শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

জন্মদিন

 

এভাবে কত দিনরাত্রি মেঘে-মেঘে পার হ’ল,

আঁধারতলে বজ্র নিভিয়ে থুই, গোটা দু’ই

অনাসক্ত করপুটে প্রেমপদ্ম ধরে জ্ঞান-মুদ্রায়,

পর-সম্ভবা প্রেয়সীরে অজ্ঞাতসারে ছুঁই!

 

অনাঘ্রাত নই,

প্রস্ফুটিত হব, পূর্বে কীটদষ্ট, বহুযুগ আগে,

অকৃত-কর্মদোষে নিরয়ে নীরবে রই;

অধরে হাসি ধরে, অথচ হৃদয়ে খঞ্জর লাগে-

বক্ষ-জিঞ্জির নড়ে ওঠে থেকে থেকে, ঝনঝন,

আমি কান চেপে স’ই!

 

এখন বেলা পড়েছে ঢলে,

আমার পছিমে গেছে ঝড় গোধুলি ধুয়ে,

জন্মে জন্মে আছি ভেসে ভেসে স্রোতে,

কে জানে কতটা তট আরও যাব ছুঁয়ে!

 

 


বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

‘আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে’

 

মাঝে মাঝে কিছু একটা লিখিব ভাবিয়া বসিয়া পড়ি, তারপর আকুল হইয়া মস্তিষ্কের তন্ত্রগুলিতে ঘা মারিয়া বেড়াই! কোন ধ্বনি নাই, কোন শব্দ নাই, কোন চিত্র নাই; যাহার স্বরূপ বিশ্লেষণ করিয়া আপনার সাহিত্যিক-চিত্তটিকে তৃপ্ত করিব অথবা প্রশংসকের দু’টি স্তোকবাক্য কিম্বা সহৃদয় সাধুবাদ মাথায় তুলিয়া নিজেকে ধন্য করিব! বহুকাল ধরিয়া এমন হইতেছে! নক্ষত্রও শুনিয়াছি একদা নিষ্প্রভ হইয়া পড়ে! আমি আপনারে নক্ষত্র বলিবার অসৎ-সাহস করিতে পারি না, তবে নিজের ভেতর একটি দীন-প্রদীপ মিটিমিটি করিয়া জ্বলে নাই এই কথা বলিলে তাহা বিনয়ের ছলে অত্যন্ত মিথ্যা ঘোষণা হইবে! অদ্য দেখিতেছি সেই প্রদীপের শিখাও যেন ক্ষীণ হইয়া যায়! অযুত-নিযুত বৈদ্যুতিক আলো, বর্তনী টিপিলেই যাহারা অনায়াসে আলোকবিকীর্ণ করে, তাহাদের সমুখে মাটির প্রদীপ ম্রিয়মান হইবে ইহাতে আশ্চর্য্যেরই বা কি আছে! মাটির ঘরের দহলিজে প্রদোষকালে গৃহলক্ষ্মী মাটির প্রদীপটি যখন আনিয়া রাখেন তখন তাহার দুর্বল আলোক-শিখাটিরও একটি মাধুর্য্য প্রকটিত হয় এ সংসারে- এইরূপ ভাবনা বর্তমানে সকলে ভাবিতে পারেন না! বিশেষত যাহাদের সে দৃশ্য বহিঃজগতে কি অন্তর্জগতে কোথাও দেখিবার অবকাশ হয় নাই- তাহাদের কাছে প্রদীপের মাহাত্ম্য কি বলিব? কিই বা বলিব কেমন সে মানসপটচিত্রটির রূপ?

 

