সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০২০

১৯-২০ এর মড়ক


হঠাৎ করে আমরা খুব অসহায় হয়ে গেলাম! আমরা ভাবিনি এমনও হতে পারে! আমরা ভাবিনি এই ২০২০ সালের কথিত সমৃদ্ধির মরসুমে আমাদের একটা প্রাগৈতিহাসিক মড়কের সামনে এসে দাঁড়াতে হবে! আমরা ভাবিনি আমরা ঘরে বসে ভাবব ঠিক কতদিনের খাবার আমরা আপাতত ঘরে সঞ্চয় করে রাখলাম আজ, কতদিন এ দিয়ে চলবে, কোন আসু দুর্ভিক্ষের হাতিছানি আমরা দেখছি কি না, বাজার তো একদিনের মধ্যেই কালোবাজারিদের খপ্পরে- রেশনকার্ড আছে তো আলমারির সুরক্ষিত স্থানে রাখা! বাইরে বেরুনো বারণ। সরকার বলছে, পুলিশ ধরবে আমাদের বাইরে বেরুলে। জরিমানা ও হাজতবাস দুটোই জুটতে পারে! আমরা কোন ভয়ংকর যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে পড়িনি! আমাদের বাতাসে আতংক ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাতাসে যমদূতেদের দেখা যাচ্ছে! তারা কখন যে কাকে যমপুরীতে নিয়ে যাচ্ছে তার কোন পূর্বানুমাণও সম্ভব নয়! হাজার তিনেক চীনা মরে গেল। আমরা অ-চীনারা ভাবলাম চীন দেশের ওই সব আমাদের অচেনাই হয়ত থেকে যাবে। কিন্তু তা হল কই? দেশে দেশে উড়ে গেল মড়ক! একটা একটা করে খাঁচা নড়েচড়ে ওঠে! এমন চৈনিক উদ্ভাবনী শক্তির সামনে নানান অ-চীন নগরের ‘খাঁচার ভেতর অচীন পাখি’র দল বেশীক্ষণ টিকতেই পারছে না! ইউরোপ ছারখারে যাচ্ছে! আমেরিকা যাচ্ছে জ্বলে। আমরা সারা ভারতে বসে ভাবছি এখন- আমাদের কপালে কি দেখা বাকী! আমরা কি মহাকালের এক বিরাট লোকক্ষয়ী করাল বিবরের ভেতর ঢুকে যাচ্ছি, আমরা কি সকলেই স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছি, নাকি আমরা সব্বাই স্তব্ধ হব  না, আমাদের কেউ কেউ রয়ে যাবে স্বাক্ষী হয়ে? এসব কথার আপাতত কোন উত্তর নেই! দুশ্চিন্তা রোধের কোন ভ্যাক্সিন আসেনি! ভ্যাক্সিন আসেনি মড়ক থামানোর! আমরা জানি না আমাদের মধ্যে কাকে কখন চলে যেতে হবে! না মরলেও অন্তত কোরান্টাইনে! [কোরান্টাইন দীঘার কোন হোটেলের নাম নয়!]

