সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬

বিপরীত পথ

 

বিপরীতে যে পথ- সে বড় সুনিবিড়- 

ছায়াঘন- সে গেছে আঁধারে মিলায়ে।

নগরে জনস্রোত- অলিগলি- রাজপথ- 

সবাই যে মুখো- ঠিক তার বিপরীতে,

সান্ধ্যনীড়ে ডাহুকের শব্দ জাগে কত;

পানাপুকুড়ের পাড়- বোধিদ্রুমতলা-

অবোধ বুদ্ধের- সগৌরবে- পরিত্যক্ত-

অমোঘ শত মুক্তিসূত্র গেছে বিলায়ে;

নগরে জনস্রোত, সে পথে হল না চলা! 

বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬

বিসর্জন

 

সত্যি যদি সুযোগ হত
বিসর্জনে যাবার, কবেই যেতাম চুপিসারে।
কতটা অপাংক্তেয় ভেবেছি কে জানে নিজেকে,
তার চেয়ে বড় বেশী অপরিচিত লাগে সব।
কেন যেন এ শহর, তার পথ ঘাট, সচল মানুষ কত,
ধুলো, ধোঁয়া, বাদ্য বিনোদন, নিরলস কলরব-
তবু আমি ভীড়ের মাঝে বিবিক্ত অথবা বিরক্ত,
হয়ত বা অসংলগ্ন অস্তিত্ব কিছুর- একপ্রকার থাকা।

রাত বাড়লে দূরের এক নিমপেঁচা সঙ্গী হয় আজকাল,
শরৎ শেষে গোটা কয় রাতচরাও জানি পাব গহীনে,
অযতনে মরচে ধরা খাঁচায় শুনি ঝাঁপটায় পাখা-
যে পাখী, সে প্রত্যুত্তর দিতে চেয়ে আকাশে কেঁদে মরে।
এত সব নিত্য জাগ্রত হট্টগোল ফেলে যদি বলি,
যদি সত্যি হত ন্যুনতম অবকাশ নয়, সত্যি সুযোগ-
তবে বিসর্জনেই যেতাম উলোবন কাশবন বাঁশবন ছেড়ে
ধানসিঁড়ি নয়, শঙ্খচিল, শালিক হয়েও নয়, নিতান্ত-
কোন কালো দাঁড় কাক হয়েও যদি অন্য কোন নদীতীরে
আমি না হয় ভেসেই চলে যেতাম- যদি সুযোগ হত। 

রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

জননী গো ক্ষমো অপরাধ।

 
জননী গো ক্ষমো অপরাধ।
এই দুরিত ভবার্ণব তরিতে অবসাদ।
ক্ষমো অপরাধ।।
 
স্বকৃত সকল দোষে বিকট বীচিমালা
সাধের ভুবন ভাঙে- কপট চঞ্চলা
না মানে বাঁধ।। ক্ষমো অপরাধ।।
 
কেমনে দিব ঢালি এ পাপ-নেত্র-লোর-
শ্রীপদে? জননী, আমি কুমতি- ঘোর!
 
যদি গো সদয়া হয়ে আপনি কর পার,
করুণা জাগে প্রাণে করিতে উদ্ধার,
শুনিয়া আর্তনাদ।। ক্ষমো অপরাধ।।
 
 
 


সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

 