অধুনাকালে হাজার ওয়াট বৈদ্যুতিক বাতির নীচে দেবী আনীত হ’ন! মুখপানে পুরোহিত পঞ্চপ্রদীপ তুলিয়া ধরেন, ঘণ্টা বাজিয়া ওঠে টিনিটিনিটিনি- সে এক আচার হইয়া টিকিয়া গেল কেবল! পঞ্চপ্রদীপের আভায় সে প্রতিমা কেমন আপনারে ব্যক্ত করিবে, সে অভিব্যক্তিতে কতটা দিব্যমায়া অবলোকিত হয়- এইসকল ভাবনা ভাবিবার মত সেকেলে লোক আজ আর কোথায় মিলিবে যত্রতত্র! আঁখি মুদিয়া তেমন কল্পনা করিবার শক্তিটিও আমরা হারাইয়া ফেলিয়াছি! আমাদের আড়ম্বরের আধিক্যে এহেন কয়েকটি সেকেলে সামগ্রী শুধু আপনার নামটি বাঁচাইতে পড়িয়া থাকে! আমাদের সমস্ত কিছুই অদ্ভুত ভাবেই কৃত্রিম ও যান্ত্রিক হইয়া উঠিয়াছে! আমাদের সমস্ত সাহিত্য-শিল্প, সমস্ত কথা কেবল মাত্র নিজেকে কেন্দ্র করিয়া নহে, নিজেকে একটি কেন্দ্রান্তর্গত করিয়া তাহার মধ্যে আপনারে আপনার মত করিয়া নানা সঙে সাজাইয়া অপরের সমুখে উপস্থাপিত করিবার আত্যন্তিক প্রয়াস-সাধনের নামান্তর! নিজেকে একটি বৃত্তে বাঁধিয়া সেই বৃত্তকে মহিমান্বিত করিবার অক্লান্ত প্রচেষ্টা করিতেছি কতভাবে! আমি হয়ত বহুকাল এইরূপে ছিলাম! সমস্ত নিরলস, আপাত-অক্লান্ত শ্রমশক্তিও একদিন ক্ষয়প্রাপ্ত হইবে! তাই কখনো নিজেকে এই ‘হারাইয়া ফেলিলাম’ ধারণাটির ভেতর বাঁধিতে আমার দ্বিধাও হয় না! মাটির প্রদীপ হইয়া মরিব ভাবিয়াছি! আমার যেন হাজার-ওয়াটের বাতি হইতে না হয়! যদি এই বিশ্বের কোন বিধাত্রী আছেন- তবে তিনি আমায় তাঁহার আরতির একটি দীপশিখা হইবার আশিস দিন! মিছে লিখিয়া, মিছে বকিয়া, মিছে গাহিয়া ‘আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে’!

শনিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

দেয়া কথা

 

পাখিডাকা ভোরবেলা, এখনো রাত্রির আবাহন-

থামেনি, সুলগ্না, বিষপানে আমার বিস্মরণ

ঘটে গেছে, ভুলে গেছি দেয়া কথা, নেয়া ব্যথা

গণ্ডূষ ভরে কন্ঠে ধরেছি; এখানে বেদনার প্রস্রবণ

আকাশের গা বেয়ে প্রদোষে-প্রভাতে ঝরে!

 

কর স্নান মোহকুম্ভ-পুরিত জলে, চিকুরজাল অনাদরে

মেলো পৃষ্ঠদেশে, লুব্ধ হই, প্রেতের প্রায়-

কে যেন শতজন্ম শরীরত্যাগী বাতাসে ঘোরে ফেরে,

চাপা-ক্রন্দনে তার ক্রন্দসী যেন ঝড়ের বায়

হু হু করে, ক্ষণে ক্ষণে ঘুম ভেঙে যায়!

 

এভাবে বসে আছি, আকুল-তটে ভাঙা খেয়া-

দোলে, পাড়ে কিছু রিক্ত ঢেউয়ের তোড় লাগে চঞ্চল,

আমি ভুলে গেছি, কথা ছিল, ছিল কত কথা দেয়া,

আমি তার রাখিনি কিছুই, অকারণে কলকল-

স্রোতধ্বনির মত কিছু কবিতার অগোছালো কথা

বরং লিখে লিখে অভ্যস্ত হয়ে আছি!

 

রবিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

ফাঁকি

 

গভীরে সুরের লহরী বিলোল, চঞ্চল হয়ে থাকি!

ঝঞ্জার বায়ে বুকে লাগে দোলা, অথচ নিথর আঁখি!

 

অতন্দ্র রাতি নিবিড় নিঝুম, স্বপনে লব্ধ ধীর বোধিদ্রুম

জাগরণে যায় মায়ায় মিলিয়ে, আশা ধরে বসে থাকি!

 

অন্তরে মরে বাসনা ব্যাকুল, কলি হয়ে ঝরে কামনার ফুল,

হারিয়ে আকাশ, দেশ-কাল-কূল, ক্লান্ত মনের পাখি!

 

পার হব বলে অপার আবেগে, ঘাটে বসে আছি সারা নিশি জেগে

মাঝি সে এলো না, কথা রয়ে গেল, আমায় দিল সে ফাঁকি!

 

 

রচনাঃ ৭/২/২০২১

 


রবিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২১

ফেলে কি সে যাবে চলে

 


রাত্রি ঘনিয়ে এলে, হৃদয়ের অলিগলি-

অচেনা লাগে, কোন চিলেকোঠা ঘরে

কোথাও ছিন্ন তারে বাগেশ্রী স্বরগুলি,

মীড়ে ঘুম ভেঙে দিয়ে বেদনায় ঝরে!

