সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

লাইট-মিউজিক

 

অনেকে কিছু গানকে ‘Light-Music’! Anything apart from Classical Music is ‘Light Music’! এই সংজ্ঞাটিকে ইংরেজীতে প্রশস্তি করলে বলা যেতে পারে ‘Bullshit’! এর চেয়ে ভদ্রস্থ কিছু আসছে না! প্রত্যেক Genre এর গানের একটা নির্দিষ্ট বিশেষত্ব ও আলাদা সাধনার পদ্ধতি আছে! বিশুদ্ধ মার্গসঙ্গীত গাইতে শুদ্ধ বৈয়াকরণিক হতে হচ্ছে, সাথে ভাবের মাহাত্ম্যটিকেও অক্ষুন্ন রাখতে হয়- দুদিক রক্ষা কষ্টকর বটেই! কিন্তু ঠুমরীর আবেগ, ঠুমরীতে স্বজ্ঞানে কয়েকটা এদিক-ওদিক স্বরের মিশ্রণের যাদু দেখানো খুব light-weighted কাজ নাকি? ধরুন গজলের কথা, পূজনীয় ভীমসেন যোশী যদি ওস্তাদ মেহেদি হাসানের গজল গাইবার চেষ্টা করতেন সেটা কেমনতর শোনাত? And the vice-versa! একজন বাউলকে সঙ্গীত-সিদ্ধ হতে গেলে ৩০ বছর ব্যাকরণ শিখতে হয়? হয় না তো! সঙ্গীতের ছোট-বড় জাত কি আবার? সঙ্গীত আদ্যোপান্ত ভাবের বিষয়- এটা এর প্রথম শর্ত, দ্বিতীয় শর্ত- একে আত্মস্থ করা স্ব-বশে রাখার জন্য সাধনা চাই! সব রকম গানের বেলায় খাটে! ৫০ বছর খেয়াল গাইলে, ২০০ রাগ রাগিনী কণ্ঠস্থ করে ফেললেও কারো একটি প্রাণস্পর্শী শ্যামাসঙ্গীত গাইবার যোগ্যতা জন্মে যাবে না! তাতে সুরের সাথে সাথে ভাব ও বাণীর সাধনাও লাগে! এ বড় বাজ্ঞেয়কারী কাজ! তেমনি লালন গাওয়াও যেন আজকাল পান্তাভাত?

 

মার্গসঙ্গীতে ব্যাকরণের শুদ্ধতা প্রয়োজন, ব্যাকরণ দেখানোর জন্য নয়, ব্যাকরণ-সর্বস্ব হবার জন্য নয়; ব্যাকরণের ভেতর দিয়েই রাগের ছবিটিকে ভাবরঞ্জিত করে ফোটানোর জন্য! আজকাল যারা ভাব-ব্যঞ্জনা বাদ দিয়ে কেবল ব্যাকরণের অলঙ্কারটির উপস্থাপনটিকেই শাস্ত্রীয়-সঙ্গীত বলে জাহির করে বেড়াতে সদা তৎপর, যারা রাগের ভাব-শরীরটি বাদ দিয়ে ব্যাকরণ-কঙ্কালটিই কেবল আরাধ্য করেন- তাদের মনে হচ্ছে বাকী সব গান ‘Light-Music’! দুর্ভাগ্য-বশতঃ আর্য্যাবর্তের সঙ্গীতের বিবর্তনের রূপরেখা এদের কাছে স্বচ্ছ নয়! (বস্তুত সঙ্গীতের concept-টাই অপক্ক দেখায়!) কত লোকজ-সঙ্গীতের স্বরের-কাঠামোটি কালে কালে শুদ্ধ রাগ-রাগিনী হয়ে উঠে এল তারা দেখেন না তা! মনে প্রশ্নও জাগে না- ‘ব্যাকরণ আগে এলো, নাকি সঙ্গীত?’

 

সঙ্গীতটিই যদি আদি হয়, তবে সকল সঙ্গীতের ভেতর ব্যকরণ খোঁজাটা তো মূর্খতা! সকল সঙ্গীত তো ব্যাকরণের আলোতে বিচার্য্য হবে না!