একদা আবিষ্কার করিলাম আমাদের ঠাকুর দেবতাগুলি গ্রীক/রোমক দেশীয় পুরাণের ঠাকুরদের অনুকরণ করিতে লাগিল! অবশ্য বহুকাল হইতেই আমরা নরনারীর সৌন্দর্য্যের অন্যতম মানদন্ড ইউরোপীয় বলিয়া গণ্য করিতেছি। রমণীকুলের মুখশ্রী রক্ষার (মেক আপ) যে ঢঙ তাহা দু দণ্ড ক্ষণ ভাবিলে টের পাই- এই আদল ভারতীয় রমণীর অবয়বের নহে, ত্বকেরও নহে! শ্যামল গাত্রের বালিকাকে মুখে ফাউন্ডেশন মাখিয়া শ্বেতবর্ণ হইতে হইবে, ফাউন্ডেশনে পিংক ব্লাশ মারিয়া ইউরোপিয়ান দেখিতে হইবে- নচেৎ তাহার যে রূপ খুলিল না এই মনস্ত্বত্ব সম্ভবত আমাদের স্বদেশীয়; তবে কালোকে ধলো করিবার প্রসাধনী বিশেষ আমাদের ছিল না বটে। কিন্তু এই মানসিকতা জাতির অন্তরে গাঁথিয়া দিতে শ্বেতচর্ম-সংস্কৃতির প্রভাব নাই বলিতে পারি না। এই প্রভাব আমরা আত্মস্থও করিয়াছি। আমাদের মনোজগত পাশ্চাত্যের হাবভাব, আচার বিচার, খানাপিনা, গালাগাল দেবার ভাষা- সমস্ত কতৃক অধিকৃত! ইহাতে আমি পীড়িত নহি।  বিজিত জাতির ওপর বিজয়ীর সাংস্কৃতিক আধিপত্য অত্যন্ত স্বাভাবিক। মানিয়া নিলাম। তাহা যুগে যুগে কালে কালে দেশে বিদেশে হইয়া আসিয়াছে, ভবিষ্যতেও হইবে। তবে আমি চমকিত হইয়াছিলাম যখন দেখিলাম মহিষাসুর ক্রমশ অসুরাধিক demon, monster, কদাচিৎ কোন পুরাতন Scandinavian war-lord  হইতে লাগিল, দেবী ক্রমে অর্ধ-ভারতীয় অর্ধ-ইউরোপীয় কায়দায় সজ্জিত হইতে আরম্ভ করিল- আমার বাক্যস্ফূর্তি হইত না।


ইদানিং সকলই নিরপেক্ষ ভাবে মানিয়া লই! অর্থাৎ যাহা কিছুর সহিত আমরা অতিজাগতিক সম্বন্ধ ভাবিয়াছি, অন্তত যে ভাবনা-বলয় আমরা স্বজাত্য কল্পনা ও কলাসমূহের স্ফূরণে অকৃত্রিম রাখিয়াছিলাম এতকাল, যাহাতে আমরা ঐকান্তিক অধ্যাত্ম স্রোত খুঁজিতাম- তাহাও এই গড্ডালিকাপ্রবাহ হইতে নিস্তার পাইল না। ক্রমশ সকল কিছুই মনোরঞ্জনের নিমিত্ত হইল। কিছুরই স্বকীয়তা রহিল না। না রহিল কিছুরই গভীরতা। শিল্পতত্ত্ব, নন্দনতত্ত্ব- এই সকল অর্বাচীনের প্রলাপ বকিয়া কাজ নাই! তবে অন্তত যাদুর বাক্সতে দেখাইবার নিমিত্ত যে ভারতীয় কল্পনা ইউরোপীয় ধারায় গড়িব- সে বিদ্যাটুকুও কি আমাদের ঘটে আছে? পাঁচশত কোটি টাকা ঢালিয়া 'আদিপুরুষ' নামক সিনেমা বানাইল, রাম-রাবন-হনুমানের গুষ্টি উদ্ধার হইল- VFX এর মান দেখিলাম! বুঝিলাম অঢেল অর্থ হইল, রুচি হইল না, শিক্ষাও নহে! বুদ্ধিমান বুঝিয়া লইবেন! যদি পাঁচশত কোটি খরচ করিয়া আমরা খুব মানসম্মত কিছু সৃষ্টি করিতে অসমর্থ হই, সেই স্থানে দেবী নাচিতেছে, মহিষ ছুটিতেছে- বাজ পড়িতেছে, মাটি ফুঁড়িয়া আগুনের হল্কা নির্গত হইতেছে, সাগরে প্রলয়ংকরী ঢেউ জাগিয়াছে, হাসি হইতে টর্নেডো বাহির হইতেছে জাতীয় শিশুতোষ VFX- এর বেশী কিছু আশা করিব কি? সমালোচনাও কি অর্থে করিব?প্রহসন করিতেও দুঃখ হয়! যাহা রামানন্দ সাগর আশির দশকে ফিল্ম এডিট করিয়া দেখাইতেন, অদ্য তাহা আমরা ভিজুয়াল গ্রাফিক্সে দেখি- ইহাকে উন্নতি মানিলে অপরাধ নাই! 


