বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২০

মায়াবাদ


ভগবান লীলাছলে এই জগতপ্রপঞ্চ রচিয়াছেন, তাহাতে প্রাণের সঞ্চার করিয়াছেন, প্রাণের স্পন্দনের অন্তরালে তিনি দিয়াছেন চেতনা যাহাতে জীব একদা অনুভব করিতে পারে এই জগত তাহার রচনা, তিনি জগতের স্বামী, তাহাকে জানিতে পারিলেই মুক্তি, তিনিই সকল জীবাত্মার একান্ত গতি! আমরা তাঁহাকে জানিতে পারি না বলিয়াই এত দুর্দশায় পতিত হই। এই সংসারে একমাত্র তিনিই সত্যসার, বাকী সকল অনিত্য, অসার, মিথ্যা ও জড়- এই বোধ নাই বলিয়াই আমরা এত পতিত, এত তাপিত; তাঁহার শীতল করকমলের স্পর্শ হইতে বঞ্চিত। আমরা কেন এত ভ্রমে মজিয়া আছি? সত্যকে অনুভব করিতে আমাদের এত অপারগতা কিসের? কেনই বা এই সংসারের বন্ধুর পথে বারেবারে নানাভাবে হোঁচট খাইয়া পড়িলেও এই সংসার হইতে আমাদের আসক্তির লেশমাত্র উপশম হয় না? আমরা কেনই বা এত ভগবদ্বিমুখ?

পৌরাণিক কথামালায় বিশ্বাসী ভক্তশ্রেণী এই প্রশ্নের নিরসণে একটি মিশ্রিত তত্ত্ব ঠাহর করিয়াছিলেন। প্রথমত- জীবের জন্মান্তরীন কর্মসংস্কার যাহা জীবের মুক্তির অন্তরায় হইয়া আসে বলিয়া তাহারা বলিয়া থাকেন, দ্বিতীয়ত জগদীশ্বরের মায়া-ই ইহার কারণ, তিনি জগতকে মায়া দিয়া আচ্ছন্ন করিয়াছেন, কেন করিয়াছেন- কেন না তিনি লীলা করিতে ভালবাসেন! এই ত্রিসংসার তাঁহার ক্রীড়াভূমি! আমাদের অন্তর হইতে মায়ার আবরণ ঘুচিয়া গেলে তখনই আমরা তাঁহার এই লীলার তাৎপর্য্য অনুধাবন করিতে সক্ষম হইব। বদ্ধজীবের কষ্টের কারণ তাঁহার লীলার গভীরে না যাইয়া জড়জগতের অসার বস্তু সকল লইয়া মজিয়া থাকায়। ভক্তেরা বলেন- ইহাদের চৈতন্য নাই, কারণ ইহাদের মতি ঈশ্বরের পথ হইতে দূরে। যদি এই প্রশ্ন আসে যে, যিনি সর্বনিয়ন্তা তিনি চাহিলেই তো পারিতেন ইহাদের মতি নিমেষক্ষণে তাহার দিকে টানিয়া লইতে, তবে তিনি তাহা করেন না কেন?- তখন এই প্রশ্নের কোন মননযোগ্য উত্তর ভক্তের মনে পড়ে না! তখন বলিতে হয়- এও তাঁর লীলা, অথবা সেই কর্মফলবাদের পুরাতন খোঁড়া দোহাই! তাহারা প্রারব্ধের বশে বদ্ধ। সংস্কার ক্ষয় না হইলে, সঞ্চিত কর্মের ফলভোগ না হইলে সেই গভীর অন্তঃদৃষ্টি জন্মিবে না!   

যদি আমাকে সত্য হইতে বঞ্চিত করিয়া রাখা ভগবানের লীলা হইয়া থাকে- তাহা হইলে তেমন ভগবানকে একজন ক্রুর প্রবঞ্চক ভিন্ন আর কি বলিব? যদি ইহা সত্য যে আমরা শুভাশুভ কর্মের ফল ভুগিতেছি মাত্র, এবং অতীত কোন অশুভ কর্মের সংস্কার আমাদের বারেবারে একইরূপ হীনপথে ধাবিত করিতেছে যাহার ফলস্বরূপ আমাদের শুভবোধ জাগ্রত হইতে পারিতেছে না, তাহা হইলেও কয়েকটি গোড়ার প্রশ্ন আসে- আমাদের প্রথম অশুভ কর্মটি কিরূপে হইয়াছিল? আমাদের মনে কেনই বা আদিমতম অশুভ ভাবটি জন্মিয়াছিল? কেনই বা আমরা মোক্ষদ্বারনিরোধক পাপে নিয়োজিত হইয়াছিলাম? সেই ক্ষণে বিধাতার কি ভূমিকা ছিল? আমাদের প্রবৃত্তি কি পূর্ব হইতে বিধাতার ইচ্ছানুসারী ছিল না? নাকি আমরা প্রথম হইতেই ‘যাহা করিতে ইচ্ছুক, তাহাই করিব' এইরূপ মনোভাবাপন্ন ও ভাবিতে স্বাধীন ছিলাম? যদি আমাদের কৃতকর্ম ও তাহার ফলের জন্য আমরাই একান্তভাবে দায়ী রহি, তাহা হইলে ‘কোনকিছুই ঈশ্বরের ইচ্ছা ব্যতিরেকে ঘটে না’ এমন কথার কোন যুক্তিসিদ্ধতা থাকে না! যদি আমাদের কৃতকর্মই আমাদের ভবিষ্যত নির্ধারণ করিয়া দিবে, আমাদের কৃতকর্মই পারে আমাদের মোক্ষের পথে লইয়া যাইতে তাহা হইলে কেবলমাত্র সৎকর্মের মাধ্যমেই তাহা করা সম্ভব, তাহার জন্য একজন ঈশ্বরের দয়ার অপেক্ষা করিতে হইবে কি?

আর যদি কেবল মাত্র তাঁহার দয়া হইলেই তিনি আপনা প্রকাশিত হইবেন ও মোক্ষ দ্বার অবারিত করিবেন ইত্যাদি ভক্তিকথা সত্য হয়- তাহা হইলে কর্মফলের দোহাইটিকে দূরে সরাইয়া রাখিতে হইবে! ‘একবার নাম নিলে যত পাপ হরে, জীবের সাধ্য নাই তত পাপ করে’- লক্ষ পাপকর্ম করিয়াও জীব বলিবে আমি পাপ করিয়াছি, তথাপি তব নামে আমি শরণাগত অতএব হে কর্মের ফলদাতা তুমি কৃপা করিয়া সকল দোষ ক্ষালন করিয়াও লও! যদি কর্মের একজন ফলদাতা থাকেন তাহা হইলে কর্মের সহিত কর্মফলবাদের ও ভাক্তিতত্ত্বের একটি মিশ্রণ দেখানো যাইতে পারে। নচেৎ হিন্দু দর্শনের যে মৌলিক কর্মফলবাদ, তদাশ্রিত জন্মান্তরবাদ- তাহার সহিত ভক্তি-ভক্ত-ভগবানের সুসম্পর্ক নাই!