 

 

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

শিল্প ও স্বাধীনতা

 

স্বাধীনতা মানে উচ্ছৃঙ্খলতা নয়, তেমনি শৃঙ্খলা মানেও পায়ের শৃঙ্খল নয়। যথেচ্ছাচার যেমন কোন আচার নয়, তেমনি আচারে হস্ত-পদ বদ্ধ করে রাখাও সম্ভাব্য অনাচার আনয়নের ঔপচারিকতা মাত্র! বিরিয়ানিকে বিরিয়ানির স্বাদটা বাঁচিয়ে রেখে নিজের কায়দায় রাঁধলে সেটা স্বাধীনতা ও শৃঙ্খলা দুটোই রক্ষা করে, কিন্তু বিরিয়ানি রাঁধতে গিয়ে ওটাকে প্রায়-খিচুড়ি বানিয়ে ফেললে- তাকে স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে চালিয়ে দেয়া তাত্ব্বিকভাবে অন্তত সম্ভব নয়। তেমনি বিরিয়ানি যদি কেবল ভাতের তলায় মাংস বিছিয়ে দেবার রন্ধন কায়দা হয় তাহলে তা দিয়ে রাঁধুনীর মুখ-রক্ষার কাজও ঠিকমত রক্ষা হয় না! বক্তব্যের উদ্দেশ্য হল- বিরিয়ানিকে নিয়ে যত গবেষণাই হোক- পাতে তুললে, মুখে পুরলে যেন মনে হয়- হ্যাঁ এটাই বিরিয়ানি- হায়দ্রাবাদী হোক, কি করাচীর, কি কোলকেতার- দিস ইস ইট! এটা বোঝানো।

 

আমাদের কেবল জানতে হবে মসলাটি কি? মসলাই তো আসল জিনিস দাদা!

 

ধরুন রবি ঠাকুরের গান গাইছেন, স্বরলিপির এক মিলিমিটার এদিক ওদিক হয়ে গেলেই নরকে পতিত হবার ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে গাইতে হচ্ছে! ধরুন বিরিয়ানির ভাত সেদ্ধ হচ্ছে ঠিকটাক, মাংস সেদ্ধ হল ঠিকঠাক, সব হচ্ছে, মসলাটা ঠিক হচ্ছে না শুধু, সুগন্ধ আসছে না - এই মসলাটি হল ভাব! ভাব ব্যতিরেকে সঙ্গীত- কোন সঙ্গীতই তো নয়! আবার ধরুন সুগন্ধ হচ্ছে না দেখে বিরিয়ানির ওপর ম্যাগি-মসলা ছিটিয়ে দেয়াও তো ভাল বুদ্ধি নয়! রবীন্দ্রনাথের গানে রবীন্দ্রভাবনার নিজস্ব মসলা আছে। তাতে গজল-ঠুংরী-পপ-ব্লু’সের মসলা ছিটাতে হয় না! আবার রামপ্রসাদী গাইতে গিয়ে ওটা রবীন্দ্রসঙ্গীত বানিয়ে দিলেও বদখত লাগে! প্রতিটি সঙ্গীতের ক্ষেত্রে এরকম একটা পরিমিত, মার্জিত তথা ভাবের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন লালিত্যপূর্ণ বোধ জাগিয়ে রাখা উচিত। নইলে গাইলেই হয়ত গান হবে- কিন্তু তাতে প্রাণ থাকবে না! মসলা ছাড়াও হয়ত দেখতে বিরিয়ানি হয়ে যাবে কিছু একটা, খেতে গেলে অমন মনে হবে না!

 

আমরা সবাই গাইতেই পারি। গাইবার স্বাধীনতা আমার আছে। গাইতে গেলেই আমাকে আগেই একজন সঙ্গীত-তত্ত্ব-বিশারদ হয়ে উঠতে হবে কেন? গান মানব-মনের একটা আদিম, অতি স্বচ্ছ্‌ল, সাবলীল অভিব্যক্তি। একটা গান গাইবার অধিকার শ্রীকান্ত আচার্য্যের যেমন আছে, একজন রিকশাচালকেরও ততটুকু আছে। এই অধিকারের প্রসঙ্গে আলোচনা কিন্তু করছি না। তাত্ত্বিক স্তরের আলোচনা যে সকলের জন্য নয় এই কথাটা বোঝার জন্য আরেকটি তত্ত্ব-বিশ্লেষণের দরকার হবে না আশা করি। ক্ষিদে পেলে খাই আমরা, খাবারের অধিকারী হবার জন্য রান্না জানা জরুরী? এটা কোন যুক্তি?

