সোমবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

রাত্রিকথা

কেন রাত আসে? কেন যে আঁধার হয় পৃথিবীর বুকে?
সে কি বোঝে না আমার কষ্ট কি যে আয়ত দু'চোখে
ভাসে আলোহীন? আজ দৃষ্টিও ক্ষীণ।
দুরাশার অভিঘাতে অনভিজ্ঞ অন্তর অক্লান্ত কাঁদে
রাত্রির রূপ লাগে বড়ই নিকষা, ক্রুর ও কঠিন
সে মানুষকে বাঁধে কত মোহনীয়া হয়ে।
আমারও একদিন ছিল সব স্বাভাবিক
ইদানীং সবকিছু এদিক-সেদিক!

এলোমেলোকৃত সব কবিতার কথা ঝড়ে উড়ে যায়।
অচঞ্চল পৌষের মধ্য বয়সে এসে বেদনা ভিজেছে সব 
ভোর কুয়াশায়- রাত্রি সে কেঁদেছিল প্রবল ব্যথায়
নিঃশব্দে ভেসে গেছে সেই হাহারব!

প্রেয়সী তুমি এই রাতের গভীরে আরও সুগভীরা হও,
আমাকে গ্রাস কর বুভুক্ষা সর্পিণীর মত নিজের শরীরে
লজ্জা কর নিরাকৃত, সব গাত্রবাস- ধীরে ধীরে
সরে যাক মেঘের মতন! আমি ডুবে যাই!

আমাকে শান্তি দাও।
আমি আজ মৃত্যুর দিকে।

অপ্রতিমা

আবার গড়তে চাই নতুন প্রতিমা আমি 
যদিও পঙ্গুত্ব আজ আমার দুহাত জুড়ে অবিনশ্বর
আমি অনুভব করি। অনুভব করি মানবিক পক্ষাঘাত
স্নায়ুকলা ঘিরে ছবি আঁকে- পুরাতন মুখ।
শীল্পির লালিত্যবোধ আর বধির ঈশ্বর
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে। দুজনের অন্তরে গভীর অসুখ
নিরাময় অযোগ্য হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

আমার কল্পনারস শুকিয়ে গিয়েছে যেন গোমতীর মত।
এখন বাস্তবের মাটি দিয়ে যে প্রতিমা গড়ি
সেই হোক আরাধ্যা শুধু, পূজারিণী নারী।

আমার চাওয়া

আমি তো চাইনি আমাদের ভেতর 'যদি' অথবা 'কিন্তু'র মত কিছু শব্দ আসুক।
আমি চেয়েছিলাম আমরা একে অপরের কাছে হব অসীম অনাবৃত
দুটো হৃদয় দুটো স্বপ্রতিভ নক্ষ্মত্রের মত শূণ্যে ভাসুক।
আমি তো চাইনি কিছু প্রশ্নবোধক চিহ্ন আসুক আমাদের বিশ্বাসে
আমি তো চেয়েছি শুধু বিরাট বিস্ময়বোধে তাকিয়ে থাকতে শুধু চোখের অতলে
হৃৎপিন্ড কাঁপুক সুগভীর নিশ্বাসে যখন আমরা আলিঙ্গনরত নিবিড় বাহুপাশে
কামনার আগুন জ্বলুক আর সূর্য্য ডুবুক!


এখনো তুমিই আছো। যেমন তুমিই ছিলে অনাদৃত রাতে।
এখনো আমিও আছি আগেরই মতন। অথচ হাত নেই হাতে।


আমাকে একটু জড়িয়ে ধরতে পার?

স্বপ্নচ্যুত

কিছু কিছু স্বপ্ন, প্রার্থিত অনুভব আমি আর কখনো পাব না ফিরে।
আমি মেনেও নিয়েছি সব যেমন করেই আমি মেনেছি যে সব
বিষাক্ত কন্টক একে একে রক্তপিপাসু হয়ে বিঁধেছিল বুকে!
আমার স্মৃতির পাতা অকৃত্রিম দুখে আজ চির ভাস্বর।
একদিন গুচ্ছ কবিতার কথা বেঁধেছিল ঘর যে যুবক শরীরে
সেখানে আজ নিরুত্তেজ শোণিতপ্রবাহ ধীরে ধীরে বয়।
যা কিছু আমার ছিল, আজ যা কিছু আমার নয় সবকিছু মিলে
আমার লালিত আশাগুলো চোখের সামনে দেখি বিনষ্ট হয়
আর আমি কাঁদতেও যে পারি না।

কতটা অসহায়ত্ব এলে অশ্রু থমকে যায়, কন্ঠের স্বর হয় জলদগম্ভীর
অথচ বৃষ্টি নেই, প্রখরা খরা এসে শ্যামলিমা করে নেয় গ্রাস
তুমি কি জানো? আমি কতটা ছারখার তবু কতটা স্থির
অটল শিলার মত স্থবির হয়ে ভেতরে ভেতরে কাঁদি?