জীব কুকর্মে কেন প্রবৃত্ত হইল- এই প্রশ্নের অদ্যপি সদুত্তর হইল না। কি কুহকে পড়িয়া তাহার মনে অসদ্ভাব আসিল? কেন আদম মর্ত্যে আসিয়া নিষিদ্ধ ফল খাইয়া ফেলিল? তাহার কেন জ্ঞাত হইল না এই ফলটি খাইলে পাপ হইবে? আদমকে আমরা আমাদের প্রতিভূ করিয়া লইলাম তর্কের খাতিরে। ধরিয়া লইলাম-

১।  আদম যাহাই করেন তাহাই ঈশ্বরের গুপ্ত ইচ্ছা নহে, আদম কিছু না কিছু স্বাধীন চিন্তানুসারে করিতে সক্ষম, সেই স্বাধীন ইচ্ছার বলবর্তী হইয়া আদম একটি দুষ্কর্ম করিলেন, তাই তাহার শাস্তি হইল। এইখানে আমরা একটি সিদ্ধান্ত পাইলাম যে, আদমেরও একটি সিদ্ধান্ত লইবার ক্ষমতা আছে। তিনি ঈশ্বরের হাতের যন্ত্র বিশেষ নহেন!

২।  আদম অজ্ঞাতসারেই এই মারাত্মক ভ্রমটি করিয়াছিলেন, কেন না ঈশ্বর তাহার মনে একটি প্রেরণা জুগাইয়াছিলেন, অথবা ঈশ্বর এইরকম লীলা প্রকট করিতেছিলেন যাহাতে আদম একটি নিমিত্তমাত্র- আদম ফল খাইবে, আদম শাস্তি পাইবে, এই শাস্তির মাধ্যমে জগতে মানবজাতি আসিবে এবং মানবেরা ঈশ্বরের ভজনা করিবে! আমরা আরেকটি সিদ্ধান্তে উপনীত হইলাম যে- আমরা ঈশ্বরের ঈচ্ছাধীন, তিনি যেমন চাহিতেছেন আমরা সেইরূপে পরিচালিত হইতেছি!

৩। আদম অতি সরল চিত্তে একটি ফল খাইয়াছে, তাহার এই সব যাবতীয় পাপ-পূণ্যের বোধ ছিল না, তিনি জ্ঞানত কাহারও কোন ক্ষতি করিতে চাহেন নাই, তথাপি একটি ফল খাইয়া তাহার মনে একটি স্বাভাবিক জৈব প্রেরণা জন্মিল, তিনি হাওয়ার সহিত মিলিত হইলেন- অতঃপর শাস্তি পাইলেন! কোনটি কি অর্থে নিষিদ্ধ সে বোধ পূর্বে ছিল না, অদ্য তাহার মাধ্যমে সিদ্ধাসিদ্ধের নীতি উদিত হইবে। এইখানে আদম ঈশ্বরের সম্মুখে একটি বলির পাঁঠা- যাহার কিছুই করিবার নাই! ইহা আরেকটি সিদ্ধান্ত।

উপরোক্ত  তিনটি  সিদ্ধান্তের মধ্যে ভক্তগণ যে সময়ে যেটি প্রযোজ্য সেইক্ষণে তাহারই প্রয়োগ করিয়া থাকেন! আমরা কি স্বাধীন? আমরা ভগবানের হাতের পুতুল? আমাদের শুভাশুভ কর্মের নিয়ন্তা কি ভগবান স্বয়ং?- এই সকল প্রশ্নের যথাবিহিত উত্তর ভক্তের হাতে নাই। ভক্ত বলেন ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর!’ তর্কসাঙ্গ করিবার এই হল ভক্তের শেষ মহাস্ত্র! অতএব আমরা ভগবানকে কিরূপে জানিব? ভক্ত বলেন ‘তাঁহার কৃপা হইলেই জানিতে পারিবে’! তাঁহার কৃপা কিরূপে হইবে? ‘তাঁহার আরাধনা, স্তুতি, শুভকর্মে তিনি প্রসন্ন হইলে।‘ চিত্ত সেই পথে ধাবিত হয় না কেন? __
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নহে! ভক্ত সাধক বলেন- বারেবারে মনকে ঘষামাজা করিলে তাহা ক্রমে চকচক করিয়া উঠিবে। মন পরিষ্কার হইলে তাহাতে তাঁহার প্রতিবিম্ব ভাসিবে। এই চেষ্টাটির নাম সাধনা, এটিই তো তপস্যা! মনকে বারবার ফিরাইয়া আনা। ইন্দ্রিয়সুখ হইতে তুলিয়া ভগবদসুখে তাহাকে প্রবৃত্ত করা! এই কাজ কি সহজ? ভক্ত এইখানে মনকে নিয়োজিত করিবার উপায় বলিতেছেন, কিন্তু কোন দর্শনপ্রসূত সমাধানে আসিতে পারেন নাই! অথবা তিনি কেবলমাত্র তাঁর স্ব-বিশ্বাসটিকে দর্শনের ভাষায় নামাইয়া একটি বিচিত্র খিচুড়ি বানাইতে চাহিয়াছিলেন! এই চেষ্টায় জগতের তাবৎ ভক্তকূল জয়ী হইয়াছেন বটে! এই স্থলে ‘ভ্রাময়ণ সর্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া’ বলেই শেষ করিতে হয়!