মোদ্দা কথা হইল রাম-রাবণের যুদ্ধকে ট্রোজান যুদ্ধ করিয়া দেখাইতে চাহিলে শুধু পোশাক আশাক পরিবর্তন করিলে চলিবে? অন্ধানুকরণের কুফল এই যে সে শিব গড়িতে বানর গড়িবেই গড়িবে! একজন সঙ্গীতের মানুষ হিসাবে বলিব- একেকটি হলিউডের fantasy movie, mythological movie তে কেবল মাত্র আবহ সঙ্গীত (মূলত যন্ত্রসঙ্গীত) নির্মাণে তাহারা যে মেধা ও অর্থ বিনিয়োগ করে আমাদের তাহা করবার সিকিভাগ রুচিও নাই, বাসনাও নাই! আমাদের বিনিয়োগ বিনোদন রচিবার ও তাহা হইতে অনায়াসে অর্থসংস্থান বৃদ্ধি করিবার! শিল্প-টিল্প কিম্বা যে প্রসঙ্গের অবতারণা দিয়া শুরু করিয়াছিলাম- স্বজাতীয় স্বকীয়তা প্রভৃতি কথাবার্তা নিছক প্রগলভতা বৈকি!

শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬

তক্কে তক্কে

 

বুঝি না ছাই, কে আছে নাই
বিপক্ষে বা আমার পক্ষে,
ঢপের চপে তেল ফুরালো
রোক্কে করো হে রগুবীর
এ বার যদি না পাই রোক্কে!
বেফাঁস কিছু বলতে গেলে
বেচাল কিছু চালতে ছলে
এখন একটু সামলে খেলি
সব ব্যাটারাই তক্কে তক্কে! 

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

হতেছে কাতর প্রাণ

 

হতেছে কাতর প্রাণ, না হেরি কনক মুখ! 

তুমি কি বুঝিবে নাথ! পাষাণে কি বাজে দুখ?

মেয়ে দিয়ে দিগম্বরে, (বড়ো) উদ্ধারিলে ত্রিসংসারে!

(শুনি) জামাই শ্মশানে ফেরে, কপালে তার এই সুখ?

মা হয়ে সহিতে নারি, মেয়ের এ যাতনা গিরি,

আনো তারে পায়ে ধরি, চিন্তে মরি, জ্বলে বুক!

 

রচনা ও সুরঃ ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬।


সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

কত কাল?

 

কত কাল আর এতটা অন্ধকারে
এত সব অশ্রাব্য চিৎকারে
চারপাশ বদ্ধ করে নির্বিবাদে থাকি?
কত রাত দয়ানিধি অলক্ষ্যে সুর বাঁধি
পড়ে আছি অচঞ্চল স্বকৃত কন্দরে
নিজের ছায়ার সাথে নিজের নিত্য ফাঁকি
এই ক্রুর খেলায় ডুবে? কত কাল? 

