ফেসবুক তাতে কিছুটা সহায়তা করে। দু’চার জন মানুষের সাথে একেবারে বার্তালাপ না রাখলেও মানুষ হিসেবে ‘সামাজিক-যোগাযোগ-মাধ্যম’-সর্বস্ব যুগে একেবারে অসামাজিক হয়ে পড়ব! নিজের ঢাকও একটু পেটাতে গেলে শূণ্য ময়দানে পিটিয়ে কি লাভ হবে? নিজেকে বা নিজের আহৃত সম্পদের ভাগ বেচব ভাবলেও- এই বাজারে তো নামতেই হয়! সেদিক বিবেচনা করেও আছি। আমার তো কদাপি শতাধিক বন্ধুর দরকার নেই! লোকজন সব আমাকে ‘ফ্রেণ্ড-রিকোয়েস্ট’ পাঠিয়ে আমায় গৌরবান্বিত করেছেন, আর আমি প্রত্যহ ফেসবুকে এসে সকলের কিচিরমিচির দেখি! ভাল-মন্দের কথা বলি না, তবে আমার নিভৃতচারী অন্তরাত্মা মাঝেমাঝেই খিন্ন হয়ে ওঠে! আমার স্ব-সৃজিত একাকীত্ব, স্বেচ্ছাকল্প নির্বাসন, আমৃত্যু নিঃসঙ্গপ্রিয় থাকার উদগ্র বাসনার সাথে এই গোটা ফেসবুকীয় ব্যাপারটা একেবারে বেমানান! শুধু ফেসবুক বলে নয়, আমি বাস্তবিক জগতেও তেমন। মুখচোরা নই, তবে মুখটি সর্বদা দেখিয়ে বেড়াতে হবে এমন অভিপ্রায় আমার মনে জাগে না! বরাবরই এমন ছিলাম। চিরদিন আমারই মতন। লোকে হয়ত গোঁয়ার ভাবে, হয়ত ভাবে সমাজবিমুখ, সুহৃদেরা ভাবেন হয়ত আমি উদাসীন! সে যার যা ইচ্ছে ভাবুক- এই আমি বেশ আছি হয়ত বা। নিজেও অতটা নিশ্চিত নই- কোন অবস্থাকে যথার্থ ভাল থাকা বলে! গোটা ব্রহ্মাণ্ডই যেখানে আপেক্ষিত সত্য! কিন্তু আপাতত আমার জীবনে এই ভাবনাটা বেশ যুৎসই ঠেকে! অন্তর্দ্বন্দ্ব কিছু জিঁইয়ে রাখতে নেই। তবু থাকে। যেখানে দ্বন্দ্ব নেই, যেখানে ঘা’ লাগে না, সেখানে সৃষ্টির দ্যোতনা জাগে না! কোন অনুরণন ওঠে না ভেতরে। থমকে যাব। ভেতরে নিজেকে কয়েকভাগ করে ঠোকাঠুকি চলে হয়ত, কখনো মনে হয় আমি স্ববিরোধে মেতে যাচ্ছি- আমার বহিঃপ্রকাশ অস্বচ্ছ, অথবা তা একেবারে নেই। যেটুকু হয়- আমি চাই তাতে শিল্প হোক। কেবল কথা বলার ইচ্ছে, বলার শক্তি আছে বলেই কথা- কথা হয়ে বেরুক, অমন নয়, কথা হোক সুরে ও ছন্দে! আমি যে সেখানেও একা। গাইলেই সকলে গায়ক গায়িকা হয়ে ওঠেন, কিন্তু গাইতে পারার সাথে কবিত্বের দূর দূর তক সংযোগ নেই। লালনের গান গাইতে পারা, আর লালনের মত ভাবতে পারাতে যে আসমান-জমিন ফারাক! আমি যে সেখানেও দূরে সরে গেলাম! দূরে পড়ে রইলাম! আমার দুটো তানপুরা, একজোড়া তবলা, দশটা হারমোনিয়াম, হেনতেন যন্ত্রপ্রকরণ, আর দু একটা জ্বলজ্বলে খেতাবের সঙে মন টানে না! স্বস্নেহে আমাকে অযোগ্যও বলতে পারেন। আমি কষ্ট পাই না। ভরসা টুটতে টুটতে তাতে অভ্যস্ততা জন্মেছে। আমি মাঝে মাঝে জানালার বাইরে নয়নস্থির করে ভাবি- আমি একটা একতারা হাতে মেঠো পথে ঘুরে ঘুরে মরছি! আমার কাউকে কিছু শোনানোর নেই, কাউকে কিছু জানানোর নেই, কিছু বোঝানোর নেই। আমি নিজেকে নিজে শোনাই-

 

‘বড় আশার বাসা এ ঘর

পড়ে রবে কোথা রে কার

ঠিক নাই তারি!’

 

কত কথা, কত কচকচ করে চোখের ওপর বালি, ক্লান্ত হয়ে যাই রগড়ে রগড়ে, একঘেঁয়ে, দৃষ্টি ধূসর হয়ে যাবে! এর মধ্যেই নিয়ত বেঁচে থাকার নিত্য-নতুন প্রচেষ্টা অসহনীয় লাগে আমার। আমাকে কেন এখানেই বাঁচতে হবে? আমি সুখ ও স্বর্গে আস্থা রাখি না, মানুষের আয়োজনে সেজে উঠে শান্তি পাব এমন তত্ত্বেও আমি বিতৃষ্ণ, আমি একেবারে শতবর্ষজীবি মহাবৃক্ষের ন্যায় এক ভূমিতে শেকড় গেঁড়ে শাখাপ্রশাখা প্রসারিত করে বেঁচে থাকব- তেমন প্রাণসম্পদে পূর্ণও নই। আমি একটি অতিশয় ক্ষুদ্র মানব, আমার অভীপ্সা কেবল এই ক্ষুদ্রতাকে আরও শৃঙ্ক্ষলিত না করার। সোনায় গড়া শেকল, যত উজ্জ্বলই হোক- ওর কাজ তো বেঁধে রাখা!  

 

 

আমি এই বেশ আছি। সুখে আছি, দুঃখে আছি- বেশ আছি।

 


বুধবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২০

'আপনারা আমাদের ভাই'

 


‘আপনারা আমাদের ভাই……

 

৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণেও শেখ মুজিবর রহমান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে পশ্চিম-পাকিস্তানীদের নিজের ভাই বলছেন, এতে তাঁর কোন কুন্ঠাও ছিল না, থাকার কোন প্রেক্ষাপটও ছিল না, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও এই ভাতৃত্বের আবাহন শেখ মুজিবর রহমান বন্ধ করেননি কোনদিন। রাজনৈতিক বিরোধ, অর্থনৈতিক নিষ্পেষণ, দিনের পর দিন শোষণ, তাচ্ছিল্য অবজ্ঞা পরিশেষে নৃশংস হত্যাযজ্ঞের হোতা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে তিনিই হাস্যবদনে আলিঙ্গন তো করেছেন! এই আলিঙ্গনকে কি রাজনৈতিক শিষ্টাচার বলবেন নাকি ভাতৃত্বের বাহুবন্ধন? আততায়ীর সঙ্গে কোনটা সম্ভব? ভুট্টোকে তবু যদি বলি মানুষ, আর যদি স্বীকৃত ‘বাংলার কসাই’ (Butcher of Bengal) খ্যাত টিক্কা খানের সাথে শেখ মুজিবরের করমর্দনের কথা ওঠে? টিক্কার তো মানুষ নামটাই ঘুচে গেছে কবে!  