বেদান্ত বলিতেছে- ‘জগত পরব্রহ্মের দ্বারা বস্ত্রের ন্যায় আচ্ছাদিত। তিনিই জগদ্রূপে প্রতিভাত হইতেছেন!’ আবার বলিতেছেন, আমরা তাহাকে জানিতে পারি না কারণ ‘পরব্রহ্ম আমাদের ইন্দ্রিয়সকলকে বহির্মুখী করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন (পরব্রহ্ম কোন ব্যক্তিবাচক শব্দ নহে), সেইহেতু আমরা আপনার গভীরে স্থিত পরমসত্ত্বাকে জানিতে না পারি। যাহারা ইন্দ্রিয়সমূহকে গুটাইয়া নিজের ভেতরে দেখিতে পান- তাহাদের আত্মসাক্ষাৎকার হয়! পরব্রহ্ম একটি আলাদা মিথ্যার আবরণ রচিয়াছেন, এই কথা বেদান্তের নহে! বেদান্ত বলে- সেই ব্রহ্ম আনন্দস্বরূপ ও সর্বভূতে বিরাজমান! একটি আলাদা শক্তিশালী, সর্ব শক্তির অধীশ্বর, যিনি যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে সক্ষম এমন কোন ব্যক্তিরূপসম্পন্ন ঈশ্বরের কথাকে এইখানে প্রাধান্য দেয়া হয় নাই! আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহ বহির্মুখী বলিয়াই আমাদের অন্তঃদৃষ্টি ক্ষীণ এই কথা বলিতেছে! কাহারো দয়ায় এই অন্তর্দৃষ্টি জাগিবে- এমন তত্ত্ব বেদান্তের নহে। আমরা ঈশ্বরের মায়ায়, তাহার লীলায় আচ্ছন্ন হইয়াছি বলিয়া তাহাকে ভুলিয়া আছি- এই কথাও আমাদের পুরাতনী বেদান্ত বলে না। বেদান্ত বলে- আমাদের স্বরূপ হইল আমাদেরই অন্তস্থ ব্রহ্ম, আমরাই সত্যস্বরূপ, আমরা তথাপি ইহা উপলব্ধি করি না, কেন না আমরা- অজ্ঞানে মগ্ন রহিয়াছি, আমরা অবিদ্যায় আচ্ছন্ন, আমরা আপনার গভীরে দেখিতে তৎপর নহি- এই অপারগতাটিই ‘মায়া’! একটি অসত্যকে অসত্য বলিয়া অনুভব করিবার পরও তাহাতে আসক্ত হইয়া পড়ি। কারণ কেহ আমাদের জাদু করিয়াছে বলিয়া নহে, কেহ আমাদের দৃষ্টিদুয়ার রোধ করিয়াছে বলিয়া নহে- বরং আমরা আমাদ্বিগের ইন্দ্রিয় প্রভাবেই বাহিরের জগতকে সর্বদা আত্মস্থ করিতে চাহি, যদ্যপি বাহিরের জগতটিই একটি আপেক্ষিক সত্য, নিয়ত পরিবর্তনশীল, ইহাকে সত্যের ধ্রুবকমাণ ধরা চলিবে না! অদ্বৈত বেদান্ত জগতকে মিথ্যা বলিতেছে, কারণ অদ্বৈত পথের সাধকেরা জন্মান্ধ! তাহা নহে। কিছু মূর্খ বুঝিতে পারে নাই! মিথা শব্দের অর্থ- অনিত্য! যাহা আজ আছে কিন্তু কাল রহিবে না এমন কিছুকে স্থির সত্য কিরূপে বলিবে? তাঁহারা বলিতেছেন- কেবলমাত্র পরব্রহ্মই সত্য, একমাত্র অবিনশ্বর সত্য! তাঁহারা বলিতেছেন- এই জগত প্রপঞ্চ একটি মায়া, একটি মিথ্যা! কি অর্থে? অবিদ্যায় অন্ধজন এই সত্য উপলব্ধি করেন না যে এই প্রপঞ্চের অন্তরালে সেই ব্রহ্মেরই বিচরণ! ব্রহ্মই সকল কিছুতে অধিষ্টিত। অন্ধজন জগতস্থিত ব্রহ্মকে না দেখিয়া বাহিরের অস্থিচর্মসারটিকেই উপভোগ্য করিয়া দিনাতিপাত করে! এইরূপ মিথ্যা কালযাপনটিই বেদান্তের ভাষায় মায়া! জগতকে এইরূপে দর্শনই মিথ্যা! জগতকে যখন কেবলমাত্র ভোগের সামগ্রীভরপুর বলিয়া প্রতীতি হয়- তখনই বেদান্ত বলে ইহা অবিদ্যা, ইহা মায়া, ইহা অজ্ঞান, ইহা মিথ্যা; আবার যখন জ্ঞানচক্ষু উন্মিলিত হয় তখন মানুষ দেখিতে পায়- আলাদা করিয়া ভাবিবার মত কোন পরব্রহ্ম নাই, তিনি এই জগতেই, তিনি আমাতেই- এই উপলব্ধিটিই আত্মদর্শন। তিনি নিজেকে জগত হইতেও আলাদা করেন না! জ্ঞানীর সে ভেদ ভাব নাই! ‘স্বীয় আত্মাকে সর্বভূতে দেখা ও সর্বভূতের আত্মাকে স্বীয় আত্মায় দেখা’- এরই নাম ব্রহ্মোপলব্ধি! এরই নাম অপরোক্ষানুভূতি! এটিই বেদান্ত বলে! মিথ্যা দৃষ্টিটি দূরে সরাইয়া সত্য দৃষ্টিটিকে উন্মোচিত করা! আপনার অজ্ঞানতার দায়ভার কোন ঈশ্বরে প্রযুক্ত না করিয়া স্বীয় চরিত্রবলে জ্ঞানারোহণের সাধনা এটি।  সত্যকে কেন জানিতে না পারি? কেন  না আমরা মায়াচ্ছন্ন! মায়া কি? মায়া মানে অজ্ঞান, অবিদ্যা, মিথ্যা! এই মায়া আত্মসঞ্জাত! কেহ সৃষ্টি করেন নাই। তবে এই মায়া কিরূপে আসিল? কিরূপে আমরা এই মায়ায় মুগ্ধ হইলাম? এই জিজ্ঞাসার উত্তর কি হইবে? অদ্বৈতও এইখানে বৈভবপূর্ণ উত্তর দিতে পারিয়াছে বলিয়া বোধ করি না! তবে বেদান্তের ধারায় মনে হয়- মায়া একটি ঘটনা, যাহা নিত্য-ঘটমান, যাহা কার্যকারণ সম্পর্কে উদ্ভূত নহে, ইহা ঘটিয়া চলিতেছে নিয়ত চোখের সম্মুখে তথাপি ইহার কোন ব্যখ্যা নাই! মায়া একটি ব্যাখার অতীত সূত্র! যে মূর্খের দল অদ্বৈত বেদান্তের ‘মায়া’টি কি তাহা ধরিতে পারে নাই- তাদের কাছে অদ্বৈত হইয়া গিয়াছে ‘মায়াবাদ’! যেহেতু অদ্বৈত বেদান্ত একজন ‘মায়াপতি’ আবিষ্কার করিয়া ফেলে নাই যাহার ওপর সমস্ত অলৌকিকতার আলো ফেলিয়া চিরকালের মত যুক্তিবিমুখ হইয়া কেবলমাত্র অন্ধানুসরণকেই পন্থা করিবে! যেহেতু বেদান্ত যথাসম্ভব যুক্তিনিষ্ঠ হইবার প্রয়াস করিয়াছে, যেহেতু তাহারা ব্যখ্যাতীত ঘটনাকে রঙ চড়াইয়া উপস্থাপিত করিতে পারে নাই সেহেতু তাহাদের দর্শন সকলের পাতে ভাল রুচিল না! যেহেতু যুক্তির সাথে জুঝিয়া উঠিতে যে শক্তি লাগে তাহাও সকলের নাই, সেহেতু হীনবল লোক যেমন পশ্চাতে থাকিয়া সবলের নিন্দাবাদকেই আপনার গৌরব ভাবিয়া থাকে, তেমনি কেবল বিশ্বাসীর দল যুক্তিবাদের মুন্ডুপাত করিয়াই স্ব-গোত্রমধ্যে আহ্লাদিত!