আমার অনেক ইচ্ছে ছিল। ছোট ছোট সাদা সাদা টগরের মত।
সব গেছে ঝরে একদিন কোন এক বিরান দুপুরে তার সব গেছে ঝরে।
তবুও যে কি সুখের অভিপ্রায়ে জানালাটা খোলা, প্রকৃতি বাতাসহীন
গুমোট আবহ নিয়ে সুরহারা হয়ে কবে গেছে মরে, পুকুরের জল দিত ঘাটে এসে দোলা
আজ সব কেমন যেন দূরে গেছে সরে। তবু কেন জানালাটা খোলা?

আমারও তো মন আছে যেমন পাখিরও থাকে। আমি তো মানুষ!
ডানাহীন যন্ত্রণা সয়ে সয়ে আছি নিকৃষ্ট জীবনের খাঁচার ভেতর,
আমি ধুকপুক করি। আমি গুমরে গুমরে মরি বিগতস্রোতা নদীর মত,
আমি তো মানুষ। আমি তো সত্যি সত্যি কোন নদীও তো নই!

আমার কেন যে এমন হয়?
আমি জানি এভাবেও বেঁচে থাকে কত বনফুল পথের দু'পাশে
পদধুলে সেজে নেয় গরিমার সাজ। তারাও তো বাঁচে।
আমার কেন সেটুকুও নেই? কেন নেই কেউ পাশে
দুটো স্বপ্ন সাজাবার একান্তে ভালবেসে যা হবে শুধুই আমার?

আমি আজ স্বপ্নচ্যুত জড়খন্ডের মত একা বসে আছি।

প্রেমোন্মাদ

জীবন আজ বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত বিপদসংকুল
আমি একা একা পাথর খোদাই করে কবিতা লিখি।
মানুষই তো ভুল করে। মানুষই তো আঁকড়ে ধরে বেশ কিছু ভুল।
জীবনের কন্টক যাত্রাপথে চোখে যার কালো কাপড় বাঁধা
সে যে কত অসহায় সে কি আমার অজানা প্রিয়া?

আমি তবু তাকে চাই। শুধুমাত্র তাকে চাই।
আবারও বুকের মাঝে আগের মতই।
নইলে কি এমন দম্ভ আমার নিঃস্বার্থ প্রেমের বল?
কি এমন ভালবাসার এমন আস্ফালন আমার কুঁড়ে কুঁড়ে খায়
অস্তিত্বের অভ্যন্তর?

আমি তাকে চাই।
তাকে চাই আগের মতই হৃদয়ের গ্রন্থিপথে।
সবকিছু ত্যাজ্য করে যা কিছু আজ মিলেছে আমার
আমি তার সবটুকু চাই। সবটুকু মিশে থাক আমার বুকের সাথে।
চোখের তারায় যদিও আঁধার ঘনায়, সেই মাহেন্দ্রক্ষণে তাকে চাই।
অচঞ্চল ভোর বেলা, গভীর নিশুতি রাতে
সে আমার পাশে শুধু থাক।

এ প্রাণে যত বাঞ্ছিত সুখে আমি বঞ্চিত হলাম তার হিসেব নিকেশ ভুলে
আমি তবু তাকে চাই। আমার বিশ্বাসের স্তম্ভমূলে
যে ক'টা স্নিগ্ধ চুম্বন গেছে বলির উৎসবে জানি তার ইয়ত্তা নেই!
তবুও যে তাকে চাই অগতির গতির মত উদ্ভ্রান্ত অনুভবে,
পাঁজরার প্রকট ব্যথায়- আমি তাকে চাই।