 

সবই হয়েছিল ১৯৭৪ সালেই পাকিস্তানের মাটিতেই OIC সম্মেলনে! এই ১৯৭৪ এ-ই ভুট্টো বাংলাদেশ সফরেও আসেন। যদিও কতিপয় বাংলাদেশী দেশপ্রেমী সেদিন প্রতিবাদ জানাতে সোচ্চার ছিলেন, আজকে তেমন হয়ত হবার কথা নয়! শেখ মুজিবর রহমান দেশনায়ক হিসেবে নিজের স্বাধীনচেতা মনোভাবকে বজায় রাখলেও অন্তর থেকে ‘আপনারা আমাদের ভাই’- সেন্টিমেন্ট থেকে বেরুতে কতটা পেরেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর মাটি খুঁড়ে বের করার প্রয়োজনীয়তাও বা ক’জন অনুভব করেন?

 

নাস্তিক্য ও ইসলাম অবমাননার সেন্টিমেন্টকে তোয়াজ করতে শিখে গিয়েছিলেন তিনিও! “কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নায় কালো বন্যায়” লিখে সেই একই বছর ১৯৭৪ সালে দাউদ হায়দার গ্রেফতার হলেন! মুজিবের নির্দেশেই তাঁকে দেশান্তরীও হতে হল! ইসলামপন্থীদের সেদিনও এত শক্তি ছিল! সেদিন কবি ও কবিতার মুণ্ডপাত হয়েছিল! তবুও মুজিব দোষীই রয়ে গেলেন! আজ তেমনি হাসিনা দোষী! আর সে সময়ের অগোছালো রাজনৈতিক খুনোখুনির চিত্রও ইতিহাসের পরতে পরতে রয়ে তো গেলই! এসব ৭১ এর স্বাধীনতার পরের কথা হচ্ছে!

 

শেখ মুজিবর রহমানের পাকিস্তান বিরোধের সাথে ভাইয়ে-ভাইয়ে দ্বন্দ্বের একটা রক্তপ্লাবী নাটকীয়তা আছে। এই দ্বন্দ্ব যেমন মিথ্যে নয়, আবার তেমনই যতই রক্ত ঝরুক রক্তের টানটাও মুছে ফেলার মত নয়! এটা এক ধরণের পারিবারিক লড়াইয়ের মত ব্যাপার। তিনি লড়াইয়ের মধ্যে থেকেও ভাইকে ভাই বলে ডাকতে তো দ্বিধা করেননি। ভাইয়ে ভাইয়ে কাঁধে কাঁধে মিলিয়েই তাঁরা একদিন স্বাধীন পাকিস্তান হাসিল করেছিলেন। এটা কি ভোলার কথা? একটা ‘ডাইরেক্ট একশন’ স্লোগান আজও বাংলাদেশে হামেশা শোনা যায়! অনেকে জানেনই না এই ‘ডাইরেক্ট একশন’ কোথা থেকে এল? ৪৭ এর ইতিহাস ক’জন পড়ে? ক’জন আর ‘ডাইরেক্ট একশন ডে’ মনে রাখে?

 

আজ বাংলাদেশে কোন বাঙালী পাকিস্তানীকে ভাই বললে কারো এত আপত্তি তবে কেন হচ্ছে? একজন পাকিস্তানী ঐতিহাসিকভাবেই একজন বাংলাদেশীর (অমুসলমানের নয়) ‘ভাই’, একজন পাকিস্তানী ধর্মের নামেও ‘ভাই’! এতটুকু কথা স্বচ্ছ নয়? শেখ মুজিবর রহমান ‘ভাই’ ডাকতে পারলে বাকীরা না ডাকার কে?

 

এই ভাতৃত্বের আবাহন বজায় রেখেও মুজিব পাকিস্তানে ‘গাদ্দার’ আর ‘ভারতের চর’ হিসেবে টিকে গেলেন, আর স্বদেশী পাকিস্তানীদের কাছেও তিনি তাই, উপরন্তু তিনি ইসলামেরও শত্রু! তিনি ভারতের দাস, সেইসাথে তিনি বাংলাদেশে হিন্দুদের বাপ!

 

৭৫ এ মুজিব হত্যার পরের ঘটনা, আমার এক আত্মীয়, তিনি তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েন- তাঁকে তার সহপাঠীরা বলছে- ‘কি রে তোদের হিন্দুদের বাপ তো মরে গেল, এখন তোরা কি করবি?’ ভাবুন তাঁর সহপাঠীদের বয়স কত হবে তখন? যা-ই হোক, সত্যিই আমার সেই আত্মীয় আর দেশে বাস করতে পারেননি। তার পর হিন্দু উৎখাতের নতুন কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে যায়। পাকিস্তান কেবল মাত্র মুসলমানদের আবাসভূমি হবে! এই দাবী কি অন্যায্য? আপনারাই বলুন? নোয়াখালীতে এত হিন্দু কেটেও কি এই ন্যায্য অধিকার আদায় করা গেল না? এতদিন একটা ইসলামের শত্রু ছিল বলেই এটা কষ্টকর হচ্ছিল। এখন আর সমস্যা তো নেই! ৪৭ এর পর, ৭১ এ পাকিস্তানীরা হিন্দু-নিধন শুরু করেছিল পুরোদমে, মুজিব ভারতের সাথে হাত মিলিয়ে কিছুটা বাঁচালেন! কাজটা খুবই খারাপ হয়েছিল বটে! মুসলমানও যে মরেছে এ নিয়ে রাজাকারদের বক্তব্য কি তা আর কার অজানা? মুক্তিকামী মানুষ মাত্রেই ইসলামের শত্রু যে!

 

পাকিস্তানে অনেকে আফসোস করেছিল, যারা সত্যিটা জেনেছিল, তারা বলেন- ‘ইয়া আল্লা! মুসলমান হোকে মুসলমানকি সাথ এইসা বদ-সলুক!’ -গেহর মুসলামনের সাথে হলে একটা কথা ছিল তবুও! এরা মডারেট ধর্মপ্রাণ বান্দা!- গেহর মুসলমান মাত্রেই মুসলমানের শত্রু! তাই তো? অমুসলমান মরলে এতটা বিচলিত হবার কি আছে?

 

আজও বাংলাদেশে স্লোগান ওঠে ‘ইসলামের শত্রুরা হুঁশিয়ার সাবধান!’ এই শত্রু কারা? আমেরিকা-ইজরায়েল? হাসি আটকাতে পারলাম না আর! গোটা পৃথিবীটাই, পৃথিবীর যাবতীয় শিল্প-সাহিত্য-কৃষ্টি আজ তাদের শত্রু হয়ে যাচ্ছে! সমস্যাটা কেবল হিন্দুর সাথে মুসলমানের সংকটে নেই! কেবল প্রতিমা ভাঙচুর পর্যন্ত এতদিন জায়েজ ছিল, এখন হাত মুজিবের ভাস্কর্যেও লাগছে নির্দ্বিধায়! এবং এটাই শুনছি ধর্মসঙ্গত! রাষ্টের যেহেতু একটা ধর্মও আছে কেন না তার বিধি-বিধান ধর্ম না মেনে চলবে। তাই না?

 

মুজিব ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র চেয়েছিলেন। জিন্নাও তেমন ভাবতে চেয়েছিলেন- মুসলিম ম্যাজোরিটি নিয়ে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র, যা পৃথিবীতেও একটিও নেই! এটা সম্ভব নয়। কামাল আতার্তুকের তুরস্ককেও পরে গিয়ে এরদোয়ান-ই জুটেছে। যা হোক এই প্রসঙ্গ নিয়ে ঘেঁটে লাভ নেই। আমাদের আশে পাশের প্রতিটি দেশ গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ হবে- কিন্তু আমাদের একটা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম চাই-ই চাই! এত সুন্দর যুক্তিশীল মননের অধিকারীদের সাথে কি তর্ক?