সব্বাইকে ছুটি দেয়া হল! বলা হল ঘরে থাকুন- সব্বাই ভাবল এ এক অন্যরকমের ছুটি! দীঘা-ফিগায় দলে দলে মরতে চলে গেল! একদিন ‘জনতা কার্ফিউ’ হেঁকে দিলেন ঊজির-এ-আলম, ছোকরার দল ভাবল এ-ও তো মজা, ফাঁকা রাস্তায় ব্যাটম্বল চলল কিছুক্ষণ! লোককে আর বোঝানো যাচ্ছে না! বোঝানো কি চাট্টিখানি কথা দাদা? এখন ২০২০ সাল! আমরা তো বছর বিশেক পরপর মন্বন্তর দেখে বড় হইনি! আমরা তো এটা বুঝতেই পারছি না যে বার্ড-ফ্লুতে যেমন শয়ে শয়ে হাঁস-মুরগী মরে, তেমনি আগের দিনের পেটের ব্যামোতেও গ্রাম-কে-গ্রাম মানুষ উজার হয়ে যেত! সভ্যতার দারুন উন্নতির সাথে সাথে আমাদের এই একটা বিশেষ অবনতি হয়েছে যে- আমরা নানান প্রয়োজনীয় দৃষ্টান্তের অভাব বোধ করছি আজকের দিনে, আমরা শিক্ষাহীন হয়ে গেছি! এসব এপিডেমিক কি প্যান্ডেমিক, অতিমারী কি মহামারী- এসব নিয়ে আমাদের কোন ভ্যাবাচ্যাকা খাবার আর জোগাড় নেই! বিদেশ থেকে প্যান্ডেমিক বইয়ে এনে দিব্যি নিজের পাড়া-মহল্লা, ময়রার দোকান, বাসে-ট্রেনে সব চষে বেড়াতে ক্ষতি কি? তারপর রোগশয্যায়! পাশে কেউ নেই! যাদের থাকার কথা তারা আর কোন রোগশয্যায় দিন কাটাচ্ছেন! সুশুষ্রাকারীটিও অনিরাপদ! এস্থেটোস্কপভূষিত কবিরাজের দল বিপদাপন্ন! কারো সুরক্ষার নিশ্চয়তা আমাদের হাতে রইল না! আমরা এমন একটা মড়কের মুখে দাঁড়িয়ে আছি! এখন আমরা চাইছি একটা যুদ্ধকালীন কার্ফিউ অন্তত!

লোক মরছে- এতেই কত লোকের আনন্দ ধরে না আর! ভুয়ো খবর দিনে দু’চার বার রটাতে না পারলে কারো কারো রাতের ঘুমে ব্যাঘাত হয়ে যাচ্ছে! মানুষও মাইরি! ভূয়ো খবরে আজকাল আমাদের যত দ্রুত বিশ্বাস জন্মে, সত্যিটা চোখের সামনে তুলে ধরলেও অত সহজে তা সত্যি বলে মানতে মন চায় না! এব্বাবা, ফেসবুকে দিয়েছে, মিথ্যে হবার জো নেই! ফেসবুক একাউন্ট তো সব যুধিষ্ঠিরেরা খুলে বসে আছেন- তাই কেউ মিথ্যে কইবে না! যে যা পারছে লিখে দিচ্ছে, গুজবের সীমাসীমান্ত নেই- গুজবের নিচে- ‘হু’ লেখা আবার! বলিহারি- বিশ্বাস না করলে বিশ্বাসঘাতকতার দন্ড পাব না! কি কি যে আরো বিশ্বাস করতে হতে পারে জানি না! গোমূত্রপান থেকে হুজুরের ফু, থানকুনি পাতার রস, রসুনের কোঁয়া জাতীয় নানান অব্যর্থ সঞ্জীবনী দাওয়াইয়ের প্রতিবিধান আসছে! ঘোড়ার ডিম হচ্ছে এসব খেয়ে! হুজুরেরা গলা ফাটিয়ে বলছেন- কেয়ামতের আলামত, এঁরা বলছেন- ভগবানের লীলা, প্রকৃতিবাদীরা বলছেন – প্রকৃতির প্রতিশোধ, কতশত ব্যাখ্যা, আমাদের মন তো গলছে না। ব্যখ্যা যেমন হোক, হাইপোথিসিস যেমন পাকা-ই হোক, বাঁচাটা তো জরুরী! আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না, আমাদের মধ্যে কে কে বাঁচবে এসব কথা মনে রাখার জন্য!