আমি মরে যেতে চাই।
তার চোখে দুটো ক্ষণ স্থিরদৃষ্টি দিয়ে ঝেড়ে ফেলি শেষের নিশ্বাস,
ভালবাসা জিতে যাক, আমিও জিতে যাব বড় অবেলায়!
হারি জিতি আমি তাকে চাই।
দোর্দণ্ড প্রচণ্ড হয়ে তাকে চাই নিয়তিকে ল্যাং মেরে
নীতি রীতি অনীতি সমাজ সংস্কার সব মায়াচক্র লাথি মেরে
আমি আবারও জড়াতে চাই প্রবল মায়ায়।

আমার এই ভালবাসা সন্ন্যাসব্রতের মত অমোঘ অলঙ্ঘনীয়!
আমি কি করে ছেড়ে দেব প্রেমের মন্ত্র সব স্বেচ্ছাচারী হয়ে,
জগতের দশের মত বিবাদী হয়ে? আমি মানুষ যদিও
তবুও প্রেমিক- এটুকু অহংবোধ সমুন্নত থাক।
আমি সকল মনস্তত্ববোধে তাকে চাই।
আমার এই উদগ্র বাসনায় গালাগাল দিও
হে সুহৃদবর্গ, আমি যে প্রেমোন্মাদ!
আমার সমস্ত প্রেম এভাবেই যাক!

অসমাপ্তিকা (৬)

কি প্রচণ্ড ভালবাসি জানো?
মাঝেমাঝে আমার অবিশ্বাস হয়, 'এ মানুষ কি আমি!'
মানুষের হৃদয়ে কি এত প্রেম থাকে?
আমার শরীর ছিল পিরামিড হয়ে। আত্মাটা মমি- 
হয়ে বাক্সবন্দী ছিল বহুযুগ থেকে।
সেকি হঠাৎ জাগতে পারে এতটা প্রাবল্য নিয়ে
শুধু দুটো চোখ দেখে?

বল, এও কি সম্ভব?
একদিন জীবন ছিল বব মার্লির মত। 'নো ওমেন নো ক্রাই।'
জীবনানন্দ হয়ে বাদাম চিবোনো যেত ডিসি হিলে বসে।
ভাবতাম, 'এভাবেও বেঁচে থাকা যায়।'

এখন কেমন যেন একা একা লাগে।
আকাশ বাতাস সব অস্থির অধীর হয়ে অস্তিত্বশীল।
ঘুমের গভীরে বুকে কি যে ব্যথা জাগে
প্রতিক্ষণ মনে হয় বিরহ মিছিল-
চলে শিরা ধমনীতে!

বুঝি না গো।
একি অসুস্থতার পূর্বাভাস!
মস্তিষ্কবিকৃতি কি না এই যুবক বয়সে!
চোখে মুখে টের পাই তোমার নিশ্বাস
অনেক উষ্ণ হয়ে ছুটে কেন আসে?
বল সে কি চায়?

আমি কি তবে পাগলই হচ্ছি শেষে?
ভালবেসে ভালবেসে শুধু ভালবেসে আমি কি উন্মাদ?
এই অবিনীত জগতের এই ক্রুর দেশে
তোমাকে চেয়ে কি শুধু পাব অবসাদ?

কতটা ভালবাসি জানো?

(অসমাপ্ত)

অসমাপ্তিকা (৫)

মানুষ বলেই আজ এত ভয় পাই।
দেবতা হলে তো আমি পাথরই হতাম!
প্রতীক্ষিত হৃদয়ের প্রত্যাখ্যাত আশা
বুকের গহীনে পুষে পূজাও পেতাম।

নির্বিবাদী বিরাগীর অলিপ্ত হাতে
অধিকার অবাঞ্ছিত ব্রত সুকঠিন।
প্রণয়ের অভিসন্ধি প্রতিমার সাথে
অন্ধকার গর্ভে এসে অন্ধকার লীন!

তবুও তো ভালবাসা বুকে নেয় ঠাঁই
অনাহূত ভিখারির দারিদ্র্যতা নিয়ে।
মানুষ বলেই আমি এত ভয় পাই
ভিখারির শূণ্য হাত ভরাব কি দিয়ে?

(অসমাপ্ত)

কত কাল?

  কত কাল আর এতটা অন্ধকারে এত সব অশ্রাব্য চিৎকারে চারপাশ বদ্ধ করে নির্বিবাদে থাকি? কত রাত দয়ানিধি অলক্ষ্যে সুর বাঁধি পড়ে আছি অচঞ্চল স্বকৃ...