 

ভাতৃত্ববোধের আলোচনায় আসি। আমার কখনো মনে পড়ে না- মুজিব ‘ভারতীয়রা আমাদের ভাই’ কথাটা উচ্চস্বরে কোনদিন বলেছেন! সেটা বলার মত প্রেক্ষাপট আসেনি। এবং ভুলক্রমে সেটা কোথাও বললে সেই উক্তি তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তির জন্য হানিকারক হবারই কথা ছিল। ভাই না ডেকেও যে গোলামের তকমা নিয়ে ফেলেছিলেন এমনিতেই! আর ভারতেরও কোন অর্থেই ওই আবাহন দরকার পড়ত না। মুজিবের সাথে ইন্দিরার সম্পর্ক, ৭১এর যুদ্ধ সবটাই ভূরাজনৈতিক কারণে সংঘটিত। দু’পাশে দুটো শত্রু আর লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর বোঝা লাঘবের চেষ্টা- ৭১ এর যুদ্ধ। এটাই তো- বাংলাদেশের রাজাকাররা আরেকটু বাড়িয়ে বলে, তারা বলে- স্বাধীনতার পর ভারত লুটপাট চালিয়েছে- যদিও এর পেছনে কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই! এদের কাছে বর্তমানে যেমন ‘হাসিনা ভারতের কাছে দেশ বেচে দিচ্ছে’ তেমনি সেদিন ‘মুজিবও ভারতের কাছে দেশ বেচে দিয়েছিল!’ প্রতিটি রক্তকোষে যাদের হিন্দু ও ভারতবিদ্বেষ তাদের কাছে এই ডায়ালগ পরম্পরা। তারা নতুন নতুন হাস্যকর লজিক যদিও অহরহ আনে। তাদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট করে বলা- ‘ভাই ভারত চিরকালই তোমাদের জাতশত্রু, অতীতে বন্ধু ছিল বলে মিথ্যে যুক্তি টানার কাজ নেই- ৪৭-এই তো প্রমাণ হয়ে গেছে, বারেবারে একে প্রমাণ করার তাগিদ কেন এত? কিসের এত জ্বালা?’ এই জ্বালা নিভবেই বা কি করে? বাংলাদেশ আগামী এক যুগের মধ্যে পুরোপুরি তালেবানি শাসন কায়েম করে ফেলতে পারলেও কি এই জ্বালা নেভানো যাবে?

 

আমি অন্তত কখনো এই কথা বলিনি ‘ভারত ও বাংলাদেশ ভাই-ভাই’! এসব ফালতু কথা। কেউ এসব ফালতু কথা বললে আমার খুব বিরক্ত লাগে। ভূ-রাজনীতি তো জি-বাংলা সিরিয়াল নয় যে রাতদিন সেন্টিমেন্টের খেলা চলবে! তবে একটা ছবি মনে পড়ে আমার-

 

১৬ ডিসেম্বরে যখন ঢাকার রাস্তায় ভারতীয় বাহিনীর ট্যাংক ঘুরে বেড়াচ্ছে, সাধারণ মানুষের কি উচ্ছাস, ফুল ছুঁড়ে স্বাগত জানানো, কেঁদে কেটে বুকে জড়ানোর চিত্রটা মনে আছে আপনাদের? এই চিত্রকে অমলিন রাখা যায়নি! রাখা সম্ভবও নয়। এই চিত্রটা ভাইয়ে-ভাইয়ে মিলনের না হলেও তার চাইতেও বেশী হৃদয়স্পর্শী হয়ে বেঁচে ছিল দীর্ঘদিন। এটা সাময়িক। শুনেছিলাম ফিল্ড মার্শাল মানেক-শ’ নাকি বলেছিলেন- গোটা যুদ্ধটাই ভুল ডিসিশন!

 

মুজিব-ভুট্টোর হাস্যোজ্জ্বল চিত্র দিয়েও রাজাকারপন্থীদের নতুন কিছু বোঝানোর নেই। বাংলাদেশকে পরিপূর্ণভাবে পাকিস্তানের মত করে ফেলতে না পারলে তাদের শান্তি হবে না। এখন তাদের লক্ষ্যমাত্রা পাকিস্তান হবার চাইতেও উন্নততর! তাদের লক্ষ্য কাবুল-কান্দাহারে গিয়ে ঠেকেছে। কাবুল-কান্দাহার যদিও লাহোর-পেশোয়ারকে সহ্য করে না আর! ভাইয়ে-ভাইয়ে প্রেম সেখানেও টেকেনি। এসব সংঘাত নিয়ে পর্যালোচনাও আমার এই লেখার উদ্দেশ্য নয়।

 

আমি অতি সহজ কথায় বললাম- মুজিব পাকিস্তানীদের ভাই ডাকতে কখনো কুণ্ঠিত হন’নি, তাই বর্তমানে কোন বাংলাদেশী পাকিস্তানীদের ভাই বললে তাঁকে পাকিস্তান-প্রেমী রাজাকার ডাকা একেবারে অবান্তর! তেমনি পাকিস্তান ভাই কি ভাই নয় এই আলোচনা আসলেই সেখানে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ করার চেষ্টাও হীনমন্যতা। পাকিস্তান ভাই ছিল এবং ভাই হিসেবেই থাকবে। কতিপয় পশ্চিমবাংলার অতি-উদারতায় রুগ্ন, ইতিহাস বিস্মৃতির আলঝাইমার রোগীর কাছে বাংলাদেশের বাঙালিরা ‘আমাদের ভাই’ জাতীয় আবেগ উৎপন্ন হয়েছে এবং এর সুযোগ্য কোন ফিডব্যাক ওদিক থেকে কদাচিৎ আসেইনি! রাতারাতি ঘর-দোর-জমিজমা-মন্দির আর জমিদারী হারিয়ে, প্রাণটা নিয়ে পালিয়ে এসে, এপাড়ে আধপেটা খেয়ে শরণার্থী হিসেবে দিনাতিপাত করা ওপাড়ের হিন্দুর পরের প্রজন্ম বরাবরই অতীত-ভুলো হয়ে হোক, বা কাল্পনিক মাটির টানে ওদেশ ভোলেনি, ভাই-ভাই মরা কান্নাকে জিঁইয়ে রেখেছে- এদের কি বলা যায় জানি না!

 

আমার বাপের হত্যকারী, আমার মায়ের সম্ভ্রমে হাত দেবার সাহসকারী দানবকে আমি কোন অর্থেই কোনকালে বুকে জড়াতে পারব না! মুজিব ভুট্টোকে বুকে নিতে পেরেছেন! আচ্ছা এটা মুজিবের উদারতা বলে ভুলে যাই বরং! কিন্তু আমি তো উদার নই! আমার অত বড় অন্তর নেই! আমি ভুলতে পারি না! আমি আততায়ীকে ভাই বলার মত মহাপুরুষ নই! আমার ভাইয়ের দিকে যার ছুরি ওঠে সে আগামী সাত জন্মেও আমার ভাই হবে না! কোনদিন হতেই পারে না! সে বাঙালি কি পাঠান, কি মুসলমান কি গেহর মুসলমান! আমি তাকে আততায়ী বলেই আগামী সাতজন্ম চিহ্নিত করে রেখেছি!

 

কোন বাংলাদেশী কোন পাকিস্তানের সাথে কি সূত্রে ভাই হচ্ছে এই বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ও আপত্তি নেই, সে যদি আমাকে ভাই ডাকে তাতেও আমি খুশী, সে যদি আমার দিকে ছুরি উঁচিয়ে চলাকে ধর্ম ভাবে- তবে ভাই আমি গদগদ প্রেমবাক্য বলতে পারি না, আমি সপাটে তলোয়ারটা চালাব!