আমরা একটা মড়কের সামনে জড়ো হয়েছি! এটা কোন ইয়ার্কির কথা নয়! আমাদের লাশের স্তুপ দেখার অভিজ্ঞতা নেই! আমরা কোন বিশ্বযুদ্ধ দেখিনি! আমরা কোন জম্বি-সিনেমার জীবন্ত চিত্রায়ণ দেখিনি! আমরা এলিয়েন আর মানুষের সঙ্ঘাত নিয়ে অনেক কল্পকাহিনী ভেবে থাকতে পারি- আমাদের ভাবনার বহর যা-ই ছিল না কেন, আমাদের সামনে নিশ্চিতভাবে তেমন ভয়াবহ কিছু একটা এসে গেছে, এখন যখন আমাদের কাজ করার সময়, তখন আমরা কতটা অকর্মণ্য হচ্ছি, বা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কতটা অসহায় হচ্ছি তা একটু ভেবে দেখলেই আমাদের মঙ্গল! এই দেশটার কোটি কোটি লোক কোন মড়কে বেঘোরে মরে যেতে পারে, রোগে না হলেও একটা মারত্মকভাবে কোমরভাঙা অর্থনীতির ব্যারাম আমাদের মারতে উদ্যত এখন- আমাদের বোধোদয় নেই! যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বালাই নেই তাদের প্রসঙ্গ না-ই বা তুললাম, যাদেরকে আমরা তথাকথিতভাবে শিক্ষিত বলে মেনে নিই, তাদের আচরণেও বিরাট ফারাক কিছু আমরা সর্বক্ষেত্রে দেখি না! দেখাটা প্রয়োজন! খুব প্রয়োজন ছিল! আর ক’দিন এভাবে চললে আমরা খাব কি? আর কিছুদিন এমন করে শেয়ার বাজারে ধ্বস নামলে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো? ২০ টাকার মাস্ক ২০০ টাকা দামে বেচেছে গায়ে লাগেনি দাদা, ২০ টাকার চাল ২০০ টাকায় উঠে গেলে সইতে পারেবেন?

শুধু আমাদের একটা পাড়া, গ্রাম, শহরের কথা বলছি না; অবস্থাটা গোটা মানব সভ্যতার সামনে এসে গেছে! রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জাম নেই, পথ্য নেই, নিরাময় নেই, হাসপাতালে ঠাঁই নেই, রোগী ভর্তি হলে ভাবতে হচ্ছে কোনটাকে মারব আর কোনটাকে বাঁচাব, জীবন সবার জন্য যেন অপরিহার্য্য নয়, খাবারের দোকানপাট শুণ্য, রেশন সমাপ্তির দিকে, নগরের পর নগর স্তব্ধ করে দেয়া হচ্ছে, মানুষ ঘরবন্দী, বাতাসে যমদূতের চলাফেরা- কখন চুলের মুঠি ধরে ওপরে টান দেবে কেউ জানে না, আমরা খুবই অনিরাপদ! আমাদের সামনে আপাতত কোন আলো নেই! আমরা এই মূহুর্তে যা করতে পারি তা হল- আপন ঘরটিকে দূর্গ বানিয়ে তাতে বসে থাকা! কেমন কাপুরুষোচিত কথা শোনালেও আমাদের এই মড়কের যুদ্ধের বিজয়ের কৌশল সম্ভবত এই একটাই!



শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

ভাষাদিবসের ভাষা : কারো কারো আক্ষেপ

ভাষা নিয়ে আলোচনা জটিল ব্যাপার! ভাষা নিয়ে কোন ভাসাভাসা তাত্ত্বিকতা বিশেষ আবেগের ব্যাপার হয় না সাধারণের কাছে। আমার ভাষা কি, আমি কেন এ ভাষায় কথা বলি— এটা নিয়ে কোন ভীষণ প্রশ্ন যেমন আম-জনতার মনে জাগে না, তেমনি জাগে না কোন মারাত্মক সংবেদনশীল অনুভব! যদিও ভাষা ধর্মের মত সংজ্ঞাহীন ব্যাপার নয়, অর্থনৈতিক অবস্থার মত প্রবল অনুভূতি নয়, রাজনীতির মত শিহরণ জাগানো কিছুও নয়— তবুও মানবের সমাজে এটাই সবচেয়ে শক্তিসম্পন্ন উপকরণ! এটার সাথে আমরা একাঙ্গীভূত! যেমন আমাদের কখনো কেন মনে হয় না যে আমাদের সবার ভেতর একটা মেরুদন্ড আছে— তেমন আমাদের মনেই হয় না আমাদের একটা ভাষাও আবশ্যক অথবা অনাবশ্যক ভাবে আছে— এটা একান্ত আমাদের আত্মিক, আমাদের নিজেদের ভেতরে গাঁথা— আলাদা নয় বলেই তা নিয়ে আলাদা করে চিন্তা আমরা করিই না! কোমরে ঘা লাগলে যেমন ডাক্তারের কাছে যাব— তেমনি ভাষায় ঘা লাগলে আর কোথাও হয়ত যাব— তবে ঘা কি কামারের ঘা নাকি ফুলের, তা বুঝতে সময় লেগে যাচ্ছে!