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

তীরে ফেরা

 

অনন্ত দিনরাত্রির কত স্রোতভঙ্গ কলরোলে
আমি ভাসিয়ে ভেলা অবেলা ওপারে যাব বলে
হাল ধরে ঠাঁই জেগে আছি নির্নিমিখ।
কত ঝড়ের ঝাপটা এসে, দিল দোলা ক্রুর হেসে;
আমি শতেক সর্বনাশে ভুলেছি দিগ্বিদিক।।

লাখো চর জাগা মোহের আবাহনে
থমকে গেছি, বিপথে গেছি, চমকে গেছি;
দুর্বার, অতল জলের টানে।
তবু কে যেন কত না ছলে, প্রেমে বা কৌশলে
ভাঙা এ দেহতরী তীরেতে ভেড়াল ঠিক! 

বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

আঁধার ঘনাল বলে

 

উদ্ভট বিভাজনের রেখা 

এঁকেবেকে বয়ে যাচ্ছে,

সংশয়-শঙ্কায় ঝিমিয়ে গেছে 

প্রখর নির্ণায়কের দল- 

মস্তিষ্ক খুলে রেখে হিমাগারে;

এখন যাদের কথা ছিল 

ঝড়ের বাতাস ঠেসে ধরার

তাদেরও ভেতরে দেখি- 

অসভ্য- কলহ, কোন্দল! 

অথচ সংকটের আঁধার পথ

মাড়িয়ে এলো যে গান, 

ভেবেছিলাম সে অমর- 

অজর, নিত্য, অফুরান, 

দেখি সেও ক্ষীণ হয় ভয়ে। 

আমরা ঘুমাতে চাই আজ

বিবিক্ত রাতের কোলে, 

সাতরঙা স্বপ্ন সমেত বন্ধু,

ভবিষ্যৎ যেখানে যায় যাক, 

আঁধার ঘনাল বলে! 

শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

 

রাজা বদলায়, দরবার বদলায়,

বদলে যায় মোসাহেবের পরিচয়নামা.. 

নতুনতর মোড়কে আসে পুরনো বিজ্ঞাপন- 

'আমাদের কিছু বিদূষক চাই'!

বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬

হতাশ হওয়া নাকি বারণ!

 

হতাশ হওয়া নাকি বারণ! 