 

ভাই-ভাইয়ের গল্প আমার ঢের শোনা আছে!

 

 

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

লাইট-মিউজিক

 

অনেকে কিছু গানকে ‘Light-Music’! Anything apart from Classical Music is ‘Light Music’! এই সংজ্ঞাটিকে ইংরেজীতে প্রশস্তি করলে বলা যেতে পারে ‘Bullshit’! এর চেয়ে ভদ্রস্থ কিছু আসছে না! প্রত্যেক Genre এর গানের একটা নির্দিষ্ট বিশেষত্ব ও আলাদা সাধনার পদ্ধতি আছে! বিশুদ্ধ মার্গসঙ্গীত গাইতে শুদ্ধ বৈয়াকরণিক হতে হচ্ছে, সাথে ভাবের মাহাত্ম্যটিকেও অক্ষুন্ন রাখতে হয়- দুদিক রক্ষা কষ্টকর বটেই! কিন্তু ঠুমরীর আবেগ, ঠুমরীতে স্বজ্ঞানে কয়েকটা এদিক-ওদিক স্বরের মিশ্রণের যাদু দেখানো খুব light-weighted কাজ নাকি? ধরুন গজলের কথা, পূজনীয় ভীমসেন যোশী যদি ওস্তাদ মেহেদি হাসানের গজল গাইবার চেষ্টা করতেন সেটা কেমনতর শোনাত? And the vice-versa! একজন বাউলকে সঙ্গীত-সিদ্ধ হতে গেলে ৩০ বছর ব্যাকরণ শিখতে হয়? হয় না তো! সঙ্গীতের ছোট-বড় জাত কি আবার? সঙ্গীত আদ্যোপান্ত ভাবের বিষয়- এটা এর প্রথম শর্ত, দ্বিতীয় শর্ত- একে আত্মস্থ করা স্ব-বশে রাখার জন্য সাধনা চাই! সব রকম গানের বেলায় খাটে! ৫০ বছর খেয়াল গাইলে, ২০০ রাগ রাগিনী কণ্ঠস্থ করে ফেললেও কারো একটি প্রাণস্পর্শী শ্যামাসঙ্গীত গাইবার যোগ্যতা জন্মে যাবে না! তাতে সুরের সাথে সাথে ভাব ও বাণীর সাধনাও লাগে! এ বড় বাজ্ঞেয়কারী কাজ! তেমনি লালন গাওয়াও যেন আজকাল পান্তাভাত?

 

মার্গসঙ্গীতে ব্যাকরণের শুদ্ধতা প্রয়োজন, ব্যাকরণ দেখানোর জন্য নয়, ব্যাকরণ-সর্বস্ব হবার জন্য নয়; ব্যাকরণের ভেতর দিয়েই রাগের ছবিটিকে ভাবরঞ্জিত করে ফোটানোর জন্য! আজকাল যারা ভাব-ব্যঞ্জনা বাদ দিয়ে কেবল ব্যাকরণের অলঙ্কারটির উপস্থাপনটিকেই শাস্ত্রীয়-সঙ্গীত বলে জাহির করে বেড়াতে সদা তৎপর, যারা রাগের ভাব-শরীরটি বাদ দিয়ে ব্যাকরণ-কঙ্কালটিই কেবল আরাধ্য করেন- তাদের মনে হচ্ছে বাকী সব গান ‘Light-Music’! দুর্ভাগ্য-বশতঃ আর্য্যাবর্তের সঙ্গীতের বিবর্তনের রূপরেখা এদের কাছে স্বচ্ছ নয়! (বস্তুত সঙ্গীতের concept-টাই অপক্ক দেখায়!) কত লোকজ-সঙ্গীতের স্বরের-কাঠামোটি কালে কালে শুদ্ধ রাগ-রাগিনী হয়ে উঠে এল তারা দেখেন না তা! মনে প্রশ্নও জাগে না- ‘ব্যাকরণ আগে এলো, নাকি সঙ্গীত?’

 

সঙ্গীতটিই যদি আদি হয়, তবে সকল সঙ্গীতের ভেতর ব্যকরণ খোঁজাটা তো মূর্খতা! সকল সঙ্গীত তো ব্যাকরণের আলোতে বিচার্য্য হবে না!

 

 

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

শিল্প ও স্বাধীনতা

 

স্বাধীনতা মানে উচ্ছৃঙ্খলতা নয়, তেমনি শৃঙ্খলা মানেও পায়ের শৃঙ্খল নয়। যথেচ্ছাচার যেমন কোন আচার নয়, তেমনি আচারে হস্ত-পদ বদ্ধ করে রাখাও সম্ভাব্য অনাচার আনয়নের ঔপচারিকতা মাত্র! বিরিয়ানিকে বিরিয়ানির স্বাদটা বাঁচিয়ে রেখে নিজের কায়দায় রাঁধলে সেটা স্বাধীনতা ও শৃঙ্খলা দুটোই রক্ষা করে, কিন্তু বিরিয়ানি রাঁধতে গিয়ে ওটাকে প্রায়-খিচুড়ি বানিয়ে ফেললে- তাকে স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে চালিয়ে দেয়া তাত্ব্বিকভাবে অন্তত সম্ভব নয়। তেমনি বিরিয়ানি যদি কেবল ভাতের তলায় মাংস বিছিয়ে দেবার রন্ধন কায়দা হয় তাহলে তা দিয়ে রাঁধুনীর মুখ-রক্ষার কাজও ঠিকমত রক্ষা হয় না! বক্তব্যের উদ্দেশ্য হল- বিরিয়ানিকে নিয়ে যত গবেষণাই হোক- পাতে তুললে, মুখে পুরলে যেন মনে হয়- হ্যাঁ এটাই বিরিয়ানি- হায়দ্রাবাদী হোক, কি করাচীর, কি কোলকেতার- দিস ইস ইট! এটা বোঝানো।

 

আমাদের কেবল জানতে হবে মসলাটি কি? মসলাই তো আসল জিনিস দাদা!

 

ধরুন রবি ঠাকুরের গান গাইছেন, স্বরলিপির এক মিলিমিটার এদিক ওদিক হয়ে গেলেই নরকে পতিত হবার ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে গাইতে হচ্ছে! ধরুন বিরিয়ানির ভাত সেদ্ধ হচ্ছে ঠিকটাক, মাংস সেদ্ধ হল ঠিকঠাক, সব হচ্ছে, মসলাটা ঠিক হচ্ছে না শুধু, সুগন্ধ আসছে না - এই মসলাটি হল ভাব! ভাব ব্যতিরেকে সঙ্গীত- কোন সঙ্গীতই তো নয়! আবার ধরুন সুগন্ধ হচ্ছে না দেখে বিরিয়ানির ওপর ম্যাগি-মসলা ছিটিয়ে দেয়াও তো ভাল বুদ্ধি নয়! রবীন্দ্রনাথের গানে রবীন্দ্রভাবনার নিজস্ব মসলা আছে। তাতে গজল-ঠুংরী-পপ-ব্লু’সের মসলা ছিটাতে হয় না! আবার রামপ্রসাদী গাইতে গিয়ে ওটা রবীন্দ্রসঙ্গীত বানিয়ে দিলেও বদখত লাগে! প্রতিটি সঙ্গীতের ক্ষেত্রে এরকম একটা পরিমিত, মার্জিত তথা ভাবের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন লালিত্যপূর্ণ বোধ জাগিয়ে রাখা উচিত। নইলে গাইলেই হয়ত গান হবে- কিন্তু তাতে প্রাণ থাকবে না! মসলা ছাড়াও হয়ত দেখতে বিরিয়ানি হয়ে যাবে কিছু একটা, খেতে গেলে অমন মনে হবে না!