 

এক গাদা রাগ-রাগিনী শুদ্ধভাবে না জানলে গাইবার উপযুক্ত হলাম না! অমুক বাবুর গানের বইয়ের স্বরলিপির পান থেকে একটু চুন খসাচ্ছি বলে আমি জাতিচ্যুত হয়ে যাচ্ছি! অমুক খেয়াল গাইতে গিয়ে ওটা টপ্পা হয়ে গেল! ধ্রূপদ গাইছেন মনে হচ্ছে আগ্রার খেয়াল! হেন তেন শতপ্রকারেণ- বাতচিত বিতণ্ডার একটা মানসম্মত সমাধান খুঁজতে গেলে সঙ্গীতের গভীরতা, রসবোধ, সাধনের প্রণালী প্রভৃতি নিয়ে বিস্তৃত অধ্যয়ণ প্রয়োজন। নইলে ‘অন্ধের হস্তিদর্শন’ জাতীয় যত্তসব কাণ্ড হতেই থাকবে আর তা নিয়ে চলবে ঠোকাঠুকি অনন্তকাল। সর্বসাধারণের জন্য এইসব শিক্ষা স্ববিস্তারে প্রয়োজন তা নয়- কিন্তু তাঁদের মধ্যেও উচ্চতম আদর্শটি অন্তত প্রসারিত হওয়া উচিত। সকল লোকে সাধু হয় না, কিন্তু সাধুর চরণধুলি তো নিতে যায় প্রায় সকলে! আমরা যে আদর্শই মানি না কেন, অন্তত মহত্তম আদর্শটি যেন যোগ্য সম্মান লাভ করে তার জন্য সেই আদর্শের পরিচিতিও তো চাই!

 

আমার কথার সারমর্ম হল-

 

আমি স্বাধীনতার বিপক্ষে নই। মানুষ স্বভাবে স্বাধীনতাপ্রিয়, জীবনের অন্যতম লক্ষণ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, কিন্তু ‘স্বাধীনতা’ কেবল একটা শব্দ মাত্র নয়! দানবের কাছে স্বাধীনতা উন্মত্ততা! আত্মনিয়ন্ত্রনহীনতা কখনো শুভ-অর্থে স্বাধীনতা নয়। শিল্প প্রসঙ্গে বরাবরই এই কথা উঠে এসেছে যে -শিল্পী স্বাধীনতা সৃষ্টি করেন। এটা তো সত্যি বটেই। তার আগেই বুঝতে হবে আমি আদৌ শিল্পী-পদবাচ্য কি না! অপরের শিল্পের ওপর হাত চালানোর মেধাকে শিল্প বলে এমন কথা আমার জানা নেই।

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

পৃথিবী ডুবে যায়

 

বলার মত এতটুকু শান্তি নেই চরাচরে আমার,

দূরদূরান্তপানে অনিমিখ আঁখি খুলে, অহর্নিশ দুর্নিবার-

পন্নগের বিষ ধমনী শিরায় ধরে, পথ ঘাট খেয়াবাট ভুলে,

আমি কোটি কোটি আলোকবর্ষ এই অন্ধকারে! এই অন্ধকার,

এমন পূর্ণতামসগ্রাস, আমার অস্তিত্বের সংজ্ঞা গিলে খায়,

একটি ভ্রমাত্মক স্বপ্নের মত, সূর্য্য ডোবে না আর, পৃথিবী ডুবে যায়!