আমার এক ছাত্র রুদ্রবীণা শিখত। মূলত রুদ্রবীণা শিখতে গিয়ে রাগরাগিণী বোঝার প্রয়োজনে সে আমার কাছে এসেছিল। আমি তাকে নিরুৎসাহিত না করলেও বাস্ততবতা দেখিয়ে বুঝিয়েছিলাম- মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়ের জন্য রুদ্রবীণা শিক্ষা একটা বিরাট বিলাসিতার মধ্যে পড়ে! শেষপর্যন্ত সে বীণা ও সঙ্গীত উভয় শিক্ষালাভ থেকেই ইস্তফা দেয়, এর মধ্যে তার বাপের গাঁট থেকে যা কড়ি খসার তা খসে গেছে তা বলা বাহুল্য! ঘুরে ফিরে বাস্তবতা চোখ রাঙাতে দেরী করেনি! ব্যাপক পৈত্রিক ধনসম্পদ না থাকলে এসব ধ্রুপদী বিদ্যায় আত্মনিয়োগ করে টিকে থাকা সম্ভব নয়! গুরুমুখে শুনেছিলাম, পরম্পরায় একটা কথা প্রচলিত, ‘ইয়ে চিজ আমিরোঁকে লিয়ে হ্যায়, ফকিরোঁকে লিয়ে হ্যায়’! মাঝামাঝি থাকার আমার মতন লোকের জন্য নয়! এই কথা যারা এই সমস্ত কলায় নিবেদিত আছে সকলেই জানে। Passion পর্যন্ত এর যা গ্রহণযোগ্যতা আছে- proffesion হিসেবে ততটা নেই! তাই বলে কেউ আর ধ্রুপদ শিখবে না? বীণা শিখবে না? শাস্ত্রীয় নাচ শিখবে না? কেন শিখবে না? সামর্থ্য থাকলে অবশ্যই শিখবে। সামর্থ্য আছে সবার? কিন্তু অন্নসংস্থানের চিন্তা করে শিখতে গেলে বিপদাপন্ন হতে হবে! আমাদের সমাজে শিল্পকেন্দ্রিক একটা এমন ecosystem সৃষ্টি হয়েছে- সেখানে পুরাতনী সংস্কৃতির টুটি চেপে ধরা হয়! এক যুগ ধরে ভরতনাট্যম শেখা মেয়েটি কোনভাবেই রিলসে নাচা পুঁচকে মেয়েটির তুলনায় যশ-খ্যাতি-অর্থ কিছুই পাবে না! বলতে পারেন- ভরতনাট্যমের আলাদা class, তার প্রশংসকদের আলাদা class! এসব কখনো সর্বজনীন ছিল না। কথা হচ্ছে সেই আলাদা class এর ভেতরে recognition মিলছে? পয়সা মিলছে? মঞ্চ মিলছে? সমাজের সেই আলাদা class- যার কাজ প্রশংসা করা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ- সেই class patronage করছে? কিছুই করছে না! প্রশংসায় পেট ভরে? যে রুদ্রবীণা শেখে তার বিরোধ কখনোই গীটারের সাথে নয়! তার বিরোধ এই ecosystem এর সাথে যে তাকে সামান্যতম জায়গাটুকু দেয় না! তার বরং বেঁচে থাকার করুণ আর্তনাদ আছে যা শূন্যে মিলিয়ে যায় নিষ্ঠুর ভাবে! বলতে পারেন- survibal of the fittest! সমাজের গতি বদলেছে, বদলেছে চরিত্র! এই পরিবর্তনে বীণাটি টিকতে পারছে না তো সে দায় বীণার বৈকি! বড় বড় মঞ্চে ধ্রুপদীয়া গাইতে বসলে সামনের কয়েকটা সারি বাদ দিলে পেছনে কেউ শোনার নেই! ধ্রুপদে প্রাণ নেই? আকর্ষণ করার ক্ষমতা নেই? কেন নেই? শ্রোতা বদলাচ্ছে। আধাঘণ্টা আলাপ-জোড়-ঝালা শোনার ধৈর্য বিলোপ হয়েছে! দায় কেবল ধ্রুপদের? চিরকালই এসব আলাদা class এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল সে কথা অস্বীকার করছি না। কিন্তু অতীতে সেই class, সেই সমাজ- এঁদের বাঁচতে দিয়েছে- এখন দেয় না! এখন