 

জনান্তিকে দেখা হলে জ্যোছনার সাথে,

সেও পরবাসিনী সাজে মুছে দিয়ে আলো,

কবিতার ছাই মেখে ঘুরি সারা গায়,

যদি কোন গানের তরী, থমকে দাঁড়ালো-

 

মাঝনদী, উজান রোলে, বানবাসী দেখে

ফেলে কি সে যাবে চলে, এভাবেই রেখে? 

শ্যামাসঙ্গীতের সংক্ষিপ্ত ধারা বিবরণ

 

১। পরব্রহ্মে মাতৃসত্ত্বা উপলব্ধির বিকাশ সনাতন সংস্কৃতিতে লক্ষ্যনীয় যদিও কিঞ্চিৎ বৈদিক যুগ থেকেই কিন্তু এর বিস্তৃত প্রভাব দেখা যায় ভারতবর্ষে তন্ত্রসাধনার প্রসার-পরবর্তী কালে। বিশেষত উত্তর-পূর্ব ভারতে এবং উল্লেখযোগ্যভাবে বাংলায়। পুরাণ উপাখ্যান বর্ণিত দেবীর ৫১ শক্তিপীঠের অধিকাংশই বঙ্গে এবং দশমহাবিদ্যার উপাসনাও বিধৃত এখানেই। ঈশ্বরের মাতৃভাব আরাধনার এই ধারাকে শক্তি-উপসনা বলা হয়। এবং যারা এই ধারার সাধক ও এই ধারাকেই মানেন তাদের শাক্ত বলা হয়। যেমন বিষ্ণুর উপাসকগণ বৈষ্ণব, শিবের উপাসকগণ শাক্ত, তেমনি গণেশ পূজারীরা গাণপত্য, সূর্য্যদেবতার পূজারীরা সৌর। প্রথমোক্ত তিনটি ধারা আজও প্রচলিত ও সমাদৃত। তার মধ্যে শাক্তধারা কেবলমাত্র উত্তর-পুর্ব ভারতেই বেশী প্রবাহিত হচ্ছে।

 

২। তন্ত্রের দেবী, মাতৃশক্তি ভগবতী দুর্গা ও তাঁর নানাবিধ রূপবিগ্রহ অবলম্বনে শাক্তসাহিত্য, পুরাণ আদি আগে থেকেই আছে। তবে তা নিয়ে সঙ্গীতের আবির্ভাব অতি প্রাচীন কিছু নয়। যেমন বৈষ্ণব পদাবলীর সুদীর্ঘ ও গৌরবময় অতীত রয়েছে। রয়েছে কীর্তনের ৫টি স্বতন্ত্র ঘরানাও। শাক্ত-ধারার গানের তেমন বড় ইতিহাস নেই।

 

৩। পদাবলী কীর্তনের মত করেই কালীকীর্তনের উদয় হচ্ছে, এ পর্যন্ত যে ইতিহাস নথিভুক্ত তা অনুযায়ী- সপ্তদশ শতকেই। মূলত রামপ্রসাদ সেনকেই এই নতুন সংস্কৃতির বাহক মেনে নিলেও আমাদের বিশ্বাস শাক্তদের গান তারও প্রাচীন। রামপ্রসাদ তাতে অভিনবত্ব এনেছেন। রামপ্রসাদের সুর প্রাচীন বাংলা কীর্তনেরই অপভ্রংশ। এ ছাড়াও তিনি ধ্রুপদ শৈলীতে গান রচনা করেছেন। রামপ্রসাদের প্রসাদী-সুরে গানে বদ্ধ বাণীর ভাব-ভাষা ও ধ্রুপদরীতিতে লেখা গানের ভাব-ভাষার স্বাতন্ত্র্য সহজেই দৃষ্টি কাড়ে। সম্ভবত রামপ্রসাদের আগে সহজ ভাষায় এমন গান কেউ লেখেননি, তবে ধ্রুপদী ঢঙ্গের কালীকীর্তন তাঁর আগেরও হতে পারে! নদীয়ার রাজবাড়িতে এই ধারার সঙ্গীতের চল ছিল। আমরা নাটোরের রাজবাড়িতেও এমন গান হবার হদিশ পাচ্ছি।

 