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

পক্ষীর জীবন দর্শন

যদিও বা তার ভেঙে যায় খাঁচা, আকাশে উড়েছে ডানা,
অক্ষয় পথ, অবারিত দিনরাত্রি, বিহগনয়নে বিধুর সুরের হানা,
কেঁপে কেঁপে ওঠে, তারে তারে বাজে, তর তর নামে ধারা,
ঝাপসা কেমন- ঝর ঝর ঝরে, সরে যায় গ্রহ তারা,
দিগ্বলয়ের লয় ধীর হলে, লাখ রাগ কোটি রাগিনী
অতলান্তরে ঝঞ্ঝার বেগে হরদম, ক্রন্দসী, হতভাগিনী-
কোন দূরাশার হাতে হাত রেখে, তানে তান গেঁথে গড়া মালা,
গলায় তুলেও মেটে না মোটেও, মোটেও মেটে না জ্বালা


তাই 


এক আকাশ ছেড়ে অপর আকাশে,

বদলে বদলে খাঁচা,
ভেবেছ পক্ষী এই তো জীবন
এরই নাম যেন বাঁচা!

শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২০

সম্প্রসারণ ও শিক্ষা

একটি তত্ত্ব, কি একটি মতবাদ, কি একটি শিল্পভাব যতই উচ্চ হোক, যতই নিগুঢ় হোক- যখন আমরা চাই এটি সর্বজনীন হোক, যখন আমরা চাই এটি সবার মধ্যে বিকশিত হোক- তখন আমরা যেন এটা মেনে নিতে উদার থাকি যে- সর্বসাধারণে সম্প্রসারণ মাত্রেই সংমিশ্রণের দ্বার অবারিত করা। আজ যে গানটি আমি গাইলাম- আমি যদি চাই এই গান গোটা পাড়া গাইবে- তবে আমার বোঝা উচিত গোটা পাড়া আমার কণ্ঠের অনুকরণ করে গাইবে না, কারো নিজস্বতা আসবে, কারো অক্ষমতার দরুন তাতে বিকৃতি ঘটবে, কেউ ইচ্ছে করেই হয়ত বিকৃত করবে- ইত্যাদি ইত্যাদি ব্যাপার তাতে অবধারিত। তবে কোনটি রূপান্তর আর কোনটি রূপের আত্যন্তিক বিপর্যয় এটা কে ঠিক করে দেবে এ নিয়েই দ্বন্দ্ব চলছে!


একদল আদিবাসীকে দেখেছিলাম খোল-করতাল নিয়ে যীশুর নামগান করতে। ধর্মান্তরিত হবার আগে তাঁদের পূর্বপুরুষ খোল-করতাল নিয়ে কৃষ্ণনাম গাইত। যীশুর ধর্ম এসে কৃষ্ণের নামটি তুলে নিলেও খোল-করতালটি তুলে নিতে পারেনি। যারা যীশুর নাম প্রচারে নেমেছিলেন- তাঁদের এটা মানতেই হবে যে যীশুর নামটার প্রচারই উদ্দেশ্য, খোল-করতাল দূরীকরণ নয়। যারা তত্ত্ব সম্প্রসারণের সাথে সাথে প্রাগ-ভাবটিও বিনষ্ট করতে চাইবেন, তাঁদের পথে শতেক বাধা। এখানে অবশ্য এ কথারও স্পষ্টীকরণ দরকার- প্রাগ-ভাবটি সর্বৈব অর্থে সঠিক ছিল কি? যে মসুর ডাল রান্না জানে, তাকে বিউলির ডাল রান্না করতে গেলে কি মসুর ডাল রান্না ভুলে যেতে হবে?

আবার একটা সাধারণ বিপরীত যুক্তি দিই। যেমন গান শেখাতে গিয়ে দেখেছি ছাত্র হারমোনিয়াম না টিপলে নিজের ‘সা’টিও গাইতে পারে না! আমি বলি ‘বাছা এ তো আমাদের দেশী যন্ত্র নয়, যখন হারমোনিয়াম ছিল না, তখন লোকে গান কি করে করত? তারা সরগম কি করত না?’ প্রশ্ন শুনে ছাত্র মাথা চুলকায়। তবে এতকাল কি করে এলাম? একটা যন্ত্র আমার কন্ঠ পরিচালনা করছে, অথচ উচিত ছিল আমিই যন্ত্রটিকে আমার আজ্ঞাধীন করব! তা-তো হল না। এই হল উদাহরণস্বরূপ আমার ছাত্রের প্রাগভাব। এখন তাকে শুদ্ধরূপে স্বরগ্রাম শিক্ষা দিতে গেলে আমাকে প্রথমেই এই ধারণা সৃষ্টি করে দিতে হচ্ছে যে – তোমার পূর্ব প্রক্রিয়াটি একটি প্রমাদ! তখন সকলের পক্ষে একটি নবারম্ভ দুষ্কর হয়ে ওঠে। এবং প্রত্যেকে এরকম আরম্ভের পক্ষেও নেই। অর্থাৎ যে মসুর ডালটিও ভুল-ভাল রাঁধে, তাকে বিউলির ডাল রাঁধতে দেয়ার আগে, মসুর ডালটি ঠিকঠাক শেখালে তো ভাল! মন্দ কি? কিন্তু ভুলটিতেই যখন আমরা এতটা অভ্যস্ত, এতটা আশ্বস্ত- তখন নতুন করে আরেকটি ‘শুদ্ধ’ হাজির করলে সেটাই বরং বিরক্তিকর লাগে!