মায়া, অজ্ঞান, অবিদ্যা, মিথ্যা এইসকল খলদল কি হেতু ও কি রূপে আমাদের গ্রাসিল, তাহা লইয়া বিকট দর্শন না রচিয়াও একজন ব্যক্তি ভারতবর্ষে সহস্র সূর্য্যের প্রভা লইয়া উদ্দীপিত হইয়াছিলেন! তিনি তথাগত বুদ্ধ। তিনি বলিয়াছিলেন ইহা সত্য যে আমরা মায়া, অজ্ঞানের অন্ধকারে ডুবিয়া আছি, ইহা সত্য যে আমরা অসত্যকে সত্য বলিয়া প্রাণপণে তাহাকে জড়াইয়া আছি- তবে কোথা হইতে এইসকল আসিল তাহা ভাবিয়া দিনাতিপাত করা অপেক্ষা শ্রেয় নিজেকে এইসকল শৃঙ্ক্ষল হইতে মুক্ত করা, নিজেদের মোক্ষের সাধনায় ব্রতী করা, এবং তাহা কোন পূর্ববর্তী বিশ্বাসকে পূঁজি করিয়া নহে, সেই সাধনা হইবে অন্তরের অন্তস্থ সত্ত্বাটিকে জাগরিত করিয়া, নিজের অন্তরকে দেখিতে চাহিয়া, সত্যকে নিজের ভেতর খুঁজিতে চাহিয়া মিলিবে সে পথ- সে পথ গেছে নির্বাণের দিকে! অদ্বৈত বেদান্তের দর্শন এই সাধারণ কথাগুলিকে এতটা সহজ করিয়া বলিতে পারে নাই যেরূপে ইনি  প্রচারিলেন।  তথাপি আমরা কি পারিয়াছি তাহার কথাগুলিকেও ধারণ করিতে? না, পারি নাই! আমরা চিরকাল বিশ্বাস করাকেই করিয়াছি বাঁচিবার পুঁজি! যিনি বলেন নাই ভগবানে বিশ্বাস করিতে, কালক্রমে আমরা তাহাকেই ভগবান বানাইয়া পূজা করিতে লাগিলাম! ইহাই আমাদের রীতি! আমাদের বিশ্বাসকে প্রস্তরীভূত করিবার জন্য, আমাদের বিশ্বাসকে পরম্পরা বানাইবার জন্য আমরা কত গ্রন্থ লিখিলাম- ক্রমশ যুক্তি ও দর্শনের সাধনাকে আমরা বিশ্বাসের হাড়িকাঠে আনিয়া ফেলিলাম! যে সকল তত্ত্ব হইল আমাদের বুদ্ধির অগম্য তাহদের দূর-ছাই করিলাম, আমরা মূর্খ হইয়াও সংখ্যাগরিষ্ঠ হইয়াছি হেতু, সংখ্যালঘুর সৌন্দর্য্যটিকে আমরা সদলবলে মিলিয়া কুৎসিত আখ্যা করিলাম! আমাদের এইসকল কর্মে বিরাম নাই! ইহাও কি বিচিত্র মায়া! 

কোয়ারান্টাইনের গ্যাঁজাল


আনাজে অদ্য আকাল পরেছে, মাছে মাংসেতে হাহাকার
মুরগীর ডিম জোড়া বারো টাকা, কপাল খুলেছে ডিম’অলার!
বিড়ি-টিরি বেচা বন্ধ করেছে বিড়িখোর আছে বিপদে,
বিদেশীরা মদ গিলছে না আর, হাত ধোবে তারা মদে!
স্যানিটাইজার কম পরে গেছে, টইলেটে নাই টিস্যু-
নিউজ’অলার টিআরপি বাড়ে- এবেলা এসবই ইস্যু!  

আমোদে মজেছে ফিলিমের বালা, ফেসবুকে করে যা তা লাইভ-
পলিটিক্স’অলা কাঠিবাজি করে- এরে ওরে ডাকে ‘লর্ড ক্লাইভ’!
আপনি সাজিয়া শুদ্ধাবতার পরেরে ডাকেন ‘ভণ্ড’
টুইট্যারে লেখে কত ট্যারা কথা- বই হবে সাতখন্ড!

ঘরেতে আমার গিন্নি কহেন- ‘যাইতে না দিব বাজারে,
প্রয়োজনে মোরা অনাহারে মরি কোরোনায় যেন না মারে!’
অনেক ভাবিয়া রচিনু পদ্য, বেকারের আর কিবা কাজ,
রামনবমীর ছুটির কৃপাতে- শেয়ার বাজারও বন্ধ আজ!
নচেৎ, কপালে ছুটায়ে স্বেদ অবিরাম ডুবিত সওদা তরী
লক্ষ্মী আমাকে আগেই ত্যাজেছে, বুঝে গেছি জারিজুরি!
ভব সংসারে সকলেই চাহে- পদতলে ফেলো গর্দান,
ভক্ত যে তাহা স্বভাবেই করে, তাতেই তুষ্ট ভগবান!
মদীয় আকার অসুরপ্রকৃতি বিচারে বিচারে অনাচারী
আমি কি বা তবে ডুবিয়া মরিব, আসিবে না কোন কান্ডারী?