এবং আম আদমির পক্ষে এই ‘ঘা’ এর মর্ম বোঝা একেবারেই দুষ্কর! ভাষার কোথায় গুষ্টি উদ্ধার হচ্ছে এ নিয়ে তার কোন মাতামাতি নেই! জনাকয়েক আমাদের মত লোক যাদের খেয়ে কাজ নেই, যাদের কিনা স্বকথিত অর্থে নন্দন-রুচি আছে, যারা ভাষাটাকে নানান সাহিত্যরসে চটকে থাকেন— তারা এ নিয়ে বেশ ভাবিত, দুঃখজনক রকমের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত!

আমার ওসব নেই! আমি সস্তা কথায় এতটুকু বুঝি যে— পদার্থবিদ্যার নানান সত্য অপদার্থ সমাজে নিয়তই ফলে! সমাজের রীতি আপেক্ষিক, কালের মত সমাজও একটা এবস্ট্রাক্ট মিথ, পদার্থের মত সমাজেরও অবস্থান্তর ঘটবে, শক্তি বিনষ্ট না হয়ে অন্য আরেকটা রূপ পরিগ্রহ করবেই— ভাল কি মন্দ সে সবাই নিজের নিজের মত বলবে আর কি! এরকম জটিলতাপূর্ণ ব্যবস্থায় কোন প্রাক-নির্ধারিত আইন কিম্বা ভাবাবেগ চিরস্থায়ী হয় না। বিশেষত মানুষের যেখানে সময়ই নেই এসব নিয়ে ভাবার। এই যুগে মানুষ যেখানে নিজের মধ্যে নিজেকেই খুঁজে পায় না, সেখানে স্ব-সংস্কৃতি জাতীয় মূল্যবোধের কথাবার্তাই বাতুলতা! কার খেয়েদেয়ে এত কাজ যে এসব কচকচানিতে ডুবে মরবে?

মানুষ হই আর যা— আমরা তো পশুই! এ কথা যে মানে না তার সাথে আমার আড়ি! মানব নির্মিত নীতিমালা দিয়ে আমাদের যতই অন্য পশুদের চেয়ে ভিন্ন বলা হোক না কেন— বৈজ্ঞানিক ভাবে এসব স্রেফ বাখোয়াজ! অন্যদের মত আমরাও আমৃত্যু ইন্দ্রিয়সুখচরিতার্থ করার প্রয়াসে ব্যস্ত! কিছু মানুষের ইন্টেলিজেন্স ইন্টেলেকচুয়ালিটির ফাঁদে পড়ে বলে এরা আলাদা! এই আলাদাগুলো হাতে গোনা হয়! Often we set them as some incredible examples of human achievements before multitude, কিন্তু এসবও কেবল অনুপ্রেরণার কথা মাত্র! সাধারণের জগতটা আলাদাই থাকে! লক্ষ ছেলে বিজ্ঞান পড়ে আইনস্টাইন হবে বলে নয়, হয়ত দেখা গেল তার ভবিষ্যত লক্ষ্য একজন ডাক্তার হওয়া, নিজেকে তথাকথিত ভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা। এটা অন্তত ৯৮% লোকের ভাবনা হয়ত! এরকম একটা এম্বিশন অভিমুখী সমাজে, কিম্বা একেবারেই এম্বিশনহীন তামস সমাজে উঁচু উঁচু নীতিবাক্য অসার না একদম?

আমাদের পাশব সত্বার সাথে লড়ে লড়ে গোটা সমাজ ভরিয়ে ফেলেছি আমরা দ্বিচারিতায়, Survival of the fittest - আমরা এই নিয়ে বাঁচি মূলত, যার ইচ্ছে সে অস্বীকার করুক— ভাষা অথবা দেশপ্রেম জাতীয় নিতান্ত এবস্ট্রাক্ট মিথ নিয়ে আমাদের কখনো নির্দিষ্ট ইভেন্ট ধরে ভাবাবেগ নামাতে হয়, দৈনন্দিন জীবনে এসব কথা রোজ কচলানো হয় না। এর আরেকটা কারণ হল সমাজের ধারাটা পাল্টে গেছে! রবীন্দ্রনাথের ‘চাঁদ উঠেছিল গগনে’র চাইতে রোদ্দুর রায়ের ‘বাঁড়া চাঁদ উঠেছিল গগনে’ আরো বেশী rejuvenated লাগছে না? কেন বলুন তো?

তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ হারিয়ে যাচ্ছেন? না! সমাজে চিরকাল লো-ইন্টেলেক্টের চাহিদা বেশী ছিল কিন্তু চাহিদানুযায়ী জোগান ছিল না! আজকে তা হচ্ছে বলে শোরগোল মনে হচ্ছে খুব! এই সমাজে যতই বৈরাগ্যশতকম লেখা হোক না কেন এখানে চিরকাল কামসূত্রই জয়ী! মুখচোরারা আগে মুখ লুকাতো, এখন তারা সবাই দাঁত কেলিয়ে সামনে আসছে! এমনটা হবার কথাই ছিল! ছিল না?

এ সমাজে তাই ভাষা-টাষা নিয়ে কৌলীন্য বৃথা। এ নিয়ে কাউকে অহেতুক প্রতিপক্ষও বানাতে নেই! নিজের পক্ষ নিয়ে নিজে উড়ি চলুন! ফুল ফোটাতে পারলে সুবাস আপনি ছড়াবে! সে সুবাসে কেবল মধুপের দলই আসবে! গুবরে পোকারাও আসবে— এমন ভাবাটাই তো বোকামি মশাই!

বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

মাতৃভাষা

কিছু মানুষের হয়ত বছরে একদিন ঘটা করে বাঙালি সাজতে ভাল লাগত একটা সময়,
আজকাল তাও কম দেখা যাচ্ছ—
অল্প খানিক ক্লাসিক কিম্বা সেকেলে হবার মধ্যেও কিছু লোক খুঁজে পেত
যৎসামান্য ন্যাকাভিজাত্যবোধ—
ইদানীং তাও মরতে বসেছে!

মানুষ বুঝে গেছে সং সাজায় কৌলীন্য নেই,
মানুষ বুঝেছে শেকড় খুঁড়ে বের করাটা কোন ট্র্যাডিশন হতেই পারে না—
ওটা মধ্যবিত্ত কালচারাল অবসেশন!

যারপরনাই বিদেশী হই বা নই— বিদেশীর মত হতে চাওয়াটি যে বিবর্তনের স্রোত এটি মানতে হবে,
মানতে হবে যে আমার ভাষার চাইতেও হতে পারে যুত্সই আরেকটি ভাষা—
যেটি প্রয়োজন কম্যুনিকেশনার্থে— যেটি স্রেফ প্রয়োজন—
সেটিতে ভাবালুতার কোন প্রশ্রয় কিম্বা প্রশ্নই নেই!

আমি আমার মায়ের প্রয়োজনে জন্মেছিলাম—
জন্মের অনেক পরে বুঝেছি আমার মা আমার কাছে—
কতটা অপ্রয়োজনীয়!

বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

বসন্ত এসে গেছে

দিকে দিকে খুশখুশে কাশির শব্দ শুনি,
ম্যাজম্যাজে আর্তস্বর— কম্বুকন্ঠে কঁকিয়ে টনসিল—
হাঁকে— ওইত্তেরি! বসন্ত এসে গেছে!

কোন ডিজিটাল কোকিল গায় কোবিতার খাতার কোনে
— ও পলাশ, ও শিমুল—
এ লগ্নে যাব কোন চিতায়— অমনি টিভি স্ক্রিন— দেক্ দেকিনি— কি কুক্ষণে— বিলকুল
— আবার সালা! বসন্ত এসে গেছে!

বাতাসে বহিছে ভাইরাস, নয়নে লাগিছে জ্বালা—
নাকেতে অবিরল উছল ফ্যাঁচাতে প্রেমধার—
নেপথ্যে পথ্য কর্মশালা—
ধুস্সালা! বসন্ত এসে গেছে!

থাক তব ভুবনের গোটাকয় মুন্ডুহীন গানের—
নাই বা পিন্ডি চটকে দেব,
তবু— ওইত্তেরি! বসন্ত এসে গেছে!

শুক্রবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

ভাল থাকার নাম

কখনো কখনো কিছু করার থাকে না,
অকারণ কারণ খোঁজার চেষ্টাও মনে আসে না আর,
মনে হয় বসে থাকি, বসে আছি যেখানে যেমন ঠাঁই
সবটাই - হিতাহিতের পারে ঠেলে
আলুনি ত্রিসংসার— তবু বুঝি এর নাম ভাল থাকা নয়!

সকল অকর্মণ্যতা বন্ধু আলস্যপ্রসূত নয়,
নিরলস যন্ত্রেরও দিন আসে বিকল হবার,
তোমরা বোঝ না কেন?
একদিন পাখিটির ডানাও যায় থেমে, ধূমকেতুও যায় নিভে
কত নদী কত বাঁক থেকে একদিন দূরে সরে যায়—
খবর রেখেছ কবে?

আমি কখনো প্রশ্নের পালে তুলিনি ঝড়ের হাওয়া,
দাঁড় ধরে বসে আছি, নোঙর আছে কি নেই তাও অজানা;
জলের শব্দ শুনি, যা শুনতে চাওয়া
হয়নি এতদিনে অনেক মাতমেও—
তারও অভীপ্সা গেছে ডুবে, হয়ত এমনটাই হয়।

কিছু করার থাকে না,
কিছু কারণ খোঁজার চেষ্টাও মনে আসে না আর,
মনে হয় বসে থাকি, বসে আছি যেখানে যেমন ঠাঁই
সবটাই - হিতাহিতের পারে জ্বেলে
আলুনি ত্রিসংসার— তবু বুঝি এর নাম ভাল থাকা নয়!

সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

জীবন বই

জীবনটি একটি বই থেকে
আরেকটি বইতে যাওয়া নয়
বরং একটি বইয়ের সবক’টি পাতা।
আপাত অর্থে এমনও মনে হতে পারে-
কিছু কথা একেবারে হয়নি তো লেখা,
কিছু পসঙ্গ গেল না প্রসঙ্গান্তরে গাঁথা—
তবু জেনো, এখানে অসমাপ্ত কিছু নেই!

শনিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

অকথিত কবিতা


কিছু কথা অকথিত থাক,
সকল কথা-ই যদি কহতব্য হবে
তবে নিজেকে নিংড়ে আর পাব না কিছুই।
জনান্তিকে কি এক জলস্রোত অকরুণ গেল বয়ে
সকলে কি তার বল রেখেছে খবর,
এদিকে বুকেতে আটকে গেছে যে কতক ঢেউ
আমি অকুলে ভেবেই মরি- ছুঁই কি না ছুঁই!

পাহাড় ডিঙিয়ে গেছি আরও কত পাহাড়ের পর,
শতেক যোজন ধরে অহর্নিশ, নির্নিমিখ অযুত প্রহর-
আমি কেমন শ্রান্ত হয়ে আর লিখিনি কত;
সকল কিছুই যদি লেখা হয়ে যাবে
তবে নিজেকে জমাট করে হত না কিছুই।
পৃথিবীর অন্তরালে আরেক পৃথিবী যায় ক্ষয়ে
সকল পার্থিব কি রাখে সেখানে নজর,
এদিকে আমার উঠোনে আর আসে না মাঘের ঘ্রাণ
জাগে না সকাল রোদে বেলী আর জুঁই!


তীরে ফেরা

  অনন্ত দিনরাত্রির কত স্রোতভঙ্গ কলরোলে আমি ভাসিয়ে ভেলা অবেলা ওপারে যাব বলে হাল ধরে ঠাঁই জেগে আছি নির্নিমিখ। কত ঝড়ের ঝাপটা এসে, দিল দোলা ক...