অতএব আমরা চেয়েছি, সকলে সু-শিক্ষার্থী না হলেও সঙ্গীতের উচ্চরূপ সকলের কাছে পৌঁছাক। তারপর অধিকারীভেদে যে যেমন পারবে সে তেমন প্রচেষ্টায় কিছু শিখবে। অনেকে শিক্ষার মাধ্যমটিকে সহজতর করার জন্য নতুন নতুন রূপরেখা আবিষ্কার করতে কৃতসংকল্প হয়েছেন। কিন্তু সহজে লভ্য হলেই অনেক জিনিসের গুণমানে লঘুত্ব যে আসে- এ কথা প্রকাশ্যে ক’জনে স্বীকার করে? সর্বজনমধ্যে সম্প্রসারণের বড় সংকটটি এই যে- গুরুতত্ত্বও ক্রমে লঘুতত্ত্ব হয়ে আসে, এবং সেই লঘুত্ত্বের গুরুভাব দর্শানোর জন্য তারপর আর কয়েকটি নতুন তত্ত্বের আবির্ভাব ঘটিয়ে একটি হজবরল বিষয় বানিয়ে নিতে হয়। সঙ্গীতকে কেবল একটি রূপক হিসেবেই ধরে দেখুন। সঙ্গীতের জায়গায় সাহিত্য, রাজনীতি, ধর্ম এসবও বসান- দেখবেন সব এক তরীতেই উঠে গেছে ডুববে বলে।

কেউ বিরিয়ানি রান্নার চেষ্টা করে দেখল, তারপর ওটা খিচুড়িতুল্য কিছু হল- এবার একে একটা আলাদা নামকরণ করে লোকের পাতে ও জাতে তোলার দায় পাচকের, এবং স্বাধীনতা ও সর্বজনীনতার দোহাই দিয়ে এ কার্য্যও সম্ভবপর হচ্ছে। যারা শিল্প ও মতবাদের স্বাধীনতা ও সর্বজনীনতা কামনা করেন- তাদের সিংহভাগকে দেখেছি- নিজের অপারগতাটিকে বৈধতা দেবার প্রয়াস করে যাচ্ছেন। যখন আমার আদর্শটি উচ্চ, অথচ আমি তাতে পৌঁছুতে পারছি না, অতএব একে টেনে হেঁচড়ে নিচে নামিয়ে এই দাবী করা- একটি নতুন আদর্শ আমরা তৈরি করলাম। নবকলেবরের নব নাম দেয়া যেতেই পারে, তবে অজ্ঞ পাচক খিচুড়ি রেঁধে বিরিয়ানি বলে খাওয়াতে গেলে সে খাবার সবার মুখে হয়ত রোচবে না! কিন্তু তাও লোকে খাবে। লোকের খাদ্য আগে চাই, বিশ্লেষণে কিছু যায় আসে না। আপামর জনগণ গান শুনবে- গানের ব্যকরণ জানা তাদের কাজ নয়! কিন্তু তারাই ভাল-মন্দের নির্ণায়ক হয়ে যদি ওঠেন?