 

আমরা সবাই গাইতেই পারি। গাইবার স্বাধীনতা আমার আছে। গাইতে গেলেই আমাকে আগেই একজন সঙ্গীত-তত্ত্ব-বিশারদ হয়ে উঠতে হবে কেন? গান মানব-মনের একটা আদিম, অতি স্বচ্ছ্‌ল, সাবলীল অভিব্যক্তি। একটা গান গাইবার অধিকার শ্রীকান্ত আচার্য্যের যেমন আছে, একজন রিকশাচালকেরও ততটুকু আছে। এই অধিকারের প্রসঙ্গে আলোচনা কিন্তু করছি না। তাত্ত্বিক স্তরের আলোচনা যে সকলের জন্য নয় এই কথাটা বোঝার জন্য আরেকটি তত্ত্ব-বিশ্লেষণের দরকার হবে না আশা করি। ক্ষিদে পেলে খাই আমরা, খাবারের অধিকারী হবার জন্য রান্না জানা জরুরী? এটা কোন যুক্তি?

 

এক গাদা রাগ-রাগিনী শুদ্ধভাবে না জানলে গাইবার উপযুক্ত হলাম না! অমুক বাবুর গানের বইয়ের স্বরলিপির পান থেকে একটু চুন খসাচ্ছি বলে আমি জাতিচ্যুত হয়ে যাচ্ছি! অমুক খেয়াল গাইতে গিয়ে ওটা টপ্পা হয়ে গেল! ধ্রূপদ গাইছেন মনে হচ্ছে আগ্রার খেয়াল! হেন তেন শতপ্রকারেণ- বাতচিত বিতণ্ডার একটা মানসম্মত সমাধান খুঁজতে গেলে সঙ্গীতের গভীরতা, রসবোধ, সাধনের প্রণালী প্রভৃতি নিয়ে বিস্তৃত অধ্যয়ণ প্রয়োজন। নইলে ‘অন্ধের হস্তিদর্শন’ জাতীয় যত্তসব কাণ্ড হতেই থাকবে আর তা নিয়ে চলবে ঠোকাঠুকি অনন্তকাল। সর্বসাধারণের জন্য এইসব শিক্ষা স্ববিস্তারে প্রয়োজন তা নয়- কিন্তু তাঁদের মধ্যেও উচ্চতম আদর্শটি অন্তত প্রসারিত হওয়া উচিত। সকল লোকে সাধু হয় না, কিন্তু সাধুর চরণধুলি তো নিতে যায় প্রায় সকলে! আমরা যে আদর্শই মানি না কেন, অন্তত মহত্তম আদর্শটি যেন যোগ্য সম্মান লাভ করে তার জন্য সেই আদর্শের পরিচিতিও তো চাই!

 

আমার কথার সারমর্ম হল-

 

আমি স্বাধীনতার বিপক্ষে নই। মানুষ স্বভাবে স্বাধীনতাপ্রিয়, জীবনের অন্যতম লক্ষণ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু ‘স্বাধীনতা’ কেবল একটা শব্দ মাত্র নয়! দানবের কাছে স্বাধীনতা উন্মত্ততা! আত্মনিয়ন্ত্রনহীনতা কখনো শুভ-অর্থে স্বাধীনতা নয়। শিল্প প্রসঙ্গে বরাবরই এই কথা উঠে এসেছে যে -শিল্পী স্বাধীনতা সৃষ্টি করেন। এটা তো সত্যি বটেই। তার আগেই বুঝতে হবে আমি আদৌ শিল্পী-পদবাচ্য কি না! অপরের শিল্পের ওপর হাত চালানোর মেধাকে শিল্প বলে এমন কথা আমার জানা নেই।

শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২০

সম্প্রসারণ ও শিক্ষা

একটি তত্ত্ব, কি একটি মতবাদ, কি একটি শিল্পভাব যতই উচ্চ হোক, যতই নিগুঢ় হোক- যখন আমরা চাই এটি সর্বজনীন হোক, যখন আমরা চাই এটি সবার মধ্যে বিকশিত হোক- তখন আমরা যেন এটা মেনে নিতে উদার থাকি যে- সর্বসাধারণে সম্প্রসারণ মাত্রেই সংমিশ্রণের দ্বার অবারিত করা। আজ যে গানটি আমি গাইলাম- আমি যদি চাই এই গান গোটা পাড়া গাইবে- তবে আমার বোঝা উচিত গোটা পাড়া আমার কণ্ঠের অনুকরণ করে গাইবে না, কারো নিজস্বতা আসবে, কারো অক্ষমতার দরুন তাতে বিকৃতি ঘটবে, কেউ ইচ্ছে করেই হয়ত বিকৃত করবে- ইত্যাদি ইত্যাদি ব্যাপার তাতে অবধারিত। তবে কোনটি রূপান্তর আর কোনটি রূপের আত্যন্তিক বিপর্যয় এটা কে ঠিক করে দেবে এ নিয়েই দ্বন্দ্ব চলছে!


একদল আদিবাসীকে দেখেছিলাম খোল-করতাল নিয়ে যীশুর নামগান করতে। ধর্মান্তরিত হবার আগে তাঁদের পূর্বপুরুষ খোল-করতাল নিয়ে কৃষ্ণনাম গাইত। যীশুর ধর্ম এসে কৃষ্ণের নামটি তুলে নিলেও খোল-করতালটি তুলে নিতে পারেনি। যারা যীশুর নাম প্রচারে নেমেছিলেন- তাঁদের এটা মানতেই হবে যে যীশুর নামটার প্রচারই উদ্দেশ্য, খোল-করতাল দূরীকরণ নয়। যারা তত্ত্ব সম্প্রসারণের সাথে সাথে প্রাগ-ভাবটিও বিনষ্ট করতে চাইবেন, তাঁদের পথে শতেক বাধা। এখানে অবশ্য এ কথারও স্পষ্টীকরণ দরকার- প্রাগ-ভাবটি সর্বৈব অর্থে সঠিক ছিল কি? যে মসুর ডাল রান্না জানে, তাকে বিউলির ডাল রান্না করতে গেলে কি মসুর ডাল রান্না ভুলে যেতে হবে?

আবার একটা সাধারণ বিপরীত যুক্তি দিই। যেমন গান শেখাতে গিয়ে দেখেছি ছাত্র হারমোনিয়াম না টিপলে নিজের ‘সা’টিও গাইতে পারে না! আমি বলি ‘বাছা এ তো আমাদের দেশী যন্ত্র নয়, যখন হারমোনিয়াম ছিল না, তখন লোকে গান কি করে করত? তারা সরগম কি করত না?’ প্রশ্ন শুনে ছাত্র মাথা চুলকায়। তবে এতকাল কি করে এলাম? একটা যন্ত্র আমার কন্ঠ পরিচালনা করছে, অথচ উচিত ছিল আমিই যন্ত্রটিকে আমার আজ্ঞাধীন করব! তা-তো হল না। এই হল উদাহরণস্বরূপ আমার ছাত্রের প্রাগভাব। এখন তাকে শুদ্ধরূপে স্বরগ্রাম শিক্ষা দিতে গেলে আমাকে প্রথমেই এই ধারণা সৃষ্টি করে দিতে হচ্ছে যে – তোমার পূর্ব প্রক্রিয়াটি একটি প্রমাদ! তখন সকলের পক্ষে একটি নবারম্ভ দুষ্কর হয়ে ওঠে। এবং প্রত্যেকে এরকম আরম্ভের পক্ষেও নেই। অর্থাৎ যে মসুর ডালটিও ভুল-ভাল রাঁধে, তাকে বিউলির ডাল রাঁধতে দেয়ার আগে, মসুর ডালটি ঠিকঠাক শেখালে তো ভাল! মন্দ কি? কিন্তু ভুলটিতেই যখন আমরা এতটা অভ্যস্ত, এতটা আশ্বস্ত- তখন নতুন করে আরেকটি ‘শুদ্ধ’ হাজির করলে সেটাই বরং বিরক্তিকর লাগে!