ডাক্তার বলে ‘আগে পথ্য গেলো হে, মধুমেহ কিসে সারিবে?
নিজেই নিজেরে এমনি মারিলে ভগবান কবে তারিবে?’
শরীরে আমার মধুস্রোতধারা মরমে জ্বলিছে বিষ,
ডাক্তার তুমি বুঝিবে না তাহা, নামটি যে ‘দেবাশিস’!
দেবের আশিসে- হয়েছ বৈদ্য, রোগী সারো তুমি ওষুধে,
আমি তো হয়েছি বৈশ্য এখন- ক’টা কড়ি আসে ক’সুদে-
এসব গণিয়া সংসার চলে বাকী সবে আগে দিয়া ছাই,
লক্ষ্মীর সাথে বীণাপাণি যান সরে, তিনিও বলেন ‘আমিও যাই’!

গরম এসেছে আগেকার মত, আমার এসি নাই, ছোট রুম-
রাত্রে লুটাই তিনটার দিকে, দশটায় ভাঙে ঘুম!
ভেতরে আগুন, বাইরে কোরোনা, ভাবিয়া আকুল কি করি,
অভাবে পড়িয়া সত্ত্ব জাগিছে মনে, চালে ডালে খাই খিচুড়ি!
যদিও বা সাথে ডিমটি ভেজেছি, ওতে হানি কতখানি হবে?
সকলই করেছি কৃষ্ণার্পিত- প্রভূ নিজগুনে বুঝে লবে!
এমন আকালে ভগবান যদি এতেও রুষ্ট হন,
তবে দেবনিধি দেবতার শুধু, অসুরের কেহ নন!
তাই আমার সাথে সে বিধাতা মশাই’র চিরকাল আছে দ্বন্দ্ব,
বোষ্টমজনে তাই কহে আমি অভাজন, স্বভাবে দারুণ মন্দ!

(গাত্রে আমার সর্বদা রহে রসুন পেয়াঁজ গন্ধ!)




বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

কোয়ারান্টাইন কীর্তন


চলো চলো বাপু ভাট বকি গিয়ে, কাজ কি বা আছে জগতে
শমন হয়েছে জারি, ঘরে বসে রও, নচেৎ পেয়াদায় দেবে প্যাঁদানি,
জারিজুরি যত কর, সে তো মানবে না কোন মতে।
(কাজ কি বা আছে জগতে...
প্রাণধন বল- কাজ কি বা আছে জগতে...
ওহে গুণমণি- কাজ কি বা আছে জগতে...)

খোল ফেসবুক পাতা, পড় আজগুবি কথা, গুজবে রহ হে ভোলা,
সুযোগ আসিলে করিও কমেন্ট, শেয়ার অপশন- আছে খোলা।
যবে অলস দিবস কাটে না অকাজে, তবে ফোনখানা খুলে বস হে,
কখন কিভাবে দিন পার হবে, টের পাবে না গো, পাবে না হে,
এসো এসো যত সরেস তামস, চলো ফেসবুকে যাই গুঁতোতে।।
(কাজ কি বা আছে জগতে...
ওহে বেচারাম- কাজ কি বা আছে জগতে...
বোকচন্দর বল- কাজ কি বা আছে জগতে...
ওহে আলসের ধাড়ি- কাজ কি বা আছে জগতে...)

টিপিয়া টিপিয়া অঙ্গুলি কর হে অঙ্গার,
ওহে অঙ্গুলিমালের বংশধরেরা জাগো সবে এই ক্ষণে
তোমাদের লাগি খা খা করে গোটা সংসার!
পোস্টা-পুস্টি জ্ঞান বিকিরণে আলোকে ভাসাও ধরণী,
দূরে করে দাও নয়নের ঘোর, তারে কানা করে দাও এখুনি,
তুলিয়ো না কানে গুরুগঞ্জনা, তাহারা কি পারে বুঝিতে?
(কাজ কি বা আছে জগতে...
হ্যাঁ রে ভজকেষ্টা- কাজ কি বা আছে জগতে...
ওহে ক্যাবলাকান্ত- বল কাজ কি বা আছে জগতে...)



সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২০

নিরদয় মাধব


নিরদয় মাধব রে,
এ ব্রজে তোমাহীনা একেলা প্রাণ ধরিব কেমনে?
যতেক মাণ দিছি ত্যাজে তোমা পায়,
কপট প্রণয়ে গ্যালা ভুলে;
তবে এই ছিল মনে?

এ পরাণ বাঁধি মূরলীর ডোরে,
যেমতি রাহু যায় দিনমণি গ্রাসে, তেমতি উঠিলা-
নন্দকুমার অক্রুর রথে, ক্রুর হাসি ভরে-
ব্রজের আকাশে, হানিয়া বিষবাণ,
অবলা হৃদয়পুরে, তুমি যাও-
তুমি যাও ত্বরা যশোদানন্দন,
ত্বরা যাও মথুরার পথে।

এ বিরহ কাতরা কালিন্দী সলিলে-
সঁপিব নিজেরে, ওহে কদম্ব তরু স্বাক্ষী রহিবি তুই
যদি সে রাসকুঞ্জ হয় পক্ষপাতী, যদি মিছে কথা বলে-
তবে মোর হয়ে স্বাক্ষ্য দিবি লুটায়ে ভূঁই,
এ শাওনে তুই -
আর না ফোটাবি ফুল!
ওহে যমুনার ঢেউ, তোরেও করিনু বাদী-
যদি মরি এ ব্যথায়, কভূ না ভাসাবি কূল;
মোরে কথা দে!
কথা দে মোরে!

নিরদয় মাধব রে,
যে বেদনা দিয়া যাও চলি, পথের ধুল জানে,
দামিনী না ঝরিবে অমন জলধার,
কমল নয়নে তাহা না হয় গোচর;
এখন যে রাখাল নহ, মথুরা-রাজকুমার,
বিদিত ব্রজভূমে!

মথুরা রাজকুমার-
তোমা কি টলাতে পারে গোপিনী নয়ন-নীর!
কংস মাতুল যার, বুঝি সে সামান্য প্রকৃতির-
হবে? হবে হয়ত মাতুলসম দানবের মন!
পরানবল্লভ রে, তবু তোরে চিন্তিয়া অনুক্ষণ
আপনা অঙ্গার করি কলঙ্কের তুষে।
এখন তুমি রাজা হলে বটে,
রাজার জানি শাস্তি নাহি  হয়,
এ যাতনা হৃদয়ে রব পুষে!

জানি শ্যাম,
নর তুমি, বুঝিবে না রমনীর জ্বালা,
এ জনমে যে জ্বলনে আমি পুড়ে মরি,
একদিন তাহে তুমি হইয়ো হাড়-কালা!





শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২০

কম্যুনিটি ট্রান্সমিশন


যদি মানুষের সাথে মানুষের প্রেম
একটা কম্যুনিটি ট্রান্সমিশন হয়ে যেত,
তবে হয়ত এমন করে আর ঘরে বসে থাকতে হত না,
একটি বোমা বানাতে কেটে গেছে একশ বছর,
একটি সঞ্জীবনী টীকার আজোও পেলাম না খোঁজ!