৪। শক্তি-সাধনার প্রাণসঞ্চার দেবী দুর্গা থেকে হলেও এখানে আরাধ্যা হয়েছেন দশমহাবিদ্যা এবং মূখ্যরূপে দেবী কালিকা। ঘোররূপা সংহারমুরতি শ্মশানচারিণী দেবীকে ঘরের মেয়ে এবং শিশুর একান্ত আশ্রয় মা হিসেবে আধার করেছেন রামপ্রসাদ এবং পরবর্তী শাক্ত-সাধক গীতিকারেরা। রামপ্রসাদের পূর্বে এই ভাবনা প্রতিষ্ঠিত ছিল বলে মনে হয় না। রামপ্রসাদের গানই ভয়ংকরী মাতৃশক্তিকে ঘরের মেয়ে করে ঘরে ঘরে ঠাঁই দিয়েছে বললে অতিশয়োক্তি হবে না। অনেকে মনে করেন শক্তিসাধনার এই জাগরণের পেছনে তদানীন্তন সমাজ-জীবনের প্রেক্ষাপটও দায়ী। পরাধীন ভারতের জরাগ্রস্ত দীন হিন্দু সমাজ, তার ওপর অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা, দুর্ভিক্ষ, মড়ক প্রভৃতিতে কাতর একটি জনপদের হাহাকার নিবারণে একজন পরমচৈতন্যকারিণী মায়ের আবির্ভাব ফুটে বেরিয়েছে সাধকের কণ্ঠ থেকে। আমরা ভাবীকালের বৃটিশ-পদানত ভারতেও দেখেছি, আধুনিক কালের শ্যামাসঙ্গীতেও দেবীকে দেশের সাথে মিশিয়ে নিতে, দেশোদ্ধারে মাকে ডাকতে! এই ধারার লেখায় নজরুল অগ্রগণ্য। আছেন মুকুন্দ দাস থেকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও।

৫। কালীকীর্তনে কয়েকটি ভাগ দেখা যায়। প্রথম ভাগে আমরা দেখব আগমনী গান, পরের ভাগটিকে আমরা বলব মাতৃবন্দনা, আরেকটি কিছুটা গৌণ ভাগ- তা হল বিজয়ার গান। এ ছাড়াও শাক্তপদে শ্রীকৃষ্ণের বাললীলার মত করে ‘মায়ের বাললীলা’ও দেখানোর প্রয়াস হয়েছে। তবে তা প্রসিদ্ধি পেল না। রামপ্রসাদের রচনায় আগমনী কিছুটা এসেছে, বিজয়া নেই বললেই চলে। বাকী সকল গান মায়ের আবাহণ, রূপ-গুণ বর্ণনা, নিবেদন ও আর্তি, এবং অভিমান-গাঁথা। রামপ্রসাদ পরবর্তী যুগেও এমন ধারা বজায় রেখেছেন কমলাকান্ত থেকে দাশরথি রায়ের প্রজন্মও কিন্তু কোথাও রামপ্রসাদের মত সাবলীলতা দেখা যায় না।

 

৬। অষ্টাদশ শতকের কবিদের শ্যামাসঙ্গীতে ভাষার জমক দারুণ। দাশরথি রায়ের নাম না নিলে আলোচনাটাই অসম্পূর্ন। অষ্টাদশ শতকে বাংলা গানের ভাষাও রামপ্রসাদ-কমলাকান্ত যুগের ভাষার চাইতে অনেক এগিয়ে এসেছে। শুধু ভাষা নয়, সুরের উপস্থাপনাও বদলেছে অনেকভাবে। আগে যেখানে সুরে কীর্তন ও ধ্রুপদের ঢঙ লক্ষ্য করছি আমরা, পরে গিয়ে তাতে খেয়াল-ঠুমরি-টপ্পার আবহও জুড়ে যাচ্ছে। আখড়াই গান, কিম্বা নিধুবাবু, সাতুবাবু, দানীবাবু, কালীমির্জার যুগের শ্যামাগান দেখতে পারি আমরা।

 

৭। দাশরথি রায়ের গান আমরা মাতৃসাধক রামকৃষ্ণ পরমহংসের কন্ঠে শুনতে পাচ্ছি। রামকৃষ্ণ পরমহংস মাতা ভবতারিণীকে কেন্দ্র করে যেন মাতৃনামের প্রবাহ এনেছিলেন, তাতে নববিধান ব্রাহ্মসমাজের ত্রৈলোক্যনাথ স্যান্নালকেও দেখছি মাতৃভাবের ব্রহ্মোপাসনার গান লিখে যেতে। এও এক নতুন সংযোজন বলা যেতে পারে। আরেকটি কথাও বলতে হবে- শ্রীরামকৃষ্ণ মহেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য, যিনি প্রেমিক মহারাজ নামে প্রখ্যাত ছিলেন তাঁর গানও গাইতেন, দুজনই সমসাময়িক কালের। প্রেমিক মহারাজ ধ্রুপদে কালীকীর্তন বেঁধে কালীকীর্তনকে পূর্বতন ধারায় সমৃদ্ধ করে গেছেন।