সুন্দর মাত্রেই সর্বজনীন, সুন্দরের চর্চার অধিকার সকলের আছে- এই কথাতে আমার কোন আপত্তিই নেই, কিন্তু অধিকার থাকলেই সকলে চর্চার ‘অধিকারী’ হন না। ‘অধিকারী’ হবারও একটি সাধন-প্রণালী আছে। অনধিকারীর হাতে উত্তম কিছু গেলেও অবশেষে ‘শিব গড়তে বানর গড়া’র মতন কিছু হয়ে যায়। এতে অনধিকারীকে আমি দোষ দিচ্ছি না, তার শিল্পচেতনাকেও দিচ্ছি না, তার সমর্থকদেরও দিচ্ছি না, আমরা সবাই উচ্চ তত্ত্বের রসজ্ঞ হব না, তাই এমনটাই বরাবর হয়। সাঁওতালী গানে যে মাদলের তালে নাচে, সে দ্রুত-খেয়ালের তবলার ঠেকাতেও নড়বে- তার কাছে শরীরে দুলুনি লাগাটাই মূখ্য। এ কথা অনস্বীকার্য্য যে -আমরা প্রায় সকলেই বিষয়ের মূল্য নির্ধারণ করি আমার ওপর তার প্রভাব বিচার করেই, আমাদের ভাল লাগাটাই যেন শিল্পের সার্থকতা- এরকম একটা কথাও আমরা প্রায় প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছি। অর্থাৎ ‘লোকে যারে বড় বলে সেই বড় হয়’! কিন্তু আজকের সমাজ এই কথার বিপরীত মেরুতে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে না? অথবা চিরকালই ‘লোক’ কি খুব সমঝদার ছিল?

একটা কিছু লোকের মধ্যে ছড়িয়ে দেব ভাবলেই সেই একটা কিছুর খুব উন্নতি হয় না- যদি একটা কিছু ছড়িয়ে দেবার জন্য একটা সুন্দর পরিকাঠামো না তৈরি হয় আগে।

শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২০

আত্ম-স্বাধীনতা

কতটা আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা পেলে 

বলা যায় আমরা বর্বর!

কতটা সকল প্রচলিত ঋজুতার

বিপরীতে বেঁকে গেলে 

বলতে পারি আমরা আধুনিক!

কতটা প্রথাহীন হব বলে

পুরনো শেকড় উপড়ে ফেলা যায়!

কতটা অস্বাভাবিকতাকে অভিনবত্ব বলে

প্রতিদিন প্রতিনিয়ত প্রবিষ্ট করা অন্তরাত্মায়—

এভাবে আর কতটা দিন...

বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২০

বায়স-তাড়ন

প্রাতঃকালে টিনের চালে নিদ্রাভঙ্গে বায়সবৃন্দ
মধুর মন্ত্রে ডাকিছে কাতরে অরুণ-বরুণ-অগ্নি-ইন্দ্র!
নখর-আঁচড়ে টিনে কড়কড়ে –
শব্দ, পশিল কর্ণকূহরে,
তাহাতে সুপ্তি ত্যাজিয়া পরাণ বিস্বাদে গেল ভরি,
কি বা পাপফলে এমন সকালে নিত্য ঘুমাতে নারি!

এতৎ ভাবিয়া ঋষি শ্রীঅণ্ড, ক্রোধারক্তিম করিয়া গণ্ড,
খিড়কি খুলিয়া আসিলেন প্রভু, ছোড়েন কতক ঢিল!
রসরাজ করে এই কারসাজি, সহ্যের সীমা পার হল আজি,
ব্যাটারে এ বেলা দণ্ড না দিলে, টেকা হবে মুশকিল!
খিড়কি খুলিয়া আসিলেন প্রভু, ছোড়েন কতক ঢিল!


_____________________________

রসরাজ-অণ্ডবাক সংঘর্ষ নিয়ে আমাদের যে ইতিহাস গবেষণা, তাতে নতুন আলোক প্রদান করেছে এই অধুনাপ্রাপ্ত কাব্যটি। 'বজ্রযানী বৈষ্ণব পদাবলী'র একটি অপ্রকাশিত অংশে এটি পাওয়া গেছে।

তীরে ফেরা

  অনন্ত দিনরাত্রির কত স্রোতভঙ্গ কলরোলে আমি ভাসিয়ে ভেলা অবেলা ওপারে যাব বলে হাল ধরে ঠাঁই জেগে আছি নির্নিমিখ। কত ঝড়ের ঝাপটা এসে, দিল দোলা ক...