যদি পাখি ও তটিনীর কাছে আমরাও বাড়িয়ে দিতাম
আমৃত্যু বাঁচতে চাওয়ার উন্মুখ হাত, দিনে একবার রোজ-
তাহলেও হয়ত এই কপালে ভাঁজের কোনক্রমে মিলত সমাধান!
যদি শ্যামল মাঠের সাথে কিছুটা আদান-প্রদান-
আমাদের হত যাবতীয় মানবিক আবেগী কথার,
তাহলেও হয়ত আকাশের ফুসফুসে শ্বসনীয় প্রাণ-
রইত জেগে, আমাদেরই জন্য!

এখন আমরা অত্যন্ত বিচলিত।
আমরা দূরে সরে গেছি সেখান থেকে,
ঠিক সেখান থেকেই যেখানে থাকার কথা ছিল,
ছিল যেখানে  অপরিমিত-
আবাসন মানুষের সাথে ফুল ও মৌমাছির,
বিটপী, স্রোতস্বিনী, গিরিচূড়া, কপোত-নীড়-
আমরা তাদের থেকে কতটাই না দূরে সরে গেছি।


সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০২০

১৯-২০ এর মড়ক


হঠাৎ করে আমরা খুব অসহায় হয়ে গেলাম! আমরা ভাবিনি এমনও হতে পারে! আমরা ভাবিনি এই ২০২০ সালের কথিত সমৃদ্ধির মরসুমে আমাদের একটা প্রাগৈতিহাসিক মড়কের সামনে এসে দাঁড়াতে হবে! আমরা ভাবিনি আমরা ঘরে বসে ভাবব ঠিক কতদিনের খাবার আমরা আপাতত ঘরে সঞ্চয় করে রাখলাম আজ, কতদিন এ দিয়ে চলবে, কোন আসু দুর্ভিক্ষের হাতিছানি আমরা দেখছি কি না, বাজার তো একদিনের মধ্যেই কালোবাজারিদের খপ্পরে- রেশনকার্ড আছে তো আলমারির সুরক্ষিত স্থানে রাখা! বাইরে বেরুনো বারণ। সরকার বলছে, পুলিশ ধরবে আমাদের বাইরে বেরুলে। জরিমানা ও হাজতবাস দুটোই জুটতে পারে! আমরা কোন ভয়ংকর যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে পড়িনি! আমাদের বাতাসে আতংক ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাতাসে যমদূতেদের দেখা যাচ্ছে! তারা কখন যে কাকে যমপুরীতে নিয়ে যাচ্ছে তার কোন পূর্বানুমাণও সম্ভব নয়! হাজার তিনেক চীনা মরে গেল। আমরা অ-চীনারা ভাবলাম চীন দেশের ওই সব আমাদের অচেনাই হয়ত থেকে যাবে। কিন্তু তা হল কই? দেশে দেশে উড়ে গেল মড়ক! একটা একটা করে খাঁচা নড়েচড়ে ওঠে! এমন চৈনিক উদ্ভাবনী শক্তির সামনে নানান অ-চীন নগরের ‘খাঁচার ভেতর অচীন পাখি’র দল বেশীক্ষণ টিকতেই পারছে না! ইউরোপ ছারখারে যাচ্ছে! আমেরিকা যাচ্ছে জ্বলে। আমরা সারা ভারতে বসে ভাবছি এখন- আমাদের কপালে কি দেখা বাকী! আমরা কি মহাকালের এক বিরাট লোকক্ষয়ী করাল বিবরের ভেতর ঢুকে যাচ্ছি, আমরা কি সকলেই স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছি, নাকি আমরা সব্বাই স্তব্ধ হব  না, আমাদের কেউ কেউ রয়ে যাবে স্বাক্ষী হয়ে? এসব কথার আপাতত কোন উত্তর নেই! দুশ্চিন্তা রোধের কোন ভ্যাক্সিন আসেনি! ভ্যাক্সিন আসেনি মড়ক থামানোর! আমরা জানি না আমাদের মধ্যে কাকে কখন চলে যেতে হবে! না মরলেও অন্তত কোরান্টাইনে! [কোরান্টাইন দীঘার কোন হোটেলের নাম নয়!]

সব্বাইকে ছুটি দেয়া হল! বলা হল ঘরে থাকুন- সব্বাই ভাবল এ এক অন্যরকমের ছুটি! দীঘা-ফিগায় দলে দলে মরতে চলে গেল! একদিন ‘জনতা কার্ফিউ’ হেঁকে দিলেন ঊজির-এ-আলম, ছোকরার দল ভাবল এ-ও তো মজা, ফাঁকা রাস্তায় ব্যাটম্বল চলল কিছুক্ষণ! লোককে আর বোঝানো যাচ্ছে না! বোঝানো কি চাট্টিখানি কথা দাদা? এখন ২০২০ সাল! আমরা তো বছর বিশেক পরপর মন্বন্তর দেখে বড় হইনি! আমরা তো এটা বুঝতেই পারছি না যে বার্ড-ফ্লুতে যেমন শয়ে শয়ে হাঁস-মুরগী মরে, তেমনি আগের দিনের পেটের ব্যামোতেও গ্রাম-কে-গ্রাম মানুষ উজার হয়ে যেত! সভ্যতার দারুন উন্নতির সাথে সাথে আমাদের এই একটা বিশেষ অবনতি হয়েছে যে- আমরা নানান প্রয়োজনীয় দৃষ্টান্তের অভাব বোধ করছি আজকের দিনে, আমরা শিক্ষাহীন হয়ে গেছি! এসব এপিডেমিক কি প্যান্ডেমিক, অতিমারী কি মহামারী- এসব নিয়ে আমাদের কোন ভ্যাবাচ্যাকা খাবার আর জোগাড় নেই! বিদেশ থেকে প্যান্ডেমিক বইয়ে এনে দিব্যি নিজের পাড়া-মহল্লা, ময়রার দোকান, বাসে-ট্রেনে সব চষে বেড়াতে ক্ষতি কি? তারপর রোগশয্যায়! পাশে কেউ নেই! যাদের থাকার কথা তারা আর কোন রোগশয্যায় দিন কাটাচ্ছেন! সুশুষ্রাকারীটিও অনিরাপদ! এস্থেটোস্কপভূষিত কবিরাজের দল বিপদাপন্ন! কারো সুরক্ষার নিশ্চয়তা আমাদের হাতে রইল না! আমরা এমন একটা মড়কের মুখে দাঁড়িয়ে আছি! এখন আমরা চাইছি একটা যুদ্ধকালীন কার্ফিউ অন্তত!