অতএব আমরা চেয়েছি, সকলে সু-শিক্ষার্থী না হলেও সঙ্গীতের উচ্চরূপ সকলের কাছে পৌঁছাক। তারপর অধিকারীভেদে যে যেমন পারবে সে তেমন প্রচেষ্টায় কিছু শিখবে। অনেকে শিক্ষার মাধ্যমটিকে সহজতর করার জন্য নতুন নতুন রূপরেখা আবিষ্কার করতে কৃতসংকল্প হয়েছেন। কিন্তু সহজে লভ্য হলেই অনেক জিনিসের গুণমানে লঘুত্ব যে আসে- এ কথা প্রকাশ্যে ক’জনে স্বীকার করে? সর্বজনমধ্যে সম্প্রসারণের বড় সংকটটি এই যে- গুরুতত্ত্বও ক্রমে লঘুতত্ত্ব হয়ে আসে, এবং সেই লঘুত্ত্বের গুরুভাব দর্শানোর জন্য তারপর আর কয়েকটি নতুন তত্ত্বের আবির্ভাব ঘটিয়ে একটি হজবরল বিষয় বানিয়ে নিতে হয়। সঙ্গীতকে কেবল একটি রূপক হিসেবেই ধরে দেখুন। সঙ্গীতের জায়গায় সাহিত্য, রাজনীতি, ধর্ম এসবও বসান- দেখবেন সব এক তরীতেই উঠে গেছে ডুববে বলে।

কেউ বিরিয়ানি রান্নার চেষ্টা করে দেখল, তারপর ওটা খিচুড়িতুল্য কিছু হল- এবার একে একটা আলাদা নামকরণ করে লোকের পাতে ও জাতে তোলার দায় পাচকের, এবং স্বাধীনতা ও সর্বজনীনতার দোহাই দিয়ে এ কার্য্যও সম্ভবপর হচ্ছে। যারা শিল্প ও মতবাদের স্বাধীনতা ও সর্বজনীনতা কামনা করেন- তাদের সিংহভাগকে দেখেছি- নিজের অপারগতাটিকে বৈধতা দেবার প্রয়াস করে যাচ্ছেন। যখন আমার আদর্শটি উচ্চ, অথচ আমি তাতে পৌঁছুতে পারছি না, অতএব একে টেনে হেঁচড়ে নিচে নামিয়ে এই দাবী করা- একটি নতুন আদর্শ আমরা তৈরি করলাম। নবকলেবরের নব নাম দেয়া যেতেই পারে, তবে অজ্ঞ পাচক খিচুড়ি রেঁধে বিরিয়ানি বলে খাওয়াতে গেলে সে খাবার সবার মুখে হয়ত রোচবে না! কিন্তু তাও লোকে খাবে। লোকের খাদ্য আগে চাই, বিশ্লেষণে কিছু যায় আসে না। আপামর জনগণ গান শুনবে- গানের ব্যকরণ জানা তাদের কাজ নয়! কিন্তু তারাই ভাল-মন্দের নির্ণায়ক হয়ে যদি ওঠেন?

সুন্দর মাত্রেই সর্বজনীন, সুন্দরের চর্চার অধিকার সকলের আছে- এই কথাতে আমার কোন আপত্তিই নেই, কিন্তু অধিকার থাকলেই সকলে চর্চার ‘অধিকারী’ হন না। ‘অধিকারী’ হবারও একটি সাধন-প্রণালী আছে। অনধিকারীর হাতে উত্তম কিছু গেলেও অবশেষে ‘শিব গড়তে বানর গড়া’র মতন কিছু হয়ে যায়। এতে অনধিকারীকে আমি দোষ দিচ্ছি না, তার শিল্পচেতনাকেও দিচ্ছি না, তার সমর্থকদেরও দিচ্ছি না, আমরা সবাই উচ্চ তত্ত্বের রসজ্ঞ হব না, তাই এমনটাই বরাবর হয়। সাঁওতালী গানে যে মাদলের তালে নাচে, সে দ্রুত-খেয়ালের তবলার ঠেকাতেও নড়বে- তার কাছে শরীরে দুলুনি লাগাটাই মূখ্য। এ কথা অনস্বীকার্য্য যে -আমরা প্রায় সকলেই বিষয়ের মূল্য নির্ধারণ করি আমার ওপর তার প্রভাব বিচার করেই, আমাদের ভাল লাগাটাই যেন শিল্পের সার্থকতা- এরকম একটা কথাও আমরা প্রায় প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছি। অর্থাৎ ‘লোকে যারে বড় বলে সেই বড় হয়’! কিন্তু আজকের সমাজ এই কথার বিপরীত মেরুতে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে না? অথবা চিরকালই ‘লোক’ কি খুব সমঝদার ছিল?

একটা কিছু লোকের মধ্যে ছড়িয়ে দেব ভাবলেই সেই একটা কিছুর খুব উন্নতি হয় না- যদি একটা কিছু ছড়িয়ে দেবার জন্য একটা সুন্দর পরিকাঠামো না তৈরি হয় আগে।

শনিবার, ৬ জুন, ২০২০

চট্টগ্রামের ঘূর্নিঝড় (টাইমলাইন - ১৯৯০ থেকে।)


১৯৯০ সাল থেকেই একটা লিস্ট দিচ্ছি ঘুর্ণিঝড়ের যা বৃহত্তর চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে গেছে। (তার আগের কথা আমার বয়সকালে উপলব্ধির বাইরে তাই বাদ দিচ্ছি!)

________________________

১। ১৮ ডিসেম্বর ১৯৯০- কক্সবাজার উপকূল। মৃতের সংখ্যা নিয়ে তথ্য নেই।

 

২। ২৯ এপ্রিল ১৯৯১- চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি ভয়াল দিন। মৃত ২ লক্ষের কাছাকাছি। বাতাসের গতিবেগ ঘন্টা প্রতি ২৪০ কিলোমিটার।)

 

৩। ৩১ মে ১৯৯১, অর্থাৎ মাত্র একমাস ব্যবধানেই দ্বিতীয় ধাক্কা! সমস্ত দক্ষিণবঙ্গে আঘাত হানে। চট্টগ্রামে কিছুটা কম।

 

৪। আবারো ২৯ এপ্রিল, তবে ১৯৯৪। কক্সবাজার। মৃত সরকারী মতে ৪০০। বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ প্রতি ঘন্টায় ২১০।

 

৫। ২১ নভেম্বর ১৯৯৫।  কক্সবাজার। মৃত- সরকারী মতে ৬৫০। বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ প্রতি ঘন্টায় ২১০।

 

৬। ১৬ মে ১৯৯৭। চট্টগ্রাম উপকূল ও সংলগ্ন অঞ্চল। বাতাসের গতি ঘন্টায় ২২৫ কিলোমিটার। মৃত সরকারী তথ্যে ১২৬।

 

৭। একই বছরে আবার। ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৭।  চট্টগ্রাম উপকূল ও সংলগ্ন অঞ্চল। বাতাসের গতি ঘন্টায় ১৫০ কিলোমিটার। মৃতের সংখ্যা নিয়ে তথ্য নেই।

 

৮। ১৬ মে ১৯৯৮।  চট্টগ্রাম উপকূল ও সংলগ্ন অঞ্চল। বাতাসের গতি ঘন্টায় ১৫০ কিলোমিটার। মৃত সরকারী তথ্যে ১২৬।

 