এসব একপ্রকার elitism দেখানোর কায়দা! এই নির্মম বাস্তবতা যখন বারেবারে বলতে হয়- তখন এক শ্রেণী ভাবে- আমি বা আমার মতন মানুষ বড্ড negative কথাবার্তা বলে! তাদের বক্তব্য- আমরা যেন আমাদের কাজটুকু অন্তর দিয়ে করি- ব্যস তাতেই হয়ে গেল সব! অন্তর দিয়ে নেশারখোরের মতন বুঁদ হয়ে ধ্রুপদী-সাহিত্য-শিল্প-কলার সাধন করার পর যখন বাস্তবতা অর্ধচন্দ্র দান করে বুঝিয়ে দেয়- ‘যা ভিক্ষে করে খা’- তখন এঁদের কারো কাছ থেকে সামান্যতম সহানুভূতিটুকুও জানি পাব না! আজও পাশ্চাত্যে লোকে Choir শোনে, Opera শোনে- হলভর্তি লোক, pindrop নীরবতায়! স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে এসবের প্রশিক্ষণ হয়! সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আছে! আমাদের কি আছে? আমাদের শোনে লোকে? যে কোলকাতায় একদা খেয়াল গানের আসর বসলে- আসন সংকুলান হত, সেখানে এখন ডোভার-লেনের অনুষ্ঠান ফাঁকা থাকে! ব্যপারটা অনেকটা টেস্ট ক্রিকেট থেকে টি-টোয়েন্টির আসন কেড়ে নেবার মতন! এখন লোকে যেমন টেস্ট তেমন দেখে না- গ্যালারি ফাঁকা! লোকের সময় নেই, ধৈর্য নেই! হ্যাঁ আমাদের মেনে নিতে হবে। কিছু করার নেই। তাই বলে আমরা যারা আছি- ক্ষুদ্র, দীন-হীন, অপাংক্তেয় হয়ে পড়ে- আমাদের খেদ প্রকাশ করার ভাষা থাকবে না? আমরা আমাদের মনোবেদনা জানাতে পারব না কোথাও? প্রতিপত্তি ছাড়ুন- দু’পয়সা জোটাতে না পারলে ভবসংসারে আপনাদের বয়ানবাজী গিলে বাঁচতে পারব? শাক্তপদাবলী নিয়ে বড় কিছু একটা করব ভেবেছিলাম- কোন sponsor নেই, একটা কিছু বইটই ছাপিয়ে গানগুলোর যথোচিত সংরক্ষণ করব পরিকল্পনা আমার আজও আছে- যা অনেকটাই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর কাজ- কোন প্রকাশক এই risk নেবে? সে তো সমাজসেবা করতে বসে নেই! মূলত আমি যদি এখন বসে শতবছর আগের কাজকর্ম নিয়ে খেপে উঠি- তাহলে সেটা আমার মূর্খতা ভেবে নিয়ে আমাকেই সরে দাঁড়াতে হবে! এবং এটাই বাস্তবতা! হয় তুমি নতুন যুগের মতন করে নিজেকে আমূল বদলে ফেল, নইলে ভাত-ডাল জোটানোর অন্য কাজ ধরে নাও! সোজা কথা! এও জানি আমরা যত যা-ই বলি- নিয়তিকে মেনে নিতে তো হবেই! বলে খুব লাভবান হচ্ছি না! হবও না! কেউ এসব কথার ধার ধারে না! কিন্তু বলে যদি নিজেকে অন্তত প্রবোধ দিতে পারি নিজেকে তাতেই বা কার ক্ষতি? আমাদের আদেশ-উপদেশ দিয়ে কাজ নেই। লোকের কথা বিবেচনা করে আমরা থেকে নেই তো! আমরা কিছু লোক আজও নিজের আনন্দের নিজেই সৃষ্টিটুকু নিয়ে থাকি! ওটাই বাঁচার অবলম্বন আমাদের। লোকে না শুনুক- তাই বলে গাওয়া তো বন্ধ হয় না! আমাদের দাবী-দাওয়া কিছুই নেই! আমাদের কেবল বেঁচে থাকার তাগিদ আছে! পেটে খিদে আছে! এবং যখন বিপন্ন বোধ করি- তখন আর দশটা জন্তুর মতন শব্দ করার প্রবণতা আছে! ওটাও কি বন্ধ করে ফেলতে হবে? 

রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

নতুনতর সাজসজ্জায়

 



সবটুকু বলা হয়ে গেছে।
শোনার ভান ধরে শোনেনি কিছুই যারা
নিতান্ত হেলায়- তাদেরও ধন্যবাদ।!
এই অনন্ত পদযাত্রার পথে
বেলায় বেলায় অনেকটা চলা হয়ে গেছে;
সহযাত্রী হবার ছলে যারা দিয়েছে কাঁটা
পথে বিছিয়ে- তাদেরও ধন্যবাদ!

আমি জানি- এসেছি যখন একভাবে,
কোন না কোনভাবে ফিরেও যেতে হয়!
জানি অনস্তিত্ব আমার ক্ষণিক বেদনাদায়ী
হলেও হতে পারে- এর বেশী কিছু নয়;
আমার আক্ষেপ তাতে তিলমাত্র নেই।

তবে জানি- কোটিবর্ষ পরে হলেও
আমার রক্তছাপ ধরে ঘুরবে কোন পুরনো প্রাণ,
পুরনো পথে, পুরাতনের অমোঘ আহবানে,
নতুনতর সাজসজ্জায়!


মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

আমি দীন- হীন, অতি কাতর প্রাণ হে

 

আমি দীন- হীন, অতি কাতর প্রাণ হে
বিষয়-কলুষিত, দুরাশয়, দুর্মতি
পামর, দুষ্কৃতি, পতিত, ম্লান হে!
আমি বিবিধ অশুভ হে, অচল জড়ভার
বিমূঢ়, শংকিত, বিবেকবর্জিত,
প্রভূত পাপাধার!
মারণ দুখ জরা শাপিত পাষাণ হে!
আমি অধমাধম, নীচ, কপট, শঠ হে!
নিরয়পথগামী ক্ষীন-শকট হে!
তবু চেয়েছি যেতে তব ক্রোড়-কোকনদে,
তুমি বাঁধিলে অধমাধমে এ ভব-মোহমদে
অন্তে দিও মা পদ, বিশাখে ত্রাণ হে! 

বুধবার, ২০ মে, ২০২৬

আদতে অপ্রয়োজন

 

কেন লিখি কেন গাই? দূরে সরে যাব বলে-

আরও কাছে চলে যাই নগরের কোলাহলে? 

দিনে রাতে সাধা যত রাগিণীর সুর ভুলে? 

যেখান কখনো আর জোটে নাগো কানাকড়ি, 

হাততালি অবিরাম, প্রশংসা ফুলঝুরি, 

অথবা যেখানে নিছক সব প্রগলভ-আলাপন, 

যেখানে অর্থ চায় সুনগ্ন বিনোদন;

কথার কথা হয়ে কত কথা কেঁদে মরে, 

সাজানো কাগুজে ফুল অসকালে যাবে ঝরে-

তেমনও তো নয়, জানি সব মেকি, সব সং,  

তবুও তা যাবে টিকে, ফিকে তো হবে না রঙ!

তামাশার তমসায় আসব-পাত্র ধরে মত্ত দানব 

যদি শুয়ে পড়ে রূপোপজীবিনী বুকে,

চিত্রকরের দল তা-ই আঁকে মহাসুখে!

কেন না বাঁচতে হবে, ক্ষুধা ও তিয়াস সয়ে

কাব্যকলার মোহ মৃতসঞ্জীবনীর হয়ে- 

যত দিক প্রবচন, আমি জানি সবই যে অসার;

আদতে অপ্রয়োজন! 

মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

গল্পপ্রমাণ

 

দিনশেষের এই গল্পগুলো নাই বা হল সত্যি যদি

নাই বা হল কারুর সাগর কারুর চোখে ছোট্ট নদী

তবুও তো বাঁচতে হবে গল্প-প্রমাণ জীবন ধরে

হয়ত বন্ধু এই জীবনে, নয়ত জীবন ঝরার পরে। 


আকাশ হয়ে অন্ধকারে চাঁদের খোঁজে তারার মতন

জ্বলতে জ্বলতে নিভতে পারো আলোর পুজি থামবে যখন 

তবু তোমায় জাগতে হবে, গাইতে হবে কন্ঠ ছেড়ে

যদিও তোমার ঘুম লেগেছে, গান আসে না ঘুমের ঘোরে!


হয়ত বাতাস থমকে যাবে ঝড়ের কোন পূর্বাভাসে

পাখীর বুকের কাঁপন হয়ে হয়ত কারুর বেদন ভাসে

নীড়ভাঙা কোন্ গানের হাওয়া, তীরে তীরে ডুকরে কাঁদে

সেই কাঁদনের গুঞ্জনেও হয়ত বা কেউ ঘরটি বাঁধে

চিত্তবিকারশূন্য হয়ে প্লাবনজাগা নদীর ধারে

তবুও তো বাঁচতে হবে গল্প-প্রমাণ জীবন ধরে।। 

শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

আমি সুরে সুরে দূরে সরে যাই...