লোক মরছে- এতেই কত লোকের আনন্দ ধরে না আর! ভুয়ো খবর দিনে দু’চার বার রটাতে না পারলে কারো কারো রাতের ঘুমে ব্যাঘাত হয়ে যাচ্ছে! মানুষও মাইরি! ভূয়ো খবরে আজকাল আমাদের যত দ্রুত বিশ্বাস জন্মে, সত্যিটা চোখের সামনে তুলে ধরলেও অত সহজে তা সত্যি বলে মানতে মন চায় না! এব্বাবা, ফেসবুকে দিয়েছে, মিথ্যে হবার জো নেই! ফেসবুক একাউন্ট তো সব যুধিষ্ঠিরেরা খুলে বসে আছেন- তাই কেউ মিথ্যে কইবে না! যে যা পারছে লিখে দিচ্ছে, গুজবের সীমাসীমান্ত নেই- গুজবের নিচে- ‘হু’ লেখা আবার! বলিহারি- বিশ্বাস না করলে বিশ্বাসঘাতকতার দন্ড পাব না! কি কি যে আরো বিশ্বাস করতে হতে পারে জানি না! গোমূত্রপান থেকে হুজুরের ফু, থানকুনি পাতার রস, রসুনের কোঁয়া জাতীয় নানান অব্যর্থ সঞ্জীবনী দাওয়াইয়ের প্রতিবিধান আসছে! ঘোড়ার ডিম হচ্ছে এসব খেয়ে! হুজুরেরা গলা ফাটিয়ে বলছেন- কেয়ামতের আলামত, এঁরা বলছেন- ভগবানের লীলা, প্রকৃতিবাদীরা বলছেন – প্রকৃতির প্রতিশোধ, কতশত ব্যাখ্যা, আমাদের মন তো গলছে না। ব্যখ্যা যেমন হোক, হাইপোথিসিস যেমন পাকা-ই হোক, বাঁচাটা তো জরুরী! আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না, আমাদের মধ্যে কে কে বাঁচবে এসব কথা মনে রাখার জন্য!

আমরা একটা মড়কের সামনে জড়ো হয়েছি! এটা কোন ইয়ার্কির কথা নয়! আমাদের লাশের স্তুপ দেখার অভিজ্ঞতা নেই! আমরা কোন বিশ্বযুদ্ধ দেখিনি! আমরা কোন জম্বি-সিনেমার জীবন্ত চিত্রায়ণ দেখিনি! আমরা এলিয়েন আর মানুষের সঙ্ঘাত নিয়ে অনেক কল্পকাহিনী ভেবে থাকতে পারি- আমাদের ভাবনার বহর যা-ই ছিল না কেন, আমাদের সামনে নিশ্চিতভাবে তেমন ভয়াবহ কিছু একটা এসে গেছে, এখন যখন আমাদের কাজ করার সময়, তখন আমরা কতটা অকর্মণ্য হচ্ছি, বা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কতটা অসহায় হচ্ছি তা একটু ভেবে দেখলেই আমাদের মঙ্গল! এই দেশটার কোটি কোটি লোক কোন মড়কে বেঘোরে মরে যেতে পারে, রোগে না হলেও একটা মারত্মকভাবে কোমরভাঙা অর্থনীতির ব্যারাম আমাদের মারতে উদ্যত এখন- আমাদের বোধোদয় নেই! যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বালাই নেই তাদের প্রসঙ্গ না-ই বা তুললাম, যাদেরকে আমরা তথাকথিতভাবে শিক্ষিত বলে মেনে নিই, তাদের আচরণেও বিরাট ফারাক কিছু আমরা সর্বক্ষেত্রে দেখি না! দেখাটা প্রয়োজন! খুব প্রয়োজন ছিল! আর ক’দিন এভাবে চললে আমরা খাব কি? আর কিছুদিন এমন করে শেয়ার বাজারে ধ্বস নামলে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো? ২০ টাকার মাস্ক ২০০ টাকা দামে বেচেছে গায়ে লাগেনি দাদা, ২০ টাকার চাল ২০০ টাকায় উঠে গেলে সইতে পারেবেন?

শুধু আমাদের একটা পাড়া, গ্রাম, শহরের কথা বলছি না; অবস্থাটা গোটা মানব সভ্যতার সামনে এসে গেছে! রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জাম নেই, পথ্য নেই, নিরাময় নেই, হাসপাতালে ঠাঁই নেই, রোগী ভর্তি হলে ভাবতে হচ্ছে কোনটাকে মারব আর কোনটাকে বাঁচাব, জীবন সবার জন্য যেন অপরিহার্য্য নয়, খাবারের দোকানপাট শুণ্য, রেশন সমাপ্তির দিকে, নগরের পর নগর স্তব্ধ করে দেয়া হচ্ছে, মানুষ ঘরবন্দী, বাতাসে যমদূতের চলাফেরা- কখন চুলের মুঠি ধরে ওপরে টান দেবে কেউ জানে না, আমরা খুবই অনিরাপদ! আমাদের সামনে আপাতত কোন আলো নেই! আমরা এই মূহুর্তে যা করতে পারি তা হল- আপন ঘরটিকে দূর্গ বানিয়ে তাতে বসে থাকা! কেমন কাপুরুষোচিত কথা শোনালেও আমাদের এই মড়কের যুদ্ধের বিজয়ের কৌশল সম্ভবত এই একটাই!



শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

ভাষাদিবসের ভাষা : কারো কারো আক্ষেপ

ভাষা নিয়ে আলোচনা জটিল ব্যাপার! ভাষা নিয়ে কোন ভাসাভাসা তাত্ত্বিকতা বিশেষ আবেগের ব্যাপার হয় না সাধারণের কাছে। আমার ভাষা কি, আমি কেন এ ভাষায় কথা বলি— এটা নিয়ে কোন ভীষণ প্রশ্ন যেমন আম-জনতার মনে জাগে না, তেমনি জাগে না কোন মারাত্মক সংবেদনশীল অনুভব! যদিও ভাষা ধর্মের মত সংজ্ঞাহীন ব্যাপার নয়, অর্থনৈতিক অবস্থার মত প্রবল অনুভূতি নয়, রাজনীতির মত শিহরণ জাগানো কিছুও নয়— তবুও মানবের সমাজে এটাই সবচেয়ে শক্তিসম্পন্ন উপকরণ! এটার সাথে আমরা একাঙ্গীভূত! যেমন আমাদের কখনো কেন মনে হয় না যে আমাদের সবার ভেতর একটা মেরুদন্ড আছে— তেমন আমাদের মনেই হয় না আমাদের একটা ভাষাও আবশ্যক অথবা অনাবশ্যক ভাবে আছে— এটা একান্ত আমাদের আত্মিক, আমাদের নিজেদের ভেতরে গাঁথা— আলাদা নয় বলেই তা নিয়ে আলাদা করে চিন্তা আমরা করিই না! কোমরে ঘা লাগলে যেমন ডাক্তারের কাছে যাব— তেমনি ভাষায় ঘা লাগলে আর কোথাও হয়ত যাব— তবে ঘা কি কামারের ঘা নাকি ফুলের, তা বুঝতে সময় লেগে যাচ্ছে!