এবার ২০০০ সালের হিসেব-  (এখন থেকে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ চালু)

 

 

৯। সাইক্লোন আকাশ। ১৫ মে, ২০০৭। চট্টগ্রাম উপকূল। মৃতের সংখ্যা ১৪। বাতাসের ঘন্টাপ্রতি গতি ১১৫।

 

১০। সাইক্লোন মহাসেন। ১৬ মে ২০১৩। চট্টগ্রাম উপকূল। গতিবেগ ৮৫ কিলোমিটার ঘন্টায়। মৃত ১৭ জন।

 

১১। সাইক্লোন কোমেন। ২৯ জুলাই, ২০১৫। চট্টগ্রাম উপকূল। গতিবেগ মাত্র ৭৫ কিলোমিটার ঘন্টায়। তবুও মৃত ১৩২ জন।

 

১২। সাইক্লোন রোয়ানু। ২১ মে ২০১৬। চট্টগ্রাম উপকূল। বাতাসের গতি ছিল ঘন্টায় ১০০ কিলোমিটার। মৃত ২৬।

 

১৩। সাইক্লোন মোরা। ২৯ মে, ২০১৭।  চট্টগ্রাম উপকূল। ঘন্টাপ্রতি ১১০ কিলোমিটার গতিতে আঘাত হানে। মৃতের সংখ্যা ১৮।

 

 

 

 

* যা এখানে লিখলাম না-

 

আপনারা অনেকেই ভাবছেন আরো বিরাট বিরাট কতক ঝড়ের নামোল্লেখ নেই কেন? এ কথা সত্যি যে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ছোট বড় সকল ঘুর্ণিঝড় উপকূলে- তা ল্যান্ডফলের স্থান থেকে যত দূরেই থাক না কেন- কোন না কোনভাবে একটা প্রভাব ফেলবেই! এখানে যেহেতু কেবলমাত্রে বৃহত্তর চট্টগ্রাম (আমার জন্মভূমি) অঞ্চলে ল্যান্ডফল করা ঝড়গুলোর কথা লিখছি তাই- বাংলার (পূর্ব ও পশ্চিম) দক্ষিনাংশ দুমড়ে মুচড়ে যাও্য়া সিডর, আইলা, বুলবুল- প্রভৃতির কথা একেবারেই টানিনি। একটা আশ্চর্য্যের ব্যাপার লক্ষ্য করুন- ১৯৯৮ এর পর থেকে চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে কোন অতিমারী ঝড় যায়নি! যা গেছে সব দক্ষিণবঙ্গ, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার ওপর দিয়ে। আর এই ক’দিন আগের আম্ফান তো কোলকাতাকেও কাঁদিয়ে ছাড়লো!

 

ঘুর্ণিঝড়ে সৃষ্ট বিধ্বংসী জলোচ্ছাস মানুষের পাশাপাশি গবাদি ও বন্য পশুর বিনাশ করে! এসব ঝড়ে নানাবিধ মানবসম্পদের ক্ষয়ক্ষতির বিপুল পরিমাণের কথাও অনুল্লিখিত রাখলাম এখানে।

 

এই পোস্টটি তাদের জন্য- যাদের জন্ম সাগরপাড়ে নয়! তাদের অনুভবের বাইরে- আমরা কিভাবে বেড়ে উঠেছি! আমরা কালবৈশাখী দেখে মূর্ছা যাবার প্রাণ ধরিনি! ঝড় আছড়ে পড়ার আগ পর্যন্ত আমরা ফুটবল খেলে অভ্যস্ত। তবে আমরা জানি- দুর্ভোগ শুরু হতে যাচ্ছে!  যারা সাগর থেকে অতি দূরে থাকেন, তাদের অনুরোধ ঝড় নিয়ে মজা –মশকরা করবেন না। এ ঝড় কালবৈশাখীর মেঘ দেখে মল্লার কি সারঙ গাইবার নয়!

মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২০

পাখির গল্প


সারি সারি খাঁচাতে আমরা কতক পাখি ছিলাম। স্ম্রৃতির উন্মেষ অবধি আমরা জেনেছি এই খাঁচার নামই জীবন, এখানে থাকার নামই বাঁচা, ডানা মেলতে না পারাটাই একদেশিকতা, স্বদেশীকতা, অথবা বল স্বদেশপ্রেম- অথবা আর যা খুশী বলে ফেলো, যা ইচ্ছে ধরে নাও!

আমাদের মধ্যে কিছু পাখি বেশী ডানা ঝাপটাতো বলে ওদের হয়ত আরেকটু বড় খাঁচায় রাখা হত। যাদের ঝাপটানোর বেগ বেশী থাকত, লম্ফঝম্প থাকত- তাদের পায়ে শেকল পড়ানো হত! এই শেকলটিকে আমরা আইন-শৃঙ্ক্ষলা-নিয়ম-কানুন বলে সমীহ করতাম! কিছু পাখি এতেও দমে যেত না! কোনদিন ঘুম ভাঙলে দেখতাম সে পাখি আর খাঁচাতেই নেই! কোন পাখির না থাকা নিয়ে আমাদের প্রবল মনোকষ্ট হত না। পাখি হলেও আমাদের মধ্যে কিছু কিছু মানুষের চরিত্র তো থাকতেই পারে! এভাবে বললে মানুষেরা নিশ্চয় রাগ করবে না!

এভাবে কত পাখি হারিয়ে যায়, আর খাঁচায় ফেরে না! আমাদের তাতে কি! আমরা দিব্যি আছি! নিত্যকার খাবার খাই, কিচিরমিচির করি, (সাহিত্যিকেরা কলকাকলী বললে গর্বে পালক ০.০০১ ইঞ্চি ফুলে যায়!) শৌচকর্ম করে ভরিয়ে রাখি, কিন্তু ডানা স্তিমিত! আমাদের প্রায় সবারই ডানা এখন অকেজো! আমরা অনেকে ভুলেই গেছি যে আমাদের ডানা আছে, আমাদের মনেও পড়ে না ডানা কি কাজের জন্য বিধাতা আমাদের দিয়েছেন! কারো কারো মধ্যে, যাদের মধ্যে প্রাণীজ স্বভাবের প্রজাতিগত তাড়না প্রবল তাদের খুব সংকট। কেমন করে না চাইলেও যেন ডানা আকাশে উঠতে চায়! এটা কি ভাল? এটা অসংযম নয়? স্বেচ্ছাচারিতা নয়? যে খাঁচায় যে নিয়ম- সেখানে তেমন পালন করা কি উচিত নয়? কিন্তু সকলের দ্বারা হয়ে ওঠে না! হয়ত পাখির কাছ থেকে চিরতরে পাখিত্বটুকু মুছে ফেলা যায় না! সকল পাখির জীবন খামারের হতশ্রী মুরগীর মত হবে না; যেমনি উড়তে অকেজো হলেও সকল পাখি ময়ুরের মত রাজকীয়ও আবার নয়! আমরা পাখিদের মত মানুষের তো আর শতেক প্রজাতি নেই- থাকলে হয়তও ওরাও এক প্রজাতি অন্য প্রজাতির সাথে নিজেদের তুলনা দিয়ে কথা বলত! তারা তা করতে পারে না, খামোখা আমরা- মানে অন্য প্রাণীগুলোকে টেনে এনে অপদস্থ করে! মানুষের সাথে গরু, ছাগল, ভেড়া, কুকুর, হাতি, বাঘ, সিংহ, শুয়োর, গাধা, কাক, কোকিল, মুরগী- এসবের ন্যায্য তুলনা কি সম্ভব? কিছু মানুষ নিতান্ত মানুষের চরিত্র বিবেচনায় এদের চরিত্রের চেয়েও নিচে কি নয়?