 

৮। কালীকীর্তন উনবিংশ শতকে এসে আধুনিক অবয়ব পেয়ে শ্যামাসঙ্গীত হয়ে গেল। তার পর আমরা শ্যামাসঙ্গীত নিয়ে বাঙালীর উচ্ছাস দেখতে পাচ্ছি। শ্যামাসঙ্গীতের জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে গ্রামাফোন রেকর্ড কোম্পানিগুলো শ্যামাসঙ্গীত রচয়িতা খুঁজতে মরীয়া হয়েছেন। এই যুগেই আমরা নজরুলের আগমন দেখতে পাচ্ছি। যাঁর হাতে শ্যামাসঙ্গীত একটি নিজস্ব মাত্রা পেয়েছে।

 

৯। ওপরের এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মাতৃ-আরাধনার এই গানের ধারাটিও অন্তত ৩০০ বছর ধরে বাঙালীর সঙ্গীত-জগতে অনন্য স্থান নিয়ে জাগরুক ছিল যদিও আজ কিছুটা ম্লান। বাঙালীর ঘরে যত দিগগজ গায়ক-গীতিকার-সুরকার জন্মেছেন কেউই তাঁদের সঙ্গীত-জীবনে এই ধারার অস্তিত্বকে না টেনে থাকতে পারেননি। রবীন্দ্র-রজনী-অতুল-দ্বিজেন-নজরুল কেউ-ই পারেননি!

 


বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২১

আমায় রাখো

 

হরি হে!

আমায় রাখো নত তৃণের মত পথের পাশে,

যেথায় তোমার চরণচিহ্ন নিত্য লাগে, নিত্য আসে-

নূপুরধ্বনি কর্ণে আমার, মর্মে আমার নিত্য রাজো-

গভীর মনে লুকিয়ে হরি, ব্রজের বনে অমনি বাজো-

মোহনবেণু; লুটিয়ে রই চরণরেণু- মাথায় ধরে,

এবার ম’লে উরগ হব, কালীয় রাজার ফণার পরে-

যেমনি তোমার নাচন লাগে, তেমনি আমার চিত্ত মাগে,

নয়নডোরে- বাঁধব বলে কৃষ্ণশশী, মন উদাসী, যেমন জাগে-

প্রভাতবেলা অনাঘ্রাত ফুলের কলি,

যেমনতর- পুষ্পরসে মাতাল ঘোরে ভৃঙ্গগুলি,

অমন করে কাঙাল হলেম, দরশ তোমার পাবার আশে!

হরি হে! আমায় রাখো নত তৃণের মত পথের পাশে!

 

ছয়দিকে ছয় কংসচরে, অহর্নিশা- তাড়িয়ে মারে,

না পাই দিশা, মরছি কেঁদে করাল ঘোর অন্ধকারে!

যদি উদয় হতে সূর্য্যসম, কংসাসুরের কারায় মম-

অমন আশার বাসা বইছি যেন জন্ম-মৃত্যু-জন্ম ধরে,

লোকে লোকে আকুল হয়ে লোকান্তরে,

পাইনে দেখা, ললাট-লেখা তুমিই জানি লিখলে বটে,

নিদয় তুমি নন্দিত তায়, সাধে কি আর তেমন রটে!

মা যশোদার বুক ভাসালে, একটিবারও চাওনি ফিরে,

তবুও আমার সাধ হয়েছে, সাধেই ডুবি নেত্র-নীরে!

আমি দু’হাত তুলে আকাশপানে, ক্ষীণস্বরে, কাতর প্রাণে

ডাকছি আমার পাষাণ-কৃষ্ণ, বধির কেন হলে?

লোকে তোমায় বলবে কি গো, এমনি আমি ম’লে?

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


তীরে ফেরা

  অনন্ত দিনরাত্রির কত স্রোতভঙ্গ কলরোলে আমি ভাসিয়ে ভেলা অবেলা ওপারে যাব বলে হাল ধরে ঠাঁই জেগে আছি নির্নিমিখ। কত ঝড়ের ঝাপটা এসে, দিল দোলা ক...