 



আমি সুরে সুরে দূরে সরে যাই...
তুমি কোনদিন পারো না জানতে..
তুমি তো দাঁড়িয়ে একই ঠাঁই...

সব কলিগুলো ফুটতে পারে না,
সব অলি পথ চিনতে পারে না,
আমি তাদেরই দলে বিলীন হয়েছি
ঠারেঠোরে তাই গেয়ে যাই....

বোঝা সামান্য-
শত জনমের ভুলে ভরা এক ঝোলা...
বই ধীরেধীরে, দেখি ফিরে ফিরে..
ফেরার পথ কি খোলা?

আমি সাগরের কাছে মুক্তি চেয়েছি
ঘুর্ণির জলে দুঃখে নেয়েছি,
আমি ভেঙে ভেঙে শত টুকরো হয়েছি...
আরও যেন ভেঙে যেতে চাই।

সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

ধ্বজা

 



ধ্বজায় ধ্বজায় ছেয়েছে আকাশ
বাতাসে ভাসছে কোন্দল!
আমারে শুধায় ধ্বজাবাহকেরা-
'মহাশয়, তুমি কোন দল'!

যদি বলি কারো পতাকার নীচে
দাঁড়িয়ে পড়তে দ্বিধা-
অমনি দেখেছি খোলা তরোয়াল
উঁচিয়ে তুলেছে সিধা-

তার আমারই মুন্ডু নিশানায় আছে-
প্রাণধন শুধু সম্বল!
বুঝি তাও রাখা ভার এত হিংসায়
মত্ত যখন মহীতল!

রবিবার, ১০ মে, ২০২৬

হোঁৎকা

 

হোঁৎকা এসে জ্ঞান দিয়ে যায় তার হিসেবেই চলতে খালি!
অন্ধ বলেই জানি তারে, আর নাইবা হলাম চোখের বালি!
এক কানে তার ঢুকিয়ে বুলি, অন্য কানের বাইরে ফেলি
তবু গায়ের ওপর পড়লে এসে, চটাস চটাস বাজাই তালি!
হোঁৎকা বলে 'এ কি রে ভাই! বিশাখ ব্যাটাও ঠ্যাঙায় নাকি!
ভেবেছিলাম নরম গায়ে, সুযোগ পেলেই পঙ্ক মাখি!'
এখন অঙ্ক দেখি পালটে গেছে- 'কয়লা যায় না ময়লা ধুলে'
পদ্ম ভাবে 'ব্যাটা তৃণতুল্য' আর তৃণ বলে 'ও তো পদ্মফুলে'!
যত ঢ্যামনা এসে গাল পেড়ে যায় - এতই কেন তফাৎ বলি!
আমার ধ্বজা কেবল একটি ধরা, তাতে লেখা 'জয় মা কালী'! 

কালী! এই ছিল মা তোর মনেতে

 



কালী! এই ছিল মা তোর মনেতে এতদিনে গেল জানা!
ষোলআনার ভাগ চেয়েছি, দিলিনে এক আধুলি আনা!
তুই কারে রাখিস সিংহাসনে, কারে রাখিস আঁখির কোণে,
কেবল বিশাখে পড়ে না মনে, তার বেলা মা রইলি কানা!
আমার ভাগ্যে সদা সাড়ে স্বাতী, যমের দ্বারে নিচ্ছি গতি
দুর্গমেতেও কি দুর্মতি! ওমা ভবের জ্বালা আর ঘোচে না!
আমি নিশীথে একাকী লিখি- মা হয়ে দিলিরে ফাঁকি-
এ হিসেব আমার বুঝতে বাকী- হচ্ছে কি বল কান্ডখানা!




বিপরীত পথ

  বিপরীতে যে পথ- সে বড় সুনিবিড়-  ছায়াঘন- সে গেছে আঁধারে মিলায়ে। নগরে জনস্রোত- অলিগলি- রাজপথ-  সবাই যে মুখো- ঠিক তার বিপরীতে, সান্ধ্যনীড়ে ডাহ...