আচ্ছা এসব কথা ছাড়ি! কিছু পাখি ডানা হারিয়ে এখন কেবল ভাবার শক্তি বাড়িয়ে নিয়েছে! এরা ভাবুক পাখি! যে কখনো ওড়েনি- আমরা তাঁর কাছে আকাশের গল্প, আকাশের হাওয়া, আকাশের দর্শন শুনতাম! কিছু পাখির জীবনে সুখ কেবল কল্পনা, এবং কল্পনা মাত্রেই সুখের! আমিও ভেবেছিলাম- আমারও হয়ত তাই হবে! ডানা না থাক, আকাশ যে আছে, তার কল্পনা করেই নিশ্চয় সুখী হওয়া যায়! কিন্তু হল না, অত্যন্ত বিশ্রী ভাবে আমার মধ্যেও একদিন জান্তব বৃত্তি চলে এলো- ডানা নড়তে শুরু করল থরথর করে, কি কদর্য এই দৃশ্য! আমি থামাতেই পারছি না, আমি কত চেষ্টা করছি, কিছুতেই থামতে চাইছে না! দুম করে ডানা সপাট খুলে গেল! বহু বছরের জমাট বাঁধা অচল ডানার সকল তন্ত্রে যেন বন্যাবেগে রক্ত ছুটেছে! জানি, সকলে বলছে- এ অন্যায়, এ উচ্ছৃঙ্ক্ষলতা, এ বিপজ্জনক- আমি নিজেকে রুখতে পারি না আর! ডানা মেলার যে শিহরণ, তার যে উত্তেজনা, তার যে উন্মাদনা- আমি তাতে বাকী সব ন্যায়-নীতি যেন বিস্মৃত হলাম, আমি ভুলে গেলাম- অতীতে যারা ডানা মেলতে চেয়েছিল- তারা আজ কোথায়! নিজেকে ভয়ে হোক, অথবা বহুদিনের কু-শিক্ষার সুফলে অথবা সু-শিক্ষার কুফলে সংযত করে নিলাম! সত্যিই তো এই উদ্দাম ডানা মেলা যে অশোভন! কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত একবার যার ডানা মেলার স্বাদ মিলে গেছে- সে হয়ত দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, সহস্রবার ডানা মেলতে চাইবেই, চাইবেই অপ্রতিরোধ্যভাবে- যে চায় না সে হয়ত পাখি নয়, তার পাখিত্ব মরে গেছে, যে পাখির আকাশে ওড়ার ইচ্ছে জাগে না তাকে আর পাখি বলে মানতে মন চায় না! ডানা ঝাপটানোর তীব্র ইচ্ছেটুকু যেন কেমন ধাঁচের উগ্র বানিয়ে ফেলছে আমাকে, আমি অনুভব করছিলাম! একসময় আমিও অন্য পাখিদের বলতাম- বাইরের গাছের ডালে বাসা বুনে থাকা বুনো উড়ন্ত পাখিদের চাইতে আমরা সুখী, আমরা কত নিশ্চিন্ত জীবনে থাকি, খাবার খুঁজতে যেতেও হয় না, বাস্তুহারা হবার ভয় নেই, পরিযায়ী হতে হয় না- এই যে এত সুন্দর পরিচ্ছন্ন ও শান্তিপূর্ণ জীবন- এর জন্য আমরা কেন না আমাদের ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব? আমাদের মধ্যে যে শুভবুদ্ধির ভাব আছে, এই যে নিজেদের সংযত রাখার শক্তি আছে- এ নিশ্চয় ঈশ্বরের কৃপা! তাই নয় কি! সম্ভবপর সমস্ত অপযুক্তির আশ্রয়ে যে আমি নিজের খাঁচাটিকে অশেষ সৌভাগ্য বলতাম- আমার এখন এটি একটি সংকীর্ণ মৃত্যুর পথ ছাড়া আর কিছু মনে হয় না! নিজের ভেতরের এই আকস্মিক বিবর্তনে অপরের কথা কি বলব- নিজেই যেন আর নিজেকে চিনতে পারছি না আমি! বিবর্তন সুখের হয় না এটা অনুভব করতে পেরেছি! যদিও আমি লক্ষ অব্যর্থ যুক্তি এনেছি ডানার নিচে যা দিয়ে আমি উড়তে চাওয়াকে অনায়াসেই সমর্থন করতে পারি! কিন্তু আজও আমার উড়তে দ্বিধা, উড়তে দ্বন্দ্ব- কেন না আমি জানি আমার ওড়ার স্বাধীনতা নেই- সেখানে এত কথার মূল্য- অর্বাচীনতা ছাড়া আর কি!
আমি আমার ছোট্ট খাঁচাটিতে গুমরে মরে গেছি! আমার প্রাণের সকল স্পন্দন আমার ডানার মধ্যে গিয়ে ভীড় করত! ক্রমে ক্রমে আমি যেন উন্মাদ হয়ে যাচ্ছিলাম! পাশের খাঁচার পাখিরা এসে আগে কত কি বোঝাতো, কত সান্ত্বনা দিত, প্রবোধ দিত- তারা এখন আমি পাগল হয়েছি ভেবে তফাতে আছে! আমার তাতেও আর আপত্তি লাগে না- আমি একটি আলাদা পাখি হয়ে যাচ্ছি- আমার ভীষণ ওড়ার ইচ্ছে! আমি জানি ডানা ঝাপটালে এই খাঁচায় আমি আর ফিরব না, আমি জানি না অতীতের ডানা ঝাপটানো উচ্ছল পাখিরা কোথায়- আমি বুঝতে পারি- বুনো পাখির জীবন কত অনিশ্চিত, তবুও বুনো বাসনার বুনো আবেগে আমি ভেসে যাচ্ছি- আমি ভুলে যাচ্ছি- আমি যে খাঁচার পাখি নই- আমার মনে এ দৃঢ় বিশ্বাস এসেছে- আমি কেবল মাত্র পাখি- খাঁচাটি আমার নয়, আকাশটি আমার- ডানা দুটি আমার নিজের, আমার অপত্য অঙ্গ, ধার করে জুড়ে দিইনি কারো কাছ থেকে এনে- ডানা দুটি উড়ব বলেই আমার গায়ে আছে- এই যে উড়তে পারি না- এর নাম সংযম নয়, এর নাম পরাধীনতা, এর নাম স্ব-বিরোধ! আমি যে উড়বার জন্য জন্মেছি- এ চেতনাটুকুতেই কি উৎকট স্বাধীনতার গন্ধ!


মুক্তির জন্য যে কখনো একটি শব্দ করেনি- সে আমাকে বুঝিয়েছে- খাঁচার প্রতি প্রেম থাকাটা আমার কর্তব্য ও ধর্মের মধ্যে পড়ে! অথচ- আমি উড়তে চেয়ে বুঝলাম- পাখির ওড়ার ধর্মটিকে বাদ দিয়ে, পাখির আকাশের প্রেমটিকে বাদ দিয়ে আর সকল ধর্ম, সকল প্রেম- মন্ত্রমুগ্ধতার মত মিথ্যে!

শেষের গল্পটুকু না-ই বা লিখি! আপনারা তো মানুষ! নিজেকে আমার মত একটা পাখির সাথে তূলনা করতে তো দ্বিধা আপনাদের হয় না! ভেবে দেখুন তো নিজেকে পাখি হয়ে- এর পরের গল্প আপনি কেমন করে ভাবতেন!

কত কাল?

  কত কাল আর এতটা অন্ধকারে এত সব অশ্রাব্য চিৎকারে চারপাশ বদ্ধ করে নির্বিবাদে থাকি? কত রাত দয়ানিধি অলক্ষ্যে সুর বাঁধি পড়ে আছি অচঞ্চল স্বকৃ...