এবং আম আদমির পক্ষে এই ‘ঘা’ এর মর্ম বোঝা একেবারেই দুষ্কর! ভাষার কোথায় গুষ্টি উদ্ধার হচ্ছে এ নিয়ে তার কোন মাতামাতি নেই! জনাকয়েক আমাদের মত লোক যাদের খেয়ে কাজ নেই, যাদের কিনা স্বকথিত অর্থে নন্দন-রুচি আছে, যারা ভাষাটাকে নানান সাহিত্যরসে চটকে থাকেন— তারা এ নিয়ে বেশ ভাবিত, দুঃখজনক রকমের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত!

আমার ওসব নেই! আমি সস্তা কথায় এতটুকু বুঝি যে— পদার্থবিদ্যার নানান সত্য অপদার্থ সমাজে নিয়তই ফলে! সমাজের রীতি আপেক্ষিক, কালের মত সমাজও একটা এবস্ট্রাক্ট মিথ, পদার্থের মত সমাজেরও অবস্থান্তর ঘটবে, শক্তি বিনষ্ট না হয়ে অন্য আরেকটা রূপ পরিগ্রহ করবেই— ভাল কি মন্দ সে সবাই নিজের নিজের মত বলবে আর কি! এরকম জটিলতাপূর্ণ ব্যবস্থায় কোন প্রাক-নির্ধারিত আইন কিম্বা ভাবাবেগ চিরস্থায়ী হয় না। বিশেষত মানুষের যেখানে সময়ই নেই এসব নিয়ে ভাবার। এই যুগে মানুষ যেখানে নিজের মধ্যে নিজেকেই খুঁজে পায় না, সেখানে স্ব-সংস্কৃতি জাতীয় মূল্যবোধের কথাবার্তাই বাতুলতা! কার খেয়েদেয়ে এত কাজ যে এসব কচকচানিতে ডুবে মরবে?

মানুষ হই আর যা— আমরা তো পশুই! এ কথা যে মানে না তার সাথে আমার আড়ি! মানব নির্মিত নীতিমালা দিয়ে আমাদের যতই অন্য পশুদের চেয়ে ভিন্ন বলা হোক না কেন— বৈজ্ঞানিক ভাবে এসব স্রেফ বাখোয়াজ! অন্যদের মত আমরাও আমৃত্যু ইন্দ্রিয়সুখচরিতার্থ করার প্রয়াসে ব্যস্ত! কিছু মানুষের ইন্টেলিজেন্স ইন্টেলেকচুয়ালিটির ফাঁদে পড়ে বলে এরা আলাদা! এই আলাদাগুলো হাতে গোনা হয়! Often we set them as some incredible examples of human achievements before multitude, কিন্তু এসবও কেবল অনুপ্রেরণার কথা মাত্র! সাধারণের জগতটা আলাদাই থাকে! লক্ষ ছেলে বিজ্ঞান পড়ে আইনস্টাইন হবে বলে নয়, হয়ত দেখা গেল তার ভবিষ্যত লক্ষ্য একজন ডাক্তার হওয়া, নিজেকে তথাকথিত ভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা। এটা অন্তত ৯৮% লোকের ভাবনা হয়ত! এরকম একটা এম্বিশন অভিমুখী সমাজে, কিম্বা একেবারেই এম্বিশনহীন তামস সমাজে উঁচু উঁচু নীতিবাক্য অসার না একদম?

আমাদের পাশব সত্বার সাথে লড়ে লড়ে গোটা সমাজ ভরিয়ে ফেলেছি আমরা দ্বিচারিতায়, Survival of the fittest - আমরা এই নিয়ে বাঁচি মূলত, যার ইচ্ছে সে অস্বীকার করুক— ভাষা অথবা দেশপ্রেম জাতীয় নিতান্ত এবস্ট্রাক্ট মিথ নিয়ে আমাদের কখনো নির্দিষ্ট ইভেন্ট ধরে ভাবাবেগ নামাতে হয়, দৈনন্দিন জীবনে এসব কথা রোজ কচলানো হয় না। এর আরেকটা কারণ হল সমাজের ধারাটা পাল্টে গেছে! রবীন্দ্রনাথের ‘চাঁদ উঠেছিল গগনে’র চাইতে রোদ্দুর রায়ের ‘বাঁড়া চাঁদ উঠেছিল গগনে’ আরো বেশী rejuvenated লাগছে না? কেন বলুন তো?

তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ হারিয়ে যাচ্ছেন? না! সমাজে চিরকাল লো-ইন্টেলেক্টের চাহিদা বেশী ছিল কিন্তু চাহিদানুযায়ী জোগান ছিল না! আজকে তা হচ্ছে বলে শোরগোল মনে হচ্ছে খুব! এই সমাজে যতই বৈরাগ্যশতকম লেখা হোক না কেন এখানে চিরকাল কামসূত্রই জয়ী! মুখচোরারা আগে মুখ লুকাতো, এখন তারা সবাই দাঁত কেলিয়ে সামনে আসছে! এমনটা হবার কথাই ছিল! ছিল না?

এ সমাজে তাই ভাষা-টাষা নিয়ে কৌলীন্য বৃথা। এ নিয়ে কাউকে অহেতুক প্রতিপক্ষও বানাতে নেই! নিজের পক্ষ নিয়ে নিজে উড়ি চলুন! ফুল ফোটাতে পারলে সুবাস আপনি ছড়াবে! সে সুবাসে কেবল মধুপের দলই আসবে! গুবরে পোকারাও আসবে— এমন ভাবাটাই তো বোকামি মশাই!

তীরে ফেরা

  অনন্ত দিনরাত্রির কত স্রোতভঙ্গ কলরোলে আমি ভাসিয়ে ভেলা অবেলা ওপারে যাব বলে হাল ধরে ঠাঁই জেগে আছি নির্নিমিখ। কত ঝড়ের ঝাপটা এসে, দিল দোলা ক...