রবিবার, ৭ জানুয়ারি, ২০১৮

প্রেমপ্রাপ্তি

কি সুখে গো হৃদয়রাণী ভিখারীরে ভালবাস
ত্যাজিয়া কুলের মান, ধরমের নীতি
আপন বৈভব বিভা, স্বজনের প্রীতি
ভুলিয়া কিসের ভ্রমে মুচকিয়া হাস?
যবে আমি পথপাশে ভিক্ষাপাত্র হাতে
জাগিতেছি প্রতিক্ষণ অমানিশি রাতে
কি প্রমাদে দেবী মোর আসিলে হেথায়?
প্রেমকুম্ভ পূর্ণ সুধা ঢালিলে নিঃশেষে
সবই তার বরিয়াছি প্রবল ক্ষুধায়!
বহুকাল বঞ্চিত মম হৃদয়ের আশা
সঞ্চিত গুপ্তধনে যবে দেখি কালসর্প বাসা
বাঁধিয়াছে পরম যতনে,
ভাবিলাম- ঈশ্বরের ইচ্ছা যাহা
থাক তাহা ঈশ্বরের মনে
আমি যাই আপন বেগে আঁখি যেথা ধায়
তুমি কেন আসিলে গো ছুটিয়া হেথায়
বাঁধিবারে মৃত্যুপথিকে!

দেবী মোর, 
রাজ রাজেশ্বরী, মানস মরাল কুঞ্জে
গাহিতেছিলে গান, নড়িতেছিলে নব আম্রপল্লব
সুরের আবেশে তার, ধরণীর সর্বসুখ দোদুল্যমান
হেরি ভ্রমর গুঞ্জে, বেদনা নবীন নব
কাঁদিয়া মরিতেছিলে পরাণে আমার
তুমি আসি হাত দুটি বাড়ায়ে তোমার
কেন বলিলে গো 'ভালবাসি'
দাঁড়ায়ে সমুখে?

বল কি দিয়া বরিব দেবী সাধনার ধনে?
জন্ম জন্ম তপফল লভিয়া নির্জনে
কি করিব? কোথা যাব? রাখিব কোথায়?
আমি যে নিরাশ্রয়, অনিকেত দীন 
আমার সর্বস্ব যাহা ভিক্ষার ঝোলায়
তাহা বড় অপ্রতুল সৃজিতে সংসার
ভালবাসা ভিন্ন তোমা কি দিব গো আর?
আমি যে হতেছি ক্ষয়, ক্রমশ মলিন
দীর্ঘপথ ঘুরিয়া মরি দারুণ ধুলায়!

অপরাধ

চরমতম অপরাধ- ভালবাসি বলে
আমাকে ফাঁসীতে ঝোলাও, মেরে ফেলো, পাথর ছোড়ো;
তবু বিচ্ছেদ দিও না হৃদয় থেকে হৃদয়ের
আমি খুব কষ্ট পাব!

খুব কোমল-
ছত্রাকের মত গজিয়ে গেলাম স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে,
তোমাদের ইচ্ছে অনিচ্ছের থোড়া-ই তোয়াক্কা করে
তোমাদের সাধের সংসারে, সমাজ, প্রথা ও বিনষ্ট আচারে
একটু নাড়া দিলাম, তোমাদের বিভোল শিরা ও ধমনীতে
ঈষৎ আগুন দিলাম ঢেলে হোলির রঙের মত দারুন উল্লাসে!

অমার্জনীয় অপরাধ, আমার দারিদ্র্যতা!
আমাকে শূলে দাও, পুড়িয়ে মারো, ঢালো শরীরে পেট্রোল,
যে সমাজে চিত্তহীনেরা বিত্তবান সে দেশে এই হওয়া ভাল
তবু হৃদয়কে হতে দাও প্রেমের ভিখারী!
আসমুদ্রহিমাচল প্রেমের কল্লোল
নইলে থমকে যাবে!

আমাকে ফাঁসীতে ঝোলানো হোক- ভালবাসি বলে,
তারপর ভাসিয়ে দিও কর্ণফুলির জলে বিজন দুপুরে
নইলে সে লাশ খাবে শেয়ালে কুকুরে নির্ঘাত,
ভালবাসা হল এক হীনতম অপরাধ
পূর্বকৃত অজানিত পাপ কর্মফলে!

শকুন্তলা

নিজের বৃত্তে নিজেই বন্দী
নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ
নিজের সাথে নিজের সন্ধি
এই তো আছি বেশ।
তুমি এলে বুকের ভেতর,
হঠাৎ নিরুদ্দেশ!

জীবনজুড়ে শনির দশা
উড়ছে মাছি ঘুরছে মশা
ঘ্যানঘ্যানানি প্যানপ্যানানি
দারুন দুঃখ ক্লেশ!
ঘুম পাড়ানির গান শোনালে
সকল দুঃখ শেষ!

আমি ছিলাম আমার মত
বক্ষে আমার বিষের ক্ষত
আগলে রেখে অনন্তকাল
শেষ রাগিণীর রেশ।
ঝড়ের মেঘে ভাসছে দেখি
মুক্ত তোমার কেশ!

কণ্বমুনির ক্ষুদ্র কুটির
শকুন্তলার ভানে
তুমি ছিলে উদাস হয়ে
একান্তে আনমনে।
ঘড়ঘড়িয়ে রথের চাকা
আমি এলাম ছুটে
দস্যু আমি চিরটা-কাল
সব নিয়েছি লুটে!!

কবি আমি মানুষ আমি
তাই মেনেছি হার
তোমার কাছে সব দিয়েছি-
আমার ব্যথার ভার!

এ জীবনে না পাই যদি
একটি ফুলের মালা
জীবন ভরা ভুলের সাজি 
তোমায় শকুন্তলা
দিয়েই যাব দম্ভভরে
এই করেছি পণ!
পুড়ুক পুড়ুক আরো পুড়ুক
এমনি পোড়া মন!!

টুকরোকাব্য - ১

কালো হাত নেমে আসে চোখের ওপর
ঘুম আয়, আয় ঘুম, আয় কালো রাত
অনেক ইচ্ছে আজ- হাতে রাখি হাত!
...............

সব বাসা বাসা নয়,
কিছু ভাল বাসা!
সব আছে
দরজা জানালা আছে
আছে ভ্যান্টিলেটর
মানুষ কখনো আসে
বহুদিন পর!
..............

সব আশা আশা নয়
কিছু দুরাশা,
কু-আশার কুয়াশায়
কিছু হতাশা
মাঝেমাঝে রাস্তা হারায়,
সুর্যের ছায়া এসে
থমকে দাঁড়ায়!
..................

হঠাৎ কখনো ভাবি- আমিও মানুষ
'মানুষের মত' কিছু নই!
চারপাশ ঘুরে দেখি জাসুসের চোখে
আমিও মানুষ- ভেবে পুলকিত হই!
.............

যদি এ সমাজ বলে ভুলতে তোমায়
তবে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম বিশ্বযুদ্ধ হোক না!
জানি প্রতিবার হেরে যাব!!
.............

তবুও তো ভালবাসি,
তবুও তো মৃত্যু আসে
তবুও তো আসে অপবাদ!
অনেকের ভালবাসা বিনোদন প্রায়
অনেকের ভালবাসা মহা অপরাধ!!

অসুখ

রাত রাত উজাড় করে চক্রব্যূহে ঘোরা।
নিষ্ক্রমণের পথ অজানা, অচেনা, অবরুদ্ধ
বুকের শ্বাস, হৃৎপিণ্ড পোড়া- মাতাল গন্ধ;
মেধার সাথে মনের যুদ্ধ, ঘনকৃষ্ণ-মুক্তকুন্তল
নাকি ভ্রমরাক্ষি- কোনটা সুন্দর, মৃদুলা মন্দ 
বায়ে যে অচঞ্চল বস্ত্র-অঞ্চল ঈষৎ নড়ে ঘাসের শীষের
দেশে, শিশিরস্নাত প্রথম বসন্তবেলা যে পদছাপ,
যে নুপুর সিঞ্জন আমাকে জাগায় গভীর ঘুমের
সম্মোহন শেষে, যে অকৃত্রিম উদগ্র আলিঙ্গনীপ্সা
প্রবল আগুন, খাণ্ডবপ্রস্থ গ্রাস, শ্লীলতার মনস্তত্ত্ববোধ
প্রথম মানবকৃত আদিমতম পাপ, স্বগত স্ববিরোধ
সে আমাকে টেনে হিঁচড়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

এখন মনে হয় প্রেমে পড়া অসুখের মত!
আমি দারুণ অসুস্থ! আমি তিলেতিলে মরে যাচ্ছি তাতে।

অকবিতা কথা

এরপর আমরা অজস্র গদ্য লিখব
অথচ প্রত্যেকটিকে আমরা কবিতা বলব!
এরপর আমরা খর্বাকৃতির গদ্য লিখব, গাদাগাদা গদ্য
গদগদ আবেগের প্যাঁচপ্যাঁচে সব রসায়িত গদ্য;
অ-অনবদ্য, অনর্থবহ ও ভাবাবেগে প্রবল অপ্রতিরোধ্য 
দুর্বোধ্য বাক্যবিন্যাসে আমরা একের পর এক গদ্য লিখব
ও সব গদ্যকেই আমরা কবিতা বলব!

ছন্দ ফন্দ ইত্যাদি অতি অনাবশ্যক দ্বন্দ্বকারী কথাবার্তার গায়ে
পানের পিক ছুড়ে, জীবনানন্দের জীবন জুড়ে প্রশস্তির বাতাস দিয়ে
আমরা পদানত হয়ে দিবারাত ভজনা করব তার-
'গুরু কি জিনিস করলে আবিষ্কার!' 
গদ্যও কবিতা হয় বটে!

আমরা অনেক অনেক অসংস্কৃত অনুপ্রেরণা, অননুমেয় কবিত্ব, প্রজ্ঞা,
অপশিক্ষিত পরানুকরণজাত সাহিত্যরথী হয়ে অজস্র অজস্র কত কি লিখব
এবং আমরা আমাদের সব লেখাকেই কবিতা বলব! 
আমাদের শব্দালংকার হবে নান্দনিক! 
উপমা হবে ব্রেনের দু হোমোস্ফেয়ারে জটলা বাধাতে সক্ষম!
আমাদের এক একটি বাক্য হবে কেমিস্ট্রির বিক্রিয়ার মত জটিল, কুটিল,
পরীক্ষাগারে উল্টেপাল্টে গবেষণা করার মত তাৎপর্যপূর্ণ এবং-
মোটেই সহজবোধ্য কিছু নয়; সহজে যা বোঝা যায় সেটা অকবিতা! -
এ কথাটাই হবে সর্বজনবোধ্য।

এরপর সব জ্বলনোন্মুখ নতুন নতুন ভাবপ্রকাশে নিয়োজিত হব আমরা।
শতসহস্র, সহস্র সহস্র ও লক্ষসহস্র ধারায় আমাদের ভাবধারা পুরাতনের
জীর্ণগৃহ উৎপাটিত করে ত্বরান্বিত হবে গদ্যগঙ্গার স্রোতে দুর্নিবার বেগে-
বাংলার অলিন্দ নিলয়ে। গদ্য ঘনাবে ঘোর কবীন্দ্রের মেঘে
অকবিতার অনভিপ্রেত দেশে অনাশ্রিত হয়ে-
সারারাত জেগে
কোনদিন।

পাগল হব

তোমাকে ভালবেসে পাগল হব!
আমার ভূতপূর্ব চৌদ্দপুরুষে কেউ পাগল না থাক!
ক্ষতি নেই! এবার আমিই হব!
অত্যন্ত পাগল! এবং শুধু তোমার জন্যই হব!
এতটা ভালবাসব, এতটা প্রচণ্ডতা থাকবে, তীব্রতা থাকবে
সে ভালবাসায়- তুমি ভাবতে পারবে না!
আমার সমস্ত বৈভব তুলে বৈতরণীর ঘাটে, মেধা ও প্রতিভাকে,
যাবতীয় অহং, আভিজাত্য, গৌরব- হাসরের মাঠে
ছুঁড়ে দিয়ে আমি কেবল ভালবাসব, ভালবাসব
এবং ভালবাসতেই থাকব তোমাকে!

এতটাই উন্মত্ত হব- তুমি বিরক্ত হয়ে যাবে
এতটাই সবল বাহুবন্ধন, এতটাই অবিচ্ছিন্ন থাকবে 
তুমি হাসফাস করবে! তুমি গরমে ঘেমে যাবে!
আমি সমুদ্রে নেমে যাব, গভীর জোয়ারে!

পাগল হব! সত্যি বলছি পাগল হব!
এ ছাড়া বাঁচার কোন বিকল্প নেই! যত জীবন পরিকল্পনা
অলীক কল্পনার মত, দূর ছাই, ভেস্তে যাচ্ছে, যাক যাক, চুলোয় যাক!
তুমি থাকো, আমি পাগল হব! হবই হব-
তোমাকে ভালবেসে এ জীবনে অন্তত একবার, ঝড়ো কাকের মত
বিরোধী হাওয়ায় ডানা মেলে দেব, দুর্বার, আকুল নীড়ের টানে
আমি কোথায় হারাব- জানি না!

তুমি থেকো, জানালা খুলে রেখো, আমি পাগল হব!

তীরে ফেরা

  অনন্ত দিনরাত্রির কত স্রোতভঙ্গ কলরোলে আমি ভাসিয়ে ভেলা অবেলা ওপারে যাব বলে হাল ধরে ঠাঁই জেগে আছি নির্নিমিখ। কত ঝড়ের ঝাপটা এসে, দিল দোলা ক...