মঙ্গলবার, ১০ জানুয়ারি, ২০১৭

দত্তকথা ৪

৪র্থ পর্ব
___________

ছোটবেলায় ঠাকুরমার মুখে একটা বুলি শুনতাম- 'দত্ত কারো ভৃত্য নয়। সঙ্গে মাত্র আসে।' বড় হয়ে আরও অনেক দত্তের সাথে মিশে বুঝলাম চট্টগ্রামের কমবেশী দত্ত পরিবারে এই বুলিটি বেশ সচল। ফেক-দত্তদের ক্ষেত্রে কেমন জানি না। চট্টগ্রাম অঞ্চলে ফেক-দত্ত, ফেক-সেন, ফেক-সেনগুপ্তের অভাব নেই! মুসলিম সমাজেও এরকম সারনেম বদলে অনেকেই নিজেদের স্ট্যাটাসের উন্নয়ণ ঘটিয়েছেন! আগে হয়ত লিখতেন মোহাম্মদ গিয়াস, এখন লেখেন সৈয়দ মুহম্মদ গিয়াস অথবা গিয়াস উদ্দিন খান! আমরাও দেখেছি এক ঘর দত্তের পাশে ব্যাঙের ছাতার মত আরও অনেক ফেক দত্ত পরিবার গজিয়ে উঠতে। সারনেম বদলালেই কি সব হয়ে যায় বাপু? দত্তদের বনেদিয়ানার ইতিহাস আছে। যদিও এসব বনেদিয়ানার গরিমা আমার নেই কিন্তু ফেক-বনেদিয়ানাকেও আমি বরদাস্ত করতে পারি না। এসব ফেক-দত্তদের কাছে পরম্পরাগত দত্তদের ঐতিহ্য আমি প্রত্যাশা করি না। আপাতত ওই বুলিটির দিকে তাকাই। গতকালেই লিখেছি চট্টগ্রামে আমাদের আগমন ১৬৬৬ সালে মুঘলবাহিনীর সাথে। চট্টগ্রামের ইতিহাস থেকে জানলাম ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রামে মুঘল সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য মুঘল সেনানায়ক শায়েস্তা খান ও তাঁর ছেলে বুজুর্গ উমেদ খান চট্টগ্রাম আক্রমণ করেন ও আরাকানীদের চট্টগ্রাম থেকে বিতাড়িত করেন। তখন চট্টগ্রামের নাম হয়- 'ইসলামাবাদ'। এই মুঘলবাহিনীর সাথে দত্তদের চট্টগ্রামে আগমণ। গতকালের সংবাদপত্রের রিপোর্টে লেখা ছিল তারা হুগলী থেকে আসেন। তবে আমাদের উৎপত্তি হুগলীতে নয় বলেই মনে হয় একটা কারণে। আসছি সেই কথায়। দত্ত টাইটেলটা এসেছে ঋষি দত্তাত্রেয় থেকে। পুরাণে যিনি বিষ্ণুর অংশ। দত্ত কোন বাঙালি উপাধি বিশেষ নয়। ভারতের আরও কিছু অঞ্চলে দত্তদের দেখা যায় অল্পবিস্তর। বলিউডের সঞ্জয় দত্ত কিম্বা লারা দত্তের কথা-ই ধরুন না। উত্তরভারতের কিছু স্থানে, পাঞ্জাবে আর এদিকে আসামে অনেক দত্ত আছে। বাংলায় দত্তরা কি পরে প্রবেশ করেছে কিনা এ নিয়ে কোন তথ্য আমার জানা নেই। যেমন ব্রাহ্মণরা বাংলার আদি গোষ্টী নয়। তাদের আগমণ ঘটেছে ১০০০ সালের পরে। দত্তদের তেমন কিছু ঘটেছে হয়ত। আমাদের পরিবারের 'গোত্র' দেখলে এই ধারনাটা জন্মায়। আমাদের গোত্র 'পরাশর'। বাংলায় কোন কায়স্হ পরিবারের গোত্র 'পরাশর' হয় না। এটা বামুনদের গোত্র। এই 'পরাশর গোত্র' নিয়ে অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করে অবশেষে উদ্ধার করতে পারলাম শুধুমাত্র রাজপুতদের একটা কূল যাদের 'বিষেণ ক্ষত্রিয়' বলা হয়, যাদের প্রথম রাজার নাম ছিল ময়ূরভট্ট এবং শুধুমাত্র এরাই গোত্রে 'পরাশর' ছিলেন। ক্ষত্রিয়দের মোট ৩৬টা কূল ছিল। এর মধ্যে 'বিষেণ ক্ষত্রিয়' একটা। এই কূল ছাড়া অন্য কোন কূল 'পরাশর' লেখে না! রাজপুতদের বিকাশ নিয়ে পড়ছিলাম গত পরশু সতীশচন্দ্রের বিখ্যাত 'হিস্টোরি অফ মেডিয়েভাল ইন্ডিয়া'তে। যদিও রাজপুতদের পুরাণবর্ণিত চন্দ্রবংশ, সূর্য্যবংশ ও অগ্নিবংশের ধারা বলা হয় কিন্তু ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোন থেকে ভাবা হয় এরা আসলে আর্য্য বামুন এবং উত্তরভারতের অন্য কিছু যোদ্ধা গোত্রের সংকর। আমি বহুদিন ধরে আমাদের এই উদ্ভট অ-কায়স্থ ধাঁচের 'গোত্র' নিয়ে ভেবেছি যা নিয়ে আমাদের পরিবারের এত গর্ব ছিল- অনেক পরে গিয়ে এর রহস্য উদ্ধার করতে গিয়ে বুঝলাম আমাদের রক্তের ধারা বাংলায় মিশেছে শুধু। আমরা বাঙালি ছিলাম না। হুগলি থেকে মুঘলরা যুদ্ধ করার জন্য বাঙালিদের ধরে এনেছে এটার কোন যুক্তি নেই। বরং এটা হবারই সম্ভাবনা প্রবল যে মুঘলদের সাথে রাজপুতরাই এসেছিল বাংলা দখল করতে এবং আমরা তাদেরই অংশ। এই রাজপুতদের সাথে মুঘলদের সম্পর্কের ভিত্তি ধরেই হয়ত বলা- 'দত্ত কারো ভৃত্য নয়', মুঘলদের সঙ্গে আসার জন্যই বলা- 'সঙ্গে মাত্র আসে।' 'দত্ত কারো ভৃত্য নয়। সঙ্গে মাত্র আসে।' বঙ্গদেশে সব দত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে হয়ত কাহিনীটা এক নয়। আমি শুধু আনোয়ায়ার দত্তদের উৎপত্তি আবিষ্কারের চেষ্টায় ছিলাম। তবে চট্টগ্রামের আরও কিছু দত্তের মুখে 'দত্ত কারো ভৃত্য নয়' শুনে অনুমান হয়- এদের কমবেশীর আগমণ ওই সময়েই ঘটেছে এবং প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের সময়ের আবর্তনে আজকে তারা পুরোপুরি বাঙালি এবং অতীতবিস্মৃত। বাঙালি এরকম বহুজাতিক সংমিশ্রিত একটা জাত। এখানে মুঘল, পাঠান, রাজপুত, আরাকানী, আসামী, কনৌজের বামুন সব মিশে এক। এই তো গেল আমাদের শেকড় উদ্ধার ও আমাদের বিচিত্র 'গোত্র' এর ক্যাঁচাল। কিন্তু একটা প্রশ্ন আমাদের সবার মাথাতেই আছে- সেটা হল ভূর্ষিতে জায়গীর পাওয়া রাজযোদ্ধারা কবে ও কি কারণে আরও দক্ষিণে আনোয়ারা চলে এল? আমরা রামকিনু দত্তের আগে শুধুমাত্র তাঁর বাবার নামটুকুই জানতে পেরেছি। অনেককিছুর মত আমাদের বংশের পূর্বপুরুষদের নাম সম্পর্কিত যে ভূজ্যপত্র ছিল তাও বিনষ্ট হয়েছে। আমি পটিয়ার ওই দিকের কাছাকাছি এক জমিদারের নাম শুনতে পেয়েছিলাম। জমিদার তিনকড়ি দত্ত। যিনি নাকি খাজনা না দিয়ে গোরা সৈন্যদের উল্টো নিজ লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে পেঁদিয়েছিলেন একবার। আমাদের ইতিহাস সংরক্ষণের সংস্কৃতি না থাকার দরুণ এরকম নানান ছোটখাটো বিপ্লবের কথা আমরা একদমই জানি না। এসবের কথকতা হয়ত লোকের মুখে মুখে কিছু প্রজন্ম পর্যন্ত চলে। তারপর চিরতরে হারিয়ে যায় আঁধারে। বাংলাদেশের ইসলামাইজেশনের ফলে অনেক কীর্তিমান হিন্দুর নামগন্ধও মুছে গেছে নির্মম ভাবে। যদি তিনকড়ি দত্ত নামে কেউ আসলেই ছিলেন এবং তিনি ইংরেজের সঙ্গে ওরকম করেছেন তবে তার প্রতিফল মঙ্গলদায়ক কিছু ছিল না বলে ধরে নেয়া যায়। এমনও হতে পারে তার কর্তাগিরি নস্যাৎ হবার পর তাদের বংশ আনোয়ারাতে মাইগ্রেট করে নেয়। পটিয়া অঞ্চলে এই দত্তদের কোন হদিস নেই। কেউ দক্ষিণভূর্ষি গিয়ে একটু খোঁজ নিতে পারো। আমরা শুধু ধলঘাটের দত্তদের কথা জানি। এরাও জমিদার। আমাদের আত্মীয়। ধলঘাটের বিখ্যাত কালী মন্দিরটি এদের কীর্তির দৃষ্টান্ত। এই পরিবারে একজন রেলও্য়ে ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন যাকে বৃটিশ নিযুক্ত করেছিলেন চট্টগ্রামের রেলওয়ে কনস্ট্রাকশনে। এই পরিবারের সুনাম দেখেই আমার বাবার পিসির বিয়ে হয়েছিলে ওই রেলও্য়ে ইঞ্জিনিয়ারের ছেলের সাথে যার নাম এই মূহুর্তে আমার মনে নেই। আমার বাবার সেই পিশেমশাই তখন লণ্ডন থেকে গাইনোকোলজি পড়ে ফিরেছেন সবে। বিয়েটা হয়েছিল ১৯২৯ সালে। বাবার কৈশোর কেটেছে ধলঘাটের সেই দত্তবাড়িতেই। বাবা বলেন অনেক পড়াশোনা করলেই কেউ মহাণ হয় না, মানুষের মনুষ্যত্ব থাকতে হয়! পড়াশোনা করলেই যে মানুষ হওয়া যায় না তার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখাতেন- বাবার সেই ডাক্তার পিশেমশাইকে! এই ধলঘাটের দত্তরা আমাদের ওপর কি জঘন্য অত্যাচার চালিয়েছে তার হৃদয়বিদারক অনেক ঘটনা আছে। আমার দাদুকে খুন করার চেষ্টা হয়। ঘাটফরহাদবেগে আমাদের যে বাড়ি ছিল সেখানে গুন্ডাবাহিনী এনে আমাদের উৎখাত করা হয়। আমাদের জমিদারীর ধান চাল পর্যন্ত ওরা ধলঘাট থেকে এসে লুট করে নিয়ে যেত। আমার দাদু ছিলেন একা। সবাই কোলকাতায়। আমার দাদুর অতিরিক্ত দেশভক্তির ফলাফল তিনি চরমভাবে ভুগেছেন। অত্যন্ত সহজ সরল এই মানুষটা জীবনের একপর্যায়ে একদম নীরব হয়ে যান, স্মৃতিশক্তি চলে গিয়েছিল। দাদুর এক শ্যালক এই সুযোগে আমাদের ব্যাংক লুটে আমাদের সর্বশান্ত করেন। তখনই আমরা আমাদের শহুরে জীবনের সিংহভাগ হারিয়ে বসি। আমাদের ঘাটফরহাদবেগের বাড়ি, পাথরঘাটার ব্যবসা, ওষুধের ফ্যাক্টরি, এনায়েত বাজারের জায়গা (বর্তমান যেটা মহিলা কলেজ) সব উড়ে গেল! ঠিক ওই সময়েই আমরা আনোয়ারা নিবাসী হয়ে যাই পাকাপোক্ত ভাবে। কুঠিবাড়ি হয়ে যায় আমাদের সব। ধীরেধীরে সেসবও আমরা রক্ষা করতে পারিনি। পারছিও না। হয়ত পারবও না। ধলঘাটের দত্তদের সাথে আমাদের সুপ্রাচীন ঝামেলা আবার শুরু হয়েছে। অমুক মিয়াঁ তমুক আলী এসে জায়গা গিলে খায়! আমিলীগ-বিম্পি সবাই হিন্দুর জায়গা গিলতে পারলে আনন্দিত। কত জমিজমা পাকিস্তান শত্রুসম্পত্তি করে ফেলেছে। কতকিছু চলে গেল সরকারের খাস দখলে। আমার দুঃখ হল- আমাদের প্রাচীন বৈভবের সংরক্ষণ আমরা করতে পারিনি ঠিকই কিন্তু আমাদের ধরে রাখার মত কিছু স্মৃতিচিহ্ন ছিল- সেগুলোও কেন আমরা রাখতে পারিনি? কথা হবে। এখন রাখছি।

সোমবার, ৯ জানুয়ারি, ২০১৭

দত্তকথা ৩

৩য় পর্ব
___________
'চট্টল মনীষা' নামে একটা বই পাওয়া যায় চট্টগ্রামে। সেখানে চট্টগ্রামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের বর্ণনা আছে। চট্টলার 'দৈনিক পূর্বকোণ'এ একদিন এই বইয়ের রেফারেন্স প্রয়োগ করে রামকিনু দত্তের ওপর একটা লেখা বের হয় যা আমি হুবহু লিখে দিচ্ছি। এই লেখার সূত্র ধরেই আমরা আমাদের শেকড়ে যাবার চেষ্টা করতে পারি।

"রামকিনু দত্ত (১৮০১-১৮৯২)
_____________________________
চট্টগ্রামের প্রথম অ্যাংলো-বাঙালি কবি ও ইংরেজ আমলে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ রচয়িতা রামকিনু দত্তের জন্ম ১৮০১ সালে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বিত্তবান ও অভিজাত দত্ত পরিবারে। তাঁর পিতা সদয়রাম দত্ত। এই পরিবার ১৬৬০ সালে হুগলী থেকে মুসলিম সেনাবাহিনীর সাথে চট্টগ্রামে আসেন ও আরাকানের সাথে মোগল বাহিনীর যুদ্ধে বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। মোগল বিজয়ের পর এই পরিবার ভূর্ষি গ্রামের জায়গীর প্রাপ্ত হন। এখান থেকে পরবর্তী বংশধরেরা আনোয়ারায় এসে বসতি শুরু করেন।
রামকিনু দত্ত কর্মজীবনে সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগে যোগ দেন ও নেটিভ ডাক্তার হিসেবে পরিচিতি পান। তিনি উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেন, এই দুই ভাষায় প্রচুর গান ও কবিতা লিখেন। তাঁর স্বদেশপ্রেম ও মাতৃভাষা বাংলার প্রতি অনুরাগ ছিল। আত্মসম্মানবোধ ও স্বাধীন মনোভাব প্রদর্শনের জন্য রামকিনু দও ১৮৪৭ সালে এক বছর কারা দণ্ড ভোগ করেন। জানা যায় এসময় চট্টগ্রামের ভূমি জরিপ কাজে হার্ভে সাহেব নিয়োজিত ছিলেন, দেশের মানুষের ক্ষতির আশংকা করে ডাঃ রামকিনু দত্ত তাতে বাধা দিয়েছিলেন, ফলে অভিযুক্ত হয়ে তিনি কারাভোগ করেন। ডাঃ রামকিনুর কারাদণ্ডের জন্য আরেকটি কারণ জানা যায়। তা হল তিনি অশ্বারোহণে রোগী দেখতে যাবার সময় উচ্চপদস্থ শ্বেতাঙ্গ কর্মচারী সেটাকে বেয়াদবি মনে কক্রে রামকিনুকে আঘাত করেন বা যাত্রাবিঘ্ন করেন। আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ডাঃ রামকিনু সেই শ্বেতাঙ্গ সাহেবকে চাবুক মেরে ধরাশায়ী করেন। এই অপরাধে ডাঃ রামকিনুর এক বছর জেল হয়।
রামকিনু দত্ত Songs with Native tunes of Different sorts and Dances সংক্ষেপে Songs নামে কাব্যগ্রন্থ রচনা ও চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশ করেন। ১৮৮৬ সালে গ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় তখন তিনি সরকারী চাকরী থেকে অবসরপ্রাপ্ত। মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের নাম CS Press এর পক্ষে CGK Chowdhury, ৪ ইঞ্চি ও ৮ ইঞ্চি সাইজের গ্রন্থটির পৃষ্ঠার সংখ্যা ৪২। ১৮৬৪ সালে জুনমাসে ইংলিশম্যান পত্রিকায় গ্রন্থটির বেশকিছু কবিতা ও গ্রন্থ সম্পর্কে আলোচনা ছাপা হয়। ১৮৯২ সালে ৯১ বছর বয়সে Manipur Tragedy নামে একটি ক্ষুদ্র ইংরেজি কাব্য প্রকাশ যাতে ইংরেজদের শোষণ নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরা হয়। Songs কাব্যগ্রন্থে শিরোনামযুক্ত ১৫টি ও শিরোনামহীন আরও বেশ কিছু কবিতা রয়েছে।
ডাঃ রামকিনু দত্ত তিন পুত্রসন্তানের জনক ছিলেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র ডাক্তার নবীনচন্দ্র দত্ত (১৮৫২-১৯২০)ছিলেন চট্টগ্রামের সুবিখ্যাত চিকিৎসক ও সম্ভবত চট্টগ্রামের বাঙালিদের মধ্যে সর্বপ্রথম সিভিল সার্জন। তিনি ১৯১১ সালে স্থাপিত বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি ছিলেন। দ্বিতীয় পুত্র অনঙ্গচন্দ্র দত্ত (১৮৫৩-১৯১৪)। তাঁর পুত্র বিখ্যাত কবি জীবেন্দ্রকুমার দত্ত। তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের বিখ্যাত কবি, সাহিত্য সংঘটক ও সংস্কৃতিকর্মী। তাঁর কন্যা হেমন্তবালাও ছিলেন কবি। অনঙ্গচন্দ্র দত্ত আত্মজীবনী রচনা করেন। কর্মজীবনে ছিলেন সরকারি চাকুরে। কনিষ্ঠপুত্র বিপিনচন্দ্র দত্ত (১৮৫৫-১৯৪৯) ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ও ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী। তিনি ছিলেন সুকণ্ঠের অধিকারী। আখ্যায়িত হন Young bird of Chittagong নামে।
ইংরেজ রাজত্বে ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনের পর অনেক বাঙালি ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে যশস্বী হন। তন্মধ্যে কবি কাশীপ্রসাদ ঘোষ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, সরোজিনী নাইডু'র নাম শীর্ষস্থানীয়, সেই ধারাবাহিকতায় অ্যাংলো-বাঙালি কবি হিসেবে ডাঃ রামকিনু দত্তের নাম প্রাসঙ্গিক। তিনি ১৯২ সালের পরবর্তী কোন এক সালে পরলোক গমন করেন। তিনি নিজের জীবন এবং চট্টগ্রামের সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কবিতা রচনা করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় যে, ডাঃ রামকিনু দত্ত ইংরেজি ভাষায় কবিতা রচনা করলেও মাতৃভাষা বাংলা কিম্বা মাতৃভূমির প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করেননি। বরং ইংরেজ রাজত্বে বাস করে এবং সরকারি চাকরী করেও বৃটিশ রাজের সমালোচনা করেন 'মণিপুর ট্রাজেডি' কাব্যগ্রন্থে। তথ্যসূত্রঃ চট্টল মণীষা (আহমদ মমতাজ, রাইহান নাসরিন।)
___________________________________

এই লেখাটা পড়ে আমার মাথাতে প্রথম যে ভাবনাটা এসেছিল সেটা হল- এত দূর্বল বাংলা নিয়ে কেউ একজন একটা বাংলা সংবাদ পত্রিকায় লেখালেখির চাকরী কি করে পায়!!! যাই হোক ওপরের তথ্যগুলোর আলোকে কিছু কথা তুলি। প্রথমত দত্তবংশের গোড়াপত্তনের উল্লেখিত সণ ও অঞ্চল নিয়ে কার কি বক্তব্য? পটিয়ার ভূর্ষি থেকে আনোয়ারা আগমনের হেতু কি? ভূর্ষির দিকে দত্তদের কোন ইতিহাস আছে কিনা? রামকিনু দত্তের বই কোথায় গেল? কোথায় সংরক্ষিত আছে? চট্টগ্রামে একদম শুরুর দিকে যে কয়েকজন মানুষ বৃটিশের বিরুদ্ধে জনমত গড়েন তাদের মধ্যে রামকিনু দত্ত একজন। এটা আমি কোলকাতায় প্রকাশিত একটা লেখায় পেয়েছিলাম। কিন্তু বিশদাকারে কিছু পাচ্ছি না। হার্ভে সাহেবের সাথে তাঁর বিবাদের স্পষ্ট কারণ কি? নবীনচন্দ্র দত্ত নিয়ে আলোচনা অনেক বড় হবে। তিনি তাঁর বাবার চেয়েও অনেক বেশী প্রভাবশালী ছিলেন। আমাদের বাড়ির উঠোনের উত্তরকোনে যে কুলগাছটা ছিল সেখানেই ছিল অনঙ্গচন্দ্রের ভিটা। তাদের কি পরিণতি হয়েছিল আসলে? চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে জীবেন্দ্রকুমারের ভূমিকা ছিল অনেক। কোলকাতা থেকে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হত যার একটা কপি আমরা সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম। চট্টগ্রামে 'আর্য্যসঙ্গীত' একাডেমি সৃষ্টির পেছনেও দত্তপরিবারের যোগ আছে। ১৯১৬ সালে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে কার ভূমিকা ছিল বেশী বিপিনচন্দ্রের নাকি জীবেন্দ্রকুমারের? ইত্যাদি অনেক প্রশ্ন নিয়ে আমরা পর্ব থেকে অপ্ররবান্তরে আগাবো। এবং অনুভব করব আমাদের বিনাশের কারণ।

রবিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০১৭

দত্তকথা-২


২য় পর্ব
___________
রামকৃষ্ণ আশ্রমে একজন বৃদ্ধা থাকতেন। আমরা দিদিমনি ডাকতাম। উনার ক্ষীণদেহী নাতিটি ছিলেন আমার সহপাঠী। ওখানে গেলে তিনি মাঝেমধ্যে খুব আদর করে আমাকে তালের পিঠা খাওয়াতেন আর একটা গল্প আমাকে প্রতিবারই বলতে কখনো ভুলতেন না। 'আমি ব্রজেন্দ্র দত্তের বিয়ে দেখেছি। তোমার দাদুর বাবা। আমি তখন খুব ছোট! আহা কি মানুষ ছিলেন। উনার বিয়েতে কত হাজার লোকের যে ভোজ হয়েছিল কি বলব। ঠাকুর মা এসব বলে না তোমাদের? উনি তো দেখেননি। আমি দেখেছি। কি সুন্দর মানুষ ছিলেন। ধুতির কাঁছা করতেন সোনার কাঠি দিয়ে। সকাল সন্ধ্যা চণ্ডী না পড়ে খেতেন না কখনো। কি সব মানুষ। এখনকার দিনে এসব মানুষ কোথায়?'
ব্রজেন্দ্র কুমার দত্তের ছবি আমি দেখেছি স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-ভগিনী ইত্যাদি সমেত। একটা ছবি সংরক্ষিত ছিল যার কোন হদিশ আজ আর নেই। আমি জানি না আমার বাকী ভাইবোনদের এই ছবির কোন স্মৃতি মনে আছে কি না। তবে এই ছবি যে কোথায় গেল আমি বলতে পারব না। শুধু জানি আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্যের কোন বিশেষ স্মৃতি আজ আমাদের কাছে নেই আর। আশ্রমের ওই দিদিমনির কথায় আমাদের পরিবারের অর্থনৈতিক বৈভবকে ছাড়িয়ে আরেকটা দিক বিশেষ ভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠত। সেটা হল এই পরিবারের ধর্মভীরুতা। আমার ঠাকুরদার স্মৃতি আমার কাছে ঝাঁপসা। আমার শৈশবের প্রথমার্ধেই তিনি প্রয়াত হন। কিন্তু কোলকাতায় পড়াশোনা করা ওই গৌরবর্ণ পুরুষ যে প্রবল মাত্রার বাঙালি ও নিষ্ঠাবান হিন্দু ছিলেন তা আমি অনুভব করতে পারি। ফিনফিনে ধুতি পড়তেন। নিত্য গীতাপাঠ করতেন যা আমার ঠাকুরমার মধ্যেও এসেছিল একসময়। পুরণো সিন্ধুকে রামায়ণ মহাভারত রাখা ছিল অনেক যত্নে। ঠাকুরমার কোলে বসে রামায়ণ-মহাভারতের গল্প শুনতাম আমি। তিনি প্রণবানন্দ শিষ্য স্বামী বেদানন্দের শিষ্যা ছিলেন। আমার ঠাকুরদা এই ধর্মপ্রাণতা লাভ করেছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রেই। ব্রজেন্দ্র দত্তের আগের জেনারেশনের ধর্মাচার নিয়ে অনেক কথা। দত্তবাড়ি থেকে এসব কবেই চলে গেছে। বাড়ির পূজাপার্বণ নেই আর। বংশের গৃহদেবতা শালগ্রাম নারায়ণ এখন গৃহেই থাকেন না। আগে যজমান এসে নিত্য পূজা করে যেতেন! বাব্বা! শালগ্রাম রাখা কি চাট্টিখানি কথা! রোজ বামুন না হলে তাঁর পূজাআচ্চা হয় না। এখন তিনি জয়কালী মন্দিরে পূজা পান। একসময় নাকি নারায়ণ ঠাকুরের জন্য একটা আলাদা গরু রাখা হয়েছিল। রাখা ছিল আলাদা সুবাসিত চালের বরাদ্দ। সেই আলাদা গাইয়ের দুধ আর আলাদা বরাদ্দের চালে তিনি পায়েস খেতেন। এ দৃশ্য আমরা অবশ্য দেখিনি। তবে ঘটা করে নারায়ণের ঠাট বজায় রাখার কি মহিমা সেটা দেখা আছে বাল্যকাল থেকেই। আমাদের সেই সনাতনী পূর্বপুরুষদের অনেকেই নাকি একাহারী ছিলেন। মাংসভূক ছিলেন না। কেবল প্রসাদী মাংস হলে খেতেন। এইসব রীতি উঠেছে কিসের ঠেলার জানি না। আমরা কিন্তু কারণে অকারণে প্রচুর মাংস খেতে অভ্যস্ত হয়েছি। শোনা যায় আমাদের পরিবারের সাথে বর্ধমানের রাজপরিবারের বৈবাহিক সম্বন্ধ হয়েছিল একবার। তাদের বাড়ির মেয়ের হাতেই আমাদের এরকম কট্টর হিন্দুয়ানি প্রথার কিছু বিবর্তন ঘটেছিল। এ ছাড়াও নবীনচন্দ্র দত্তের ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণও একটা বড় প্রভাবক হতে পারে। বাড়িতে উপনিষদের চর্চাটাও প্রাচীন যা এখনো আছে বটে। আমাদের পূর্বপুরুষদের কেউ একজন উপনিষদ নিয়ে কিছু একটা লিখছিলেন যার হারিয়ে যাওয়া পান্ডুলিপি আমি রামকৃষ্ণ আশ্রম থেকে উদ্ধার করেছিলাম একদিন। কেন আমরা সব হারিয়েছি? কিভাবে হারিয়েছি? ঠিক কি ভাবে এ বাড়ি থেকে দূর্গাপূজা, কালীপূজা সব উঠে গেল তার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস আজও আমাদের অজানা। এখন কোন পূজা হয় না! পাঁঠাবলি দিয়ে যে মনসাপূজা হত তাও আর নেই। আমি ছেলেবেলায় কত পূজা দেখেছি সেসবের কিছুই নেই। নারায়ণ আবার ঘরে ফিরে এলে হবে হয়ত। কিন্তু তিনি আসবেন কি? কবে আসবেন?

নবীন দত্ত ব্রাহ্মধর্মের কোন অংশের অনুসারী হয়েছিলেন জানি না। তিনি যদি কেশব সেনের নববিধানে নাম লেখান তবে হয়ত সেই সময়ে তিনি উপবীত ত্যাগ করেন। বাবার কাছে শুনেছি আমার দাদুর আমল থেকেই আমরা উপবীত ছেড়েছি। তবে কি নবীনচন্দ্র উপবীত রেখে দিয়েছিলেন? কায়স্থ পরিবারের উপবীত ধারণের রেওয়াজ আমি আর দেখিনি। এই প্রসঙ্গে লিখব  বিস্তারিত। মোদ্দাকথা হল এই পরিবারটি ছিল অত্যন্ত আদর্শগত হিন্দুত্বে বিশ্বাসী এবং কোন এক সময় এর অভ্যন্তরেই একটা পরিবর্তনের আন্দোলন তীব্র ভাবে উপস্থিত হয়। আমাদের বাড়িতে কখনো কেক কেটে কারো জন্মদিন পালন হয়নি। আমরা হিন্দুত্ব আর বাঙালিয়ানায় শিক্ষিত। জন্মদিনের দিন সকালে উঠে বড়দের প্রণাম করে, স্নান করে ঠাকুর প্রণাম করতাম। নারায়ণের বিশেষ পূজা ও ভোগ হত। কিছু নিমন্ত্রিত অথিতি আসতেন। প্রসাদ পেতেন। বাবা মার কাছে উপহার হিসেবে সোনার আংটি, সোনার চেইন পাওয়ার বাল্য স্মৃতি এখন ধীরে ধীরে আমার ফিকে হয়ে যাচ্ছে। ওইদিন রাতে অবশ্য বিরিয়ানি পোলাও কিছু একটা হতই হত! এখানে আবার বাঙালিয়ানা আর মোঘলিয়ানার মিশ্রণ! ইংরেজী ভাষায় আছে সবারই প্রেম। রামকিনু দত্তের ইংরেজি কাব্যগ্রন্থও ছিল। এসব বিষয়ে আমি কয়েকবার লিখেছি এবং এই ধারাবাহিক লেখায় সেসব আবারও উঠে আসবে। আমি বাড়িতে যেমন হিন্দু পুরাণ, বেদান্ত এসব দেখেছি তেমনি দেখেছি শেক্সপীয়র থেকে শুরু করে কার্ল মার্ক্সকেও! আমার বাবা-কাকারা পড়ুয়া মানুষ! তাদের রক্তে আছে। কিন্তু আমাদের রক্তে সেটা লক্ষ্যনীয় মাত্রায় কম মনে হয়। ভুল লিখলাম? এমনকি সেই ধর্মচেতনা বা চিন্তার প্রবাহ যা আমাদের পূর্বজরা বহণ করতেন আমরা তার ধারক হইনি। আমি যদিও এসব নিয়ে একটু বেশীই ভেবেছি। আমাদের বংশে কয়েকজনের সন্ন্যাস নেবার কথা আমি শুনেছিলাম ঠাকুরমার কাছে। এর সত্যতা কতটুকু? কিন্তু আমি প্রভাবিত ছিলাম বটেই। যদিও রেশনালিজমের পোকা আমাকে আটকে দিয়েছে মাঝপথে। আমার যে পিতৃব্য তরুণ বয়সে বিষপানে আত্মহত্যা করেন আমার মধ্যে তার চরিত্রের ছায়া আমার ঠাকুরমা যেমন দেখতেন তেমনি কখনো কখনো আমার বাবাও দেখেছেন। কিন্তু কমল দত্ত কেন এত অল্প বয়সে আত্মহত্যা করেছিলেন? কমল দত্তের আত্মহত্যার কিছু মাস পর মিত্রবাড়ির এক মেয়ে আত্মহত্যা করে। আমার ছোট বাবু (কাকু) এ নিয়ে এক মারাত্মক সিনেমেটিক গল্প শুনিয়ে দিলেন আমাকে। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, মিত্রবাড়ির খোঁজ নিলাম- এ দুটো আত্মহত্যার কোন সংযোগ নেই। নেই কোন প্রেমকাহিনী। প্রচণ্ড মেধাবী কমল দত্ত তবে কেন আত্মহত্যা করেছিলেন? তাঁকে বিষ এনে দিয়েছিলেন তারই এক ঘনিষ্ট বন্ধু! এই রহস্যের জট আমরা খুলতে পেরেছি? 

শনিবার, ৭ জানুয়ারি, ২০১৭

দত্তকথা ১

আমি একটা ধারাবাহিক লেখা শুরু করলাম যার প্রথম পর্ব এটা। শুরুতেই বলে রাখি এই লেখাটা একান্তই আমার পরিবার সম্পর্কিত, যদিও এর সাথে চট্টলার ইতিহাসের সামান্য যোগসাজশ আছে, তবুও লেখাটা শুধুমাত্রই ফেসবুকে আমার সাথে সংযুক্ত আমার পরিবারের সদস্য ও অন্যান্য আত্মীয়বর্গের জ্ঞাতার্থে শুরু করছি। আমরা সবাই একে অপরের কাছ থেকে নানা কারনে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছি। আমাদের শারীরিক দূরত্বের চাইতে বেশী আমাদের মানসিক দূরত্ব প্রকট। কোথাও একসাথে বসে এইসব আলাপচারিতার অবকাশ আমাদের কখনো হয়ে ওঠেনি এবং আমি জানি না ভবিষ্যতেও এর সম্ভাবনা কতটা আছে। পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে আমি সবসময় অনুভব করেছি আমাদের ভেতর একরকম ঐক্য ও সহমর্মিতা সংরক্ষণের। আমাদের জানা উচিৎ আমাদের অতীতকে যা আমরা অতিমাত্রায় বিস্মৃত এবং এর জন্য আমাদের প্রপিতামহ, পিতামহ এমনকি আমাদের পিতারাও কিছুটা হলেও দায়ী। ফেসবুকে মেসেজ চালাচালির মাধ্যমে এই কথাগুলো খুব একটা গুছিয়ে বলা যায় না দেখেই আমি এখানে বিশদ আকারে এগুলো লিখছি। যে প্রসঙ্গে আমি লিখছি সে বিষয়ে হয়ত তোমরা আমার চেয়েও কিছু বেশী জানতে পারো। তাই ট্যাগ করলাম।

আনোয়ারার দত্তদের শেকড়টাকে খুব বেশী ভাবে অনুভব করার সুযোগ ও সময়টা পেয়েছিলাম আমি। যদিও আমার বাবা আমাকে কখনোই আমাদের অতীত নিয়ে কিছু বলেননি। আমি পাড়া-প্রতিবেশীর কাছেই দত্তদের কীর্তি নিয়ে অনেক কথা শুনতাম ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু বড় হয়ে যখন চট্টলার ইতহাসেও আমাদের নিয়ে ছড়ানো-ছিটানো কিছু কথাবার্তা দেখতাম তখন বুকের ভেতর একটা যুগপৎ গর্ব ও গভীর বেদনা সৃষ্টি হত। ১৬/১৭ বছর বয়সে আমি নিজেও 'দৈনিক পূর্বকোণ' থেকে আসা জনৈক সাংবাদিকের জিজ্ঞাসাবাদের সামনা করেছি। কিন্তু ঐ বয়সে আমি বিশেষ কোন তথ্য তাঁকে দিতে পারিনি। পরবর্তীতে তাঁর লেখা একটা কলামে আমাদের কিছু ইতিহাস উঠে এসেছিল যার ফলে আমি আমার পরিবার নিয়ে কিছু জেনেছিলাম যা আমার বাবা-কাকারা কখনো আমাকে বলেননি। আমি সেই সব ইতিহাস ও আমাদের করুণ পরিণতি নিয়েই লিখছি। প্রথম দিকে বলব আমার শৈশব অভিজ্ঞতার কথা।

আমাদের বাড়িতে অনেক বর্গাচাষীর আনাগোনা ছিল। এর মধ্যে একজন হিন্দু জেলে- 'সাগর কাকু' এবং বাকী সবাই বিলপুরের মুসলিম। এই মুসলিম পরিবারের একজন আবার নামকরা রাজাকার ছিলেন এবং যতদূর জানি এই রাজাকারের কৃতজ্ঞচিত্তের কারণেই ৭১ সনে আমাদের বাড়িটা পাকবাহিনীর তাণ্ডব থেকে বেঁচে যায়। আরও একটা কারণ শুনেছি ঠাকুরমার কাছে যে- থানার দারোগা বাবু আমাদের ঠাকুরদাকে একজন ভাল মানুষ হিসেবে খুব শ্রদ্ধা করতেন এবং আমাদের বাড়িটা বেঁচে যাবার পেছনে তাঁর একটা ভূমিকাও আছে। ছোটবেলায় সাগরকাকু আমাকে বেড়াতে নিয়ে যেতেন কখনো কখনো। রাস্তায় কিছু বয়স্ক মুসলমান ভদ্রলোকের সাক্ষাৎ হত মাঝেমাঝে। তারা আমাকে আদাব দিতেন ওইটুকু বয়সেই। আমি তখন এসবের মানে জানতাম না। কিছুটা বড় হবার পর আমি জেনেছি স্থানীয় জমিদারদের বংশধরেরা প্রাচীন আমলে এসব পেয়েই অভ্যস্ত। আমি অত্যন্ত পুরাকালে তো জন্মাইনি। কিন্তু তারা অতিশয় বৃদ্ধ ছিলেন এবং তারা তাদের রীতিটাকে মানতেন। এই সম্মানের আধিক্যের আরেকটা কারণ হল দত্তরা পাইক-পেয়াদা রেখে খাজনা খেয়ে চলা সামন্তবাদী জমিদারী কখনো চালায়নি। তাদের জীবন কেটেছে পড়াশোনা, ডাক্তারি, ওকালতি, সরকারী চাকরী আর শিল্প-সংস্কৃতি ধরে। তাদের তালুকের জমিতে কে আছে সে নিয়ে তাদের মাথাব্যথা ছিল না। এই উদারতার কুফল নিয়ে আলাপ হবে পরে। আমাকে 'তেলেবিল' এর ধারে দাঁড় করিয়ে একজন বলেছিলেন তর্জনী নির্দেশ করে- 'বাবু এখান থেকে যতদূর দেখতে পাচ্ছেন সব একদিন আপনাদের জমি ছিল।' এখন আছে কি নেই সে প্রশ্ন জাগার মত বয়স আমার ছিল না। মেইন রোডের ধারঘেঁষা তিনটে পুকুরের হিসেব আমি দেখেছি। একদিন একজন বলল ঘোষদের বড় দীঘিটা আমাদের কেউ একজন কোন আমলে ৯০০ টাকায় বিক্রী করেছিলেন। রক্ষাকালী মন্দির ও তার সংলগ্ন দামপুকুর ও একটা ছোট পুকুর আমাদের ছিল! রক্ষাকালী মন্দিরের বর্তমান মালিকেরা এটা অস্বীকারও করে না আজও। কিন্তু এগুলো আমাদের নেই কেন? প্রায় এক একর জায়গার ওপর গড়া, চারপাশে পরিখা কাটা আমাদের বাড়ির সীমানা। উঠানের পূবে একটা উঁচু ঢিপির মত জায়গা ছিল। এখনো আছে। আমার বাবা সেখানে একটা মন্দির গড়তে চান। সেখানেই ছিল আমাদের আদি মন্দির। এই বাড়িটা ছিল দত্তদের কুঠিবাড়ি। কোন এক বন্যার সময় নাকি এই মন্দিরের গোপালের গা থেকে চুরি যায় অনেক অলংকার। সেবায়েতরাই কাজটা করে। চুরি যায় চারটে সুন্দর রূপার প্রলেপ দেয়া খড়গ। আমি দেখেছি ওগুলো কাদের কাছে আছে এখনো।

কিছুমাস আগে এক জমির ধারে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ফুঁকছিলাম। এক ভদ্রলোক এসে বকতে আরম্ভ করলেন- 'হাড়িপাড়ার সব ভূমি তো আপনাদের। এখনো দু'চার ঘর গরীব আছে। ওদের জায়গাটা আপনার কাকু বিক্রি করে দিলে ওরা কোথায় যাবে? আপনার বাবা ছেড়ে দিয়েছেন। আপনার কাকুকে একটু বলুন।' আমি এই কথাগুলোর কোন ক্লু পাইনি। কারণ আমি এসবের ভেতর কোনদিনই ছিলাম না। তবে জানি ওই হাড়িপাড়াটার সব ভূমি আমাদের দানকৃত ছিল এবং এখনো এই দান করা ট্র্যাডিশন নিয়ে কিছু একটা উৎপাত শুরু হয়েছে। 'বাবু আপনাদের তো অনেক আছে। এটুকু ছেড়ে দিলে কি ক্ষতি হবে?' আমি জানি না বাপু। এই 'অনেক আছে' শব্দদুটো আমি হাজার বার শুনেছি। কিন্তু কি আছে তা স্পষ্ট নয়। তিনি আরও অনেক বলে গেলেন- আমাদের শহরের বাড়ির কথা, ব্যবসার কথা, একটা মেডিসিন ফ্যাক্টরীর কথা- যা আমার বাবা আমাকে কখনো বলেননি। কিন্তু আমি জেনেছি এসব। সমস্ত কিছু হারানোর করুণ ইতিহাস আমি জেনেছি। আমি সম্পদ হারানোতে ব্যথিত নই। আমি কষ্ট পেয়েছিলাম এমন একটা বিরাট পরিবারের এত দ্রুত বিনাশের কারণ চিন্তা করে।

অমরেন্দ্র দত্ত সেই বৃটিশ সময়ে ৯০০০০ টাকা নিয়ে লণ্ডন চলে গেলেন। আর ফেরেননি। ওখানে এখনো তাঁর বাড়িটা আছে। সেই অমরেন্দ্র দত্তের জমিজমা নিয়ে ৫ মাস আগে কেস ঠুকেছে ধলঘাটের দত্তরা! ১৯৪৩ সনের ঘটনার জের এখনো! অমর দত্তের অংশের দিকের জমি দেখিয়ে একজন বলেছিলেন- 'এই জমি আমি তোমার ছোটকাকুর কাছ থেকে ২০,০০০ টাকায় কিনেছি!' কথাটা যে কি বিষম বিদ্রুপের তা বলে বোঝাতে পারব না। তখনকার দিনের হিসেব করলেও এই জমির দাম ২ লাখ টাকা হত! আমার সুরাপায়ী খুল্লতাতের মাথায় কি করে হাত বোলানো হত তিনি তা টের পেতেন না। অবশ্য তিনি জমির দলিল নিয়েই জুয়ার আসরে বসতেন। আমার বাবার ভাষ্যমতে তার এই কনিষ্ঠ ভ্রাতা সেই সময়ে প্রায় ৩ কোটি টাকার সম্পদ উড়িয়ে দেন। এই কনিষ্ঠ সন্তান তাঁর সর্ববিধ অপকলাপের ভেতরও প্রবল মাতৃস্নেহ পেয়েছেন এবং এটাই হয়েছে আমাদের বংশের কফিনে শেষ পেরেক! আমাদের পিতামহীর কল্যানেই আমরা ক্রমশ অধোগতি লাভ করেছিলাম।


(লেখাটা বিরাট আকারের হবে। ৩০০ বছরের পারিবারিক গাঁথা ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হবার বিশ্লেষণ। তোমরা একটু হেল্প করবে।)

শুক্রবার, ৬ জানুয়ারি, ২০১৭

মমতাকাব্য

কাঁদিয়া কহেন দিদি-
'মোদীরে হটাও, আদভানি আসে যদি
তবে বিজেপির সাথে গাঁটরা বাঁধতে
আমার পোবলেম হবে কিসে?
ভারতবর্ষ ডুবতে বসেছে মোদীর চালিত ইসে-
কি যেন কি বলে ডিমনি-ফিমনি কি টাইজেশন,
নোট বাতিলের ফন্দী!
আমার ছেলেরা দুটো টাকা খেল-
অমনি করেছে বন্দী!
ইয়ার্কি নাকি? মগের মুলুক? স্বৈরাচারীতা ভীষণ!
কোথায় গেলে হে রাজ বিদূষক আমার কবীর সুমন?
দু'চার লাইনের গান বেঁধে দাও, সাম্যবাদের গান,
বেশী করে লিখো বাংলার বুকে মমতার অবদান
সে কি শান্তিতে কোন নোবেল-টোবেল পাবার মত কি নয়?
তুমি তো বলেছ দুর্গার মত দিদির পূজাও চলবে রাজ্যময়
সে কি সস্তা দরের গাঁজার ছিলিম টেনে?
ভাবলাম তুমি জ্যোতিষী হয়েছ
আঁতেল হবার গুণে!
সিবিআই দেখো ছেলেধরা হল গুমর কচ্চে ফাঁস
ভাঙচুর কিছু চালিয়েছি বটে, চালাব আরেক মাস!
তবে কাজের কাজতো হচ্ছে না কিছু
মোদী ব্যাটা বড় গোঁয়ার,
কি করে যে একে ল্যাঙ মারা যায়
শালা আস্ত একটা শুয়ার!
শঢ়ি,
পাব্লিক প্লেসে গালাগাল দেয়া হয়েছে স্বভাবদোষ
স্বভাবটা আর যাচ্ছে না ছাই, পুষে রেখে আক্রোশ
হার্টের ব্যামো বাড়াতে চাইনে তাই মুখে যা-তা আমি বলি,
ওসবে বিশেষ যায় আসে না তো, বাঙালির গালাগালি-
যুগ যুগ ধরে সংস্কৃতিরই অঙ্গ!
গালাগালিটাই বীর বাঙালির
রস-রসিকতা-রঙ্গ!
আদভানি বাবু, রাজনাথ সিং বিজেপির হাল ধরো
মোদীকে তোমরা সরাও জলদি, আমাকে রক্ষা করো!'
_______________________________
দিদি বলেছেন- বিজেপির ক্ষমতায়ণে তার আপত্তি নেই। কিন্তু মোদীকে দিয়ে চলবে না। আদভানি বা রাজনাথ সিং আসুক তার আপত্তি নেই! বামেরা বলছে তিনি গুপ্ত আঁতাত চালাচ্ছেন! "কত রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়, ও ভাইরে!''

কবিতাত্যাগী

নিখিলের বিরাগী হৃদয় বুকে গ্রহে গ্রহান্তরে
আমি অনন্তকালের এক শরণার্থী হয়ে ফিরি!
আমি ফিরি তুঙ্গভদ্রা পাড় থেকে আকাশগঙ্গা ধরে
নলখাগড়া কাশের বন ফেলে মানুষ ও দানবের সঙ্গম ছায়ায়
ক্ষতবিক্ষতযোনির রক্তস্রোতে কোন নৌকারোহী হতে,
আমার কাঁধের বোঝা ভরানো মায়ায়!


রতিক্লান্ত খেচরের ডানায় ভারী- উড্ডয়ন উন্মুখ,
আমি নির্বিবাদী ধূলাবৃত মূক প্রস্তরের মত;
এক খণ্ড অপ্রত্যক্ষগোচর অনুভব অবহেলায় কোন মতে
আঁকড়ে নিয়ে বসে থাকা যতক্ষণ বসে থাকা যায়
ততক্ষণ স্নায়ুপীড়া ধ্বজভঙ্গ কবিতায় মজে,
কবিতা শুক্রাশয় থেকে ছোটে মগজে মজ্জায়!

কবিতাও হয়ে গেছে কবে স্ত্রৈণ ও বীর্য্যহীনের ধন,
কবে সে তুলে নিয়েছে মুখ মানুষের লাঞ্ছনার কেন্দ্র থেকে,
কবে থেকে সে হয়েছে শুধু শরীরী অনুভূতির দনুজ উচ্ছাস,
রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিঁধে থাকা আদিম অনুরণন-
সেই থেকে হয়ত আমি কবিতাত্যাগী।

তারপর-
সেই থেকে এখনো আমি নির্দিষ্ট আবাসনহীন।

বুধবার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৭

মা মাটি আর মানুষ

ওই জেগেছে মমতাময়ীয়- চাঁদপানা মুখ বীরের দল,
সোনার ছেলে যাচ্ছে জেলে- কালোধনের ক্যালমা বল?
মোদী মিয়াঁ মদ্যাপায়ী- মমতাময়ীই আছেন ঠিক!
মা মাটি আর মানুষ গিলে- ঢেঁকুর তোলেন দিগ্বিদিক!
মা সারদার নাম ভাঙিয়ে- মারলে পকেট পূণ্য সব
ওসব কীর্তি তৃণের সমান- মুল ব্যাপারে হচ্ছে ঢপ!
মূল কথাটা হচ্ছে মশাই- মোদীয়ালরা আসল চোর!
তৃণমূলে তপস্বী সব- সবাই মগ্ন তপে রাত্রি ভোর!
কালিয়াচক আর ধুলাগড়ে গ্রাম-গেরামে তপের খেল
মূর্তি ভাঙে, দেউল পোড়ে, ঘর জ্বালাতে অনেক তেল-
খরচ হবে, সে টাকারও- কড়াগণ্ডা যোগান চাই!
খাগড়াগড়ে ফাটল বোমা, সত্যি নাকি? কবে রে ভাই?
মহরমের মিছিল বলে- দেবীর ভাসান বন্ধ হোক!
তিন তালাকের বিধান বাঁচুক, কাদের ভয়ে গিলছি ঢোঁক?
ঢাকায় কারা মানুষ মারে- প্ল্যানিংটা হয় কোলকাতায়
মালদা হয়ে অস্ত্র আসে- আমরা কিছু জানিনে ছাই!
করি গলাবাজীর মন্ত্রবলে- খিস্তি দিয়েই দেশোদ্ধার!
সকালবিকাল বোল পালটে- খুব সেঁজেছি কথার ভাঁড়!
মানুষগুলো গাধার মত- ঘোলা জলেই তৃপ্ত বেশ
মা মাটি আর মানুষ হেঁকে- কব্জা এখন বঙ্গদেশ!







তীরে ফেরা

  অনন্ত দিনরাত্রির কত স্রোতভঙ্গ কলরোলে আমি ভাসিয়ে ভেলা অবেলা ওপারে যাব বলে হাল ধরে ঠাঁই জেগে আছি নির্নিমিখ। কত ঝড়ের ঝাপটা এসে, দিল